Image description

একসময় ‘ফাইন্যান্সের জাদুকর’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন লেবাননের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর রিয়াদ সালামেহ। বিশ্বে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরদের একজন তিনি।

 

১৯৯৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টানা ৩০ বছর তিনি এ দায়িত্ব সামলেছেন। কিন্তু দায়িত্ব পালন শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই রিয়াদ সালামেহর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন ব্যাংকে ডু লিবানের এ গভর্নর।

গভর্নরের গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আরেকটি ঘটনা দেখা যায় অ্যাঙ্গোলায়। মধ্য আফ্রিকার দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ভালতের ফিলিপে দা সিলভা ২০১৭ সালে বরখাস্ত হন। তার বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ব্যাংক অব অ্যাঙ্গোলা থেকে ৫০ কোটি ডলার অবৈধভাবে বিদেশে স্থানান্তরের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। ২০২০ সালে তিনি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন। এ মামলায় তার সঙ্গে দেশটির আরো কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার বিচার হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন অ্যাঙ্গোলার সাবেক প্রেসিডেন্টের ছেলেও।

উন্নয়নশীল কিংবা দরিদ্র দেশের পাশাপাশি চলতি শতাব্দীতে জার্মানির মতো উন্নত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক গভর্নরের বিরুদ্ধেও অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। ২০০৪ সালে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ডয়চে বুন্দেসব্যাংক) প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন আর্নস্ট ভেলটেক। অভিযোগ ছিল, একটি বেসরকারি ব্যাংক বার্লিনের কোনো বিলাসবহুল হোটেলে এ গভর্নর ও তার পরিবারের থাকার খরচ (প্রায় ৭ হাজার ৭০০ ইউরো) বহন করেছিল। ফ্রাংকফুর্টের প্রসিকিউটররা এ বিষয়ে তদন্ত করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের হয়নি। তবে এ ঘটনায় ভেলটেককে ২৫ হাজার ইউরো জরিমানা গুনতে হয়েছিল।

 

বিশ্বের অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর কিংবা জ্যেষ্ঠ অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি কিংবা স্বার্থের সংঘাতে জড়ানোর অভিযোগ উঠলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো এত বিস্তৃত অভিযোগ কোথাও পাওয়া যায় না। ২০০৯ সাল-পরবর্তী দেড় দশকজুড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকারী তিন গভর্নরের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। এ গভর্নরদের সঙ্গে তদন্তের জালে জড়িয়েছেন বিভিন্ন সময়ের সাতজন ডেপুটি গভর্নর, অনেক নির্বাহী পরিচালকসহ অন্তত ৫৫ জন কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত, সম্পদ জব্দ ও নথিপত্র তলবের মতো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর (এস কে) চৌধুরী ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস গ্রেফতার হয়েছেন। সাবেক গভর্নরদের মধ্যে ড. আতিউর রহমান ও আব্দুর রউফ তালুকদারের কোনো হদিস নেই। আর অনেক সাবেক ডেপুটি গভর্নরও লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়েছেন।

অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় সারা বিশ্বেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বা প্রধানরা জাতীয় নায়কের সম্মান পেতেন। এ পদে নিযুক্তরা ছিলেন এমন ব্যক্তি, যাদের বক্তব্য বাজারে আস্থা তৈরি করত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্য গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারাও বাড়তি সম্মান ও মর্যাদা পেতেন। কিন্তু ‘সেলিব্রিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকারের যুগ’ বিশ্বব্যাপীই শেষ হতে চলেছে। আর বাংলাদেশে সে ইমেজ বাড়তি সংকটে। পতিত আওয়ামী লীগের শাসনামলে ব্যাংক লুটে অলিগার্কদের সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাও অস্বস্তিতে পড়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানের অভিজ্ঞতা ও মন্তব্য সে রকমই। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকোনো দেশের ব্যাংক তথা আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক। এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো ব্যাংক খাতের অভিভাবকত্ব ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখা। এখন যদি গভর্নরসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে, নীতিনির্ধারকদের সততা ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে জনগণের আস্থার ঘাটতি হবে এটিই স্বাভাবিক। কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরপর তিন গভর্নর ও সব পরিচালকের তথ্য চাওয়া হলে সেটি নিয়েও বিদেশীদের কাছে খারাপ বার্তা যায়।’ ২০০৯ সাল-পরবর্তী দেড় দশকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী (২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষমতাচ্যুত) ছাড়া আর কেউ স্বাধীন ছিলেন না বলেও মন্তব্য করেন আরিফ হোসেন খান।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সম্মানিত আর্থিক নীতিনির্ধারকদের একটি শ্রেণীতে পরিণত হয়েছিলেন। বিভিন্ন দেশে রাজনীতিবিদরা যখন সংকট মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররাই অর্থনীতিকে ধস থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেন। সুদের হার কমানো, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপুল অর্থ সরবরাহ করা এবং আর্থিক বাজারকে স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে তারা বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছিলেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান বেন বার্নানকে, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট মারিও দ্রাঘি এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর মার্ক কার্নির মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা শুধু অর্থনীতিবিদ ছিলেন না; তারা প্রায় জননায়কের মর্যাদা পেয়েছিলেন।

অনেকের কাছে তারা ছিলেন রাজনীতির বাইরে থাকা দক্ষ নীতিনির্ধারক, যারা কঠিন সময়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। এর পুরস্কারও পেয়েছেন এ তিন অর্থনীতিবিদ। ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান বেন বার্নানকে ২০২২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট মারিও দ্রাঘি পেয়েছিলেন ইতালির প্রধানমন্ত্রীর পদ। আর ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাবেক গভর্নর মার্ক কার্নি দায়িত্ব নিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রীর।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিত্রটি পুরোপুরি বিপরীত। ২০০৯ সাল-পরবর্তী প্রায় আট বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. আতিউর রহমান। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তুমুল সমালোচনার মুখে ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ গভর্নর পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। তার সময়ে দেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। বেসিক ব্যাংকের লুণ্ঠন, সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, জনতা ব্যাংকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারিসহ বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে অলিগার্কদের প্রভাব বিস্তার শুরু হয় এ সময়ে। গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটলে ড. আতিউর রহমানও দেশ ছাড়েন। একসময় ‘গরিবের অর্থনীতিবিদ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ অধ্যাপকের ঘাড়ে এখন রিজার্ভ চুরির মামলার খড়্গ ঝুলছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) রিজার্ভ চুরির মামলায় যে খসড়া অভিযোগপত্র তৈরি করেছে, সেটিতে আতিউর রহমানকেও আসামি করা হয়েছে।

আতিউর রহমান ও পরে গভর্নর ফজলে কবিরের মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রভাবশালী ডেপুটি গভর্নর ছিলেন সিতাংশু কুমার (এস কে) সুর চৌধুরী। গত বছরের ১৪ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক গ্রেফতার হন তিনি। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে তার গোপন লকার তল্লাশি করে ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সমমূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১ কেজি ৫ গ্রাম স্বর্ণ, ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩০০ ডলার ও ৫৫ হাজার ইউরো।

এরপর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করা হয়। গত বছরের ১৭ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিবি) সহায়তায় দুদক তাকে গ্রেফতার করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদমর্যাদার এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

২০১৬ সালের ২০ মার্চ থেকে ২০২২ সালের ৩ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন সাবেক অর্থ সচিব ফজলে কবির। এরপর ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪-এর ৯ আগস্ট পর্যন্ত গভর্নর ছিলেন আব্দুর রউফ তালুকদার। এ দায়িত্ব নেয়ার আগে তিনিও অর্থ সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এ দুই গভর্নরের বিরুদ্ধে এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটে নীতিগত সুবিধা দেয়ার অভিযোগ এনে দুদক থেকে তাদের ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও মেয়াদের যাবতীয় রেকর্ড তলব করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০০৯ সাল-পরবর্তী ১৫ বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও তলব করেছে সংস্থাটি। গত ১১ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো দুদকের চিঠিতে বলা হয়, অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য উপপরিচালক মো. মোমিনুল ইসলামকে টিম লিডার এবং উপপরিচালক রণজিৎ কুমার কর্মকার ও উপসহকারী পরিচালক মো. ইয়াছিন মোল্লাকে সদস্য করে তিন সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে।

বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ব্যতিক্রম বলে মনে করেন সাবেক অর্থ সচিব এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কোনো রাষ্ট্র যখন জিম্মি হয়ে যায়, তখন সেটির প্রভাব তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে যায়। ২০০৯ সাল-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো গভর্নর স্বাধীন ছিলেন বলে মনে হয় না। সেখানে যা কিছু হয়েছে, সেটি রাষ্ট্র জিম্মি হয়ে যাওয়ার ফল।’

পতিত সরকারের চাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা নতি স্বীকার করলেও পাশের দেশ ভারতে ভিন্ন রকম উদাহরণ আছে। দেশটির ব্যাংক খাতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি সংঘটিত হলেও রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) গভর্নর বা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো অভিযোগ ওঠেনি। কোনো গভর্নর বা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গ্রেফতারও হননি। বরং ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নরের দায়িত্ব পালনকারী রঘুরাম রাজন সরকারের চাওয়াকে উপেক্ষা করে মুদ্রানীতি ও সুদহার নির্ধারণ করেছিলেন। আর নরেন্দ্র মোদি সরকারের সঙ্গে মতবিরোধ, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবহার ও নীতিগত স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধের জেরে পদত্যাগ করেছিলেন আরবিআইয়ের গভর্নর উর্জিত প্যাটেল।

ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষ করে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক প্রতারণা ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিজিং ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের সংকটের পর আরবিআইয়ের তদারকি নিয়ে সমালোচনা হয়। তবে এসব ঘটনায়ও কোনো ডেপুটি গভর্নরকে ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার বা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়নি। আর্থিক খাতে সুশাসনের সুফল পেয়েছে ভারত। বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশটির ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন ২ দশমিক ২ শতাংশ। যেখানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের এক-তৃতীয়াংশ ঋণই এখন খেলাপি।

দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার কিংবা ফৌজদারি অপরাধের তদন্তের মুখে পড়তে দেখা যায়নি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো গভর্নর কিংবা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকেও। আর শ্রীলংকা ও নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে গভর্নরদের বিরুদ্ধে প্রধানত নীতিগত ও প্রশাসনিক সমালোচনা দেখা গেলেও ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার বা ফৌজদারি বিচারের ঘটনা বিরল।

২০০৯ সাল-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে যেটি হয়েছে, সেটি কোনো সংজ্ঞা বা বিচার-বিবেচনার মধ্যে পড়ে না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কোনো নীতি গ্রহণ কিংবা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভুল হতে পারে। টেকনিক্যাল কারণে খেলাপি ঋণ বাড়তে পারে, কোনো ব্যাংক খারাপ হতে পারে। অতীতেও বাংলাদেশ ব্যাংকে কিছু ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনিয়ম-দুর্নীতির সহযোগী হয়ে পড়ার ঘটনা গোটা বিশ্বে বিরল। এ ধরনের দ্বিতীয় কোনো ঘটনা বিশ্বে আছে বলে আমার জানা নেই।’

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তার সময়ে গভর্নরের পদমর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতে বেশ আলোচনা হয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের জন্য খসড়াও চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাস্তবায়ন করেনি।

এ বিষয়ে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বায়ত্তশাসনসহ নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চর্চাকারী ব্যক্তিকে সৎ হতে হবে। ব্যক্তি যদি অসৎ হয়, তাহলে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দুর্নীতিকে আরো বেশি উৎসাহিত করে। ২০০৯ সাল-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশির ভাগ কর্মকর্তা যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কাজ করেছেন, যে পরিমাণ অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিজেদের জড়িয়েছেন, তাতে স্বায়ত্তশাসন কিংবা ক্ষমতা বৃদ্ধি ভালো কিছু হতো না। এ কারণে আমি বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনে সায় দিইনি। আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে সুশাসন কার্যকর করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা রীতিনীতি মেনে চললে ব্যাংক খাত সঠিক পথে ফিরতে বাধ্য হবে।’

২০০৯ সাল-পরবর্তী দেড় দশকে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির জেরে দেশের ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি এখন বিপর্যস্ত ও নাজুক। দুই ডজনেরও বেশি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। আর গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা ঘটছে অন্তত এক ডজন ব্যাংকে। ২০০৯ সালে ব্যাংক খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা, সেটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকে। ওই সময় ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশই ছিল খেলাপি। গত বছরের শেষ তিন মাসে বিশেষ ছাড় দিয়ে পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমানো হয়। তবে এর পরও চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। দেশে খেলাপি ঋণের বিদ্যমান হারও গোটা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হলেও প্রতিবেশী ভারতে এ হার এখন মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। আর পাকিস্তানের খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। তিন বছর আগে দেউলিয়াত্বের মুখে থাকা শ্রীলংকায়ও খেলাপি ঋণের হার এক অংকের ঘরে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে পারছে না অনেক ব্যাংক। এর প্রভাবে ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে গেছে। যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে চর্চিত ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী, সিআরএআর সর্বনিম্ন ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা। কার্যকর অর্থনীতির কোনো দেশের ব্যাংক খাতের গড় মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে আধুনিক বিশ্বের বিরল ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ঋণাত্মক ধারায় চলে গেলেও এ সময়ে আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়েছে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার ব্যাংকগুলো সিআরএআর। পাকিস্তানের ব্যাংক খাতে সিআরএআর এখন প্রায় ২১ শতাংশ। আর শ্রীলংকার ব্যাংক খাতে এ হার ১৯ শতাংশেরও বেশি। ভারতের ব্যাংকগুলোর গড় সিআরএআর ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ বলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫-এ তুলে ধরা হয়েছে। যদিও মাত্র তিন বছর আগেও অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়াত্বের মুখে পড়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকা ও পাকিস্তান।