খুলনার আইনশৃঙ্খলা
» পাঁচ দিনে গুলির ঘটনা তিনটি , ছয় মাসে ১৯ হত্যাকাণ্ড । » সন্ত্রাসীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পরিস্থিতি বেসামাল । » জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে সন্ত্রাসীরা । পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় ভাষ্য , খুলনায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস । প্রকাশ্যে গুলি , কুপিয়ে হত্যা , চাঁদাবাজি , মাদক ও অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ , আধিপত্য বিস্তার এবং পুরোনো বিরোধকে কেন্দ্র করে এসব হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনা ঘটছে । পুলিশের তথ্য অনুযায়ী , চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত
" প্রতিটি ঘটনার তদন্ত হয়েছে , অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে , আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে । আশা করা হচ্ছে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে । মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান কমিশনার , কেএমপি খুলনা মহানগরে ১৯ টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে । আর ২০২৪ - এর জুলাই- আগস্টে গণ - অভ্যুত্থানের পর ঘটেছে ৩৪ টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা , যেগুলোতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী । আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে , নগরীতে অন্তত কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে । এসব
গ্রুপের সদস্যরা এখন এতটাই বেপরোয়া যে জনবহুল এলাকাতেও অস্ত্র ব্যবহার করতে দ্বিধা করছে না । পুলিশের দাবি , অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামি শনাক্ত করা হয়েছে । তবে স্থানীয়দের অভিযোগ , গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে সন্ত্রাসীরা আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হচ্ছে না । খুলনায় কেন একের পর এক খুনোখুনি হচ্ছে এবং কেন তা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না — জানতে চাইলে খুলনা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান গত শুক্রবার আজকের পত্রিকাকে বলেন , ‘ মহানগরে প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস । পাশেই সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা , যশোর , বাগেরহাট জেলা । অবৈধ অস্ত্র , মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলেছে । তবে প্রতিটি ঘটনার তদন্ত হয়েছে , অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে , আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে ।
কথার আগে চলছে গুলি আশা করা হচ্ছে , পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে । ” দাপট দেখাচ্ছে যেসব সন্ত্রাসী গ্রুপ : খুলনার অধিকাংশ আলোচিত অপরাধে ঘুরেফিরে কয়েকটি সন্ত্রাসী বাহিনীর নাম উঠে এসেছে । এগুলো হলো রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর ‘ বি কোম্পানি ’ , শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ , হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী , আশিক বাহিনী , নূর আজিম গ্রুপ , টেংকি শাওন গ্রুপ , আরমান শেখের আরমান গ্রুপ , শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ এবং নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ । আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন , এসব বাহিনী এখন এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে জনবহুল এলাকাতেও প্রকাশ্যে গুলি করতে দ্বিধা করছে না ।
সাধারণ মানুষও ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহস পাচ্ছে না । যদিও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ , আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বল তৎপরতা ও দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এসব বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়েছে । কাগজে - কলমে পুলিশের কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা রয়েছে । অভিযানও চলে । মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার ও মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের কথাও জানানো হয় । কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারীরা অধরাই থেকে যায় । কেউ গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আসে । ফলে একটি হত্যাকাণ্ড থেকে আরেকটি হত্যার পটভূমি তৈরি হচ্ছে । জামিনে বেরিয়ে আবারও সক্রিয় : পুলিশ , কারাগার এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে
কথা বলে জানা গেছে , খুলনার একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাদের সক্রিয় সদস্যরা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছে । মুক্তি পাওয়ার পর তারা আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে । খুলনা পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায় , ২০২৪ সালের ১৩ মে তৎকালীন ঝিনাইদহ -৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে ভারতের কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে হত্যা করা হয় । বহুল আলোচিত ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন দক্ষিণ - পশ্চিমাঞ্চলের শীর্ষ চরমপন্থী আমানুল্লাহ সাঈদ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া গত ৮ জুন তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন হাইকোর্ট । গত ২২ ডিসেম্বর মাদকের ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরে গুলিবিদ্ধ হন এনসিপি নেতা মোতালেব শিকদার । ওই ঘটনার চার দিন পর নগরের বসুপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন শুটার শামীম ওরফে ঢাকাইয়া শামীম ও তাঁর সহযোগী । পরে ১৩ মে তিনি জামিনে মুক্তি পান । আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি , কারাগার থেকে বেরিয়ে ঢাকাইয়া শামীম ও তার সহযোগীরা আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন ।
শুধু ঢাকাইয়া শামীম নন , কোম্পানির প্রধান গ্রেনেড বাবু , নূর আজিম বাহিনীর সদস্যসহ আরও কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যও সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন । পুলিশের গোয়েন্দা সূত্র জানায় , গত ৬ মে রাতে খুলনার একটি শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর সহযোগী কালা তুহিনসহ তিনজনকে রিভলবার , গুলি ও মাদকসহ বটিয়াঘাটার চক্রাখালী এলাকা থেকে নৌবাহিনী ও
সেনাবাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তার করেন । পরে কালা তুহিন ও জিতু নামের দুই সন্ত্রাসী কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান । আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি , মুক্তি পাওয়ার পর যৌথ বাহিনীকে তথ্য দিয়ে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা করায় ৮ মে আজিজুল নামের এক ব্যক্তিকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে বটিয়াঘাটার নির্জন এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করে কালা তুহিনের সহযোগীরা । এরপর তাদের হামলায় নিহত হন কাজী রাশেদ নামের আরও এক যুবক । এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কেএমপি কমিশনার জাহিদুল হাসান বলেন , ‘ আমাদের দায়িত্ব আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা । জামিন দেওয়া বা কারাগার থেকে মুক্তির সিদ্ধান্ত আদালতের ।
জামিনে বের হলে আমাদের কিছু করার থাকে না । ” কমিশনার আরও বলেন , অনেক সময় দেখা যায় , অপরাধীরা শহরের বাইরে থেকে এসে অপরাধ করে দ্রুত চলে যায় । এতে তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়ে । তারপরও অপরাধ দমনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ । তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড . সেলিনা আহমেদ । তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন , পরিবার , শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান , সামাজিক সংগঠন ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে । সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠন এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি ।