Image description

সাড়ে ছয় মাস আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করে সরকার; কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের গালিফতির কারণে এত দিনেও প্রধান শিক্ষকদের বেতন ফিক্সেশন হয়নি। শিক্ষকরা দ্বারে দ্বারে অনেক ঘুরেও এ ব্যাপারে ফল পাচ্ছেন না।

এখনো পাচ্ছেন না দশম গ্রেডের বেতন ও মর্যাদা। দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হলেও ৩০ হাজার প্রধান শিক্ষকের কেউ ১১তম গ্রেডে, কেউ ১২তম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন।

গত ১৫ ডিসেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বিদ্যমান বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী বর্তমান গ্রেড-১১ (স্কেল : ১২,৫০০-৩০,২৩০ টাকা) থেকে গ্রেড-১০ (স্কেল : ১৬,০০০-৩৮,৬৪০ টাকা) গেজেটেড কর্মকর্তা-এ উন্নীত করা হলো। জারির তারিখ থেকে এ আদেশ কার্যকর হবে।

’ প্রজ্ঞাপন জারির দিনই প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বরাবর দশম গ্রেডে বেতন ফিক্সেশনের জন্য চিঠি দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়; কিন্তু আজও প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে উন্নীত করা হয়নি।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকদের বেতন ফিক্সেশন না হওয়ার ব্যাপারটি এত দিন আমার নজরে আনা হয়নি। সম্প্রতি ব্যাপারটি জানতে পেরেছি। এর পরই আমি উদ্যোগ নিয়েছি।

হিসাব মহানিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসারকে ডেকেছি। যেকোনো মূল্যে বিষয়টি আমরা সমাধান করব।

সূত্র জানায়, ৪৫ জন প্রধান শিক্ষকের রিট আবেদনের ফলে ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ তাঁদের দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করার রায় দেন আদালত। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৭ অক্টোবর ওই ৪৫ জনকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু এরপর সব প্রধান শিক্ষক একযোগে মামলার প্রস্তুতি নিলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদটিই দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে শুধু ১১তম গ্রেড থেকে ১০তম গ্রেডে উন্নীতকরণের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু অনেক প্রধান শিক্ষক এখনো ১২তম গ্রেডে আছেন। যেহেতু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বেতন গ্রেড ১১, তাই চিঠিতে ওই গ্রেডের কথাই উল্লেখ আছে, যা নিয়ে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫-এর ধারা ৬-এর উপধারা (৬)-এর মাধ্যমে এর মধ্যে ১২তম গ্রেডের প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডে উন্নীতকরণের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁদের প্রশিক্ষণ নেই, তাঁরা দশম গ্রেডে বেতন ফিক্সেশনের ১৮ মাসের মধ্যে প্রশিক্ষণ নেবেন। হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ করে সমস্যার সমাধান করতে পারে; কিন্তু দুই দপ্তরের গাফিলতির কারণে বিষয়টি ঝুলে আছে।

হিসাব মহানিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার আ ন ম শহীদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন কিন্তু বেতন ফিক্সেশন হয় অনলাইনে। ফলে প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে ফিক্সেশন করতে গিয়ে আমরা কিছু সমস্যা পেয়েছি, যা চিহ্নিত করে কিভাবে তা সমাধান করা যায়, সেটা উল্লেখ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছি; কিন্তু তাদের কাছ থেকে আমরা এখনো কোনো সাড়া পাইনি। ফলে পুরো কাজটিই আটকে আছে। মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগেই এ সমস্যার সমাধান হতে পারে।

শিক্ষকরা বলেন, দশম গ্রেডের (গেজেটেড কর্মকর্তা) বেতন ফিক্সেশন না হওয়ায় আমরা চরম আর্থিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। সামনেই কার্যকর হতে যাওয়া নবম জাতীয় বেতন স্কেল, ২০২৬-এর বেতন ফিক্সেশনের আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাস++ এ বেতন ফিক্সেশন না হলে আমরা আরো জটিলতার মধ্যে পড়ব। আসলে আমাদের যে অবস্থায় রাখা হয়েছে, এর দায় নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। বেতন ফিক্সেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়) এই সীমাহীন বঞ্চনার দায় এড়াতে পারেন না।   

জানা যায়, বর্তমানে সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯। এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক কর্মরত। বাকি বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকদের চলতি দায়িত্ব বা ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে চালানো হচ্ছে। মূলত মামলাজনিত কারণে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ বা পদোন্নতি দিতে পারছিল না সরকার। তবে গত বৃহস্পতিবার আদালতের এক আদেশের ফলে সব জটিলতা দূর হয়েছে। এখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শূন্য থাকা প্রধান শিক্ষক পদের মধ্যে ৩২ হাজার পদে পদোন্নতি এবং বাকি পদে সরাসরি নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে, যাঁরা সবাই দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা ও দশম গ্রেডে বেতন পাবেন। 

বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি রিয়াজ পারভেজ কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রধান শিক্ষকরা বর্তমান সরকারের ভিশন অনুযায়ী মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি; কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, প্রধান শিক্ষকদের উন্নীত দশম গ্রেডের (গেজেটেড কর্মকর্তা) বেতন ফিক্সেশন বা বেতন নির্ধারণে দীর্ঘ ছয় মাস পার হলেও কাজ শুরু হয়নি। ফলে প্রধান শিক্ষকরা চরম আর্থিক ক্ষতি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এমনকি শিগগিরই কার্যকর হতে হওয়া নবম পে স্কেলের বেতন নির্ধারণের আগে দশম গ্রেডের বেতন নির্ধারণ করা না হলে প্রধান শিক্ষকরা সীমাহীন আর্থিক ক্ষতির শিকার হবেন।

প্রধান শিক্ষক সংগঠনের নেতারা বলছেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যে যদি দশম গ্রেডের (গেজেটেড কর্মকর্তা) বেতন ফিক্সেশন শুরু করা না হয়, তাহলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে (সিজিএ) প্রধান শিক্ষকরা সর্বাত্মক অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন।