স্মার্টফোনে কোনো সমস্যা হলেই সেটি ঠিক করতে বা মেরামতের জন্য সাধারণত সার্ভিস সেন্টারে ছুটতে হয়। এতে অর্থের পাশাপাশি সময়ও ব্যয় হয়। তবে নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ফেয়ারফোন এমন একটি স্মার্টফোন বাজারে এনেছে– যেটির ব্যাটারি, স্ক্রিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহারকারী নিজেই পরিবর্তন করতে পারবেন। শুধু তাই নয়, ফোনটির সফটওয়্যার ও নিরাপত্তা হালনাগাদের নিশ্চয়তাও দেয়া হয়েছে দীর্ঘ সময়ের জন্য।
নতুন এই ফোনের নাম ফেয়ারফোন জেন ৬ প্লাস (Fairphone Gen 6+)। এর দাম ৬৫০ ডলার (প্রায় ৮০ হাজার টাকা)। এক দশকের বেশি সময় ধরে সহজে মেরামতযোগ্য স্মার্টফোন তৈরি করছে ফেয়ারফোন। তবে এই প্রথম প্রতিষ্ঠানটির কোনো স্মার্টফোন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ছাড়া হয়েছে।
ফোনটি ব্যবহার ও পরীক্ষা করে প্রযুক্তিপণ্য পর্যালোচনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউইয়র্ক টাইমসের ওয়্যারকাটার। কয়েক সপ্তাহ ধরে একাধিক পরীক্ষকের ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়ন, ফেয়ারফোন জেন ৬ প্লাস ভালো মানের একটি স্মার্টফোন। তবে এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
স্ক্রু ড্রাইভার দিয়েই বদলানো যাবে ব্যাটারি
ফেয়ারফোনের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এটি মেরামতের জন্য ব্যবহারকারীকে সার্ভিস সেন্টারে যেতে হবে না। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট থেকে স্ক্রিন, ব্যাটারিসহ ১৩ ধরনের যন্ত্রাংশ কেনা যায়। ফোনের সঙ্গে দেয়া টরক্স টি৫ স্ক্রু ড্রাইভার এবং ফেয়ারফোনের ধাপে ধাপে দেয়া নির্দেশনা অনুসরণ করেই বেশির ভাগ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
সাধারণ স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে এমন সুবিধা বিরল। অধিকাংশ ফোনে যন্ত্রাংশগুলো আঠা দিয়ে একটির ওপর আরেকটি বসানো থাকে। এতে ফোনের নকশা পাতলা ও আকর্ষণীয় করা গেলেও মেরামত কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান স্বল্প পরিসরে নিজে মেরামতের কিট বিক্রি করলেও সেগুলো ব্যবহার করা বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ।
ওয়্যারকাটারের একজন পরীক্ষক জানান, তিনি ফোনটির ব্যাটারি নিজেই পরিবর্তন করে দেখেছেন। ফেয়ারফোনের ওয়েবসাইট থেকে নতুন ব্যাটারি কিনতে কর ও শিপিংসহ খরচ হয়েছে ৫০ ডলার ৭৪ সেন্ট। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, কোনো নির্দেশনা না দেখেই মাত্র ১১ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে ফেয়ারফোনের ব্যাটারি পরিবর্তন করতে পেরেছেন ওই পরীক্ষক।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, অন্য ব্র্যান্ডের ফোনে ব্যাটারি পরিবর্তনে আনুমানিক ৯৩ ডলার এবং স্ক্রিন পরিবর্তনে ২৩৪ ডলার খরচ হতে পারে। ফেয়ারফোনের ক্ষেত্রে একই কাজের জন্য ব্যাটারিতে ৪০ ডলার এবং স্ক্রিনে ৯০ ডলার খরচ হবে।
এ ছাড়া উৎপাদনজনিত ত্রুটির ক্ষেত্রে ফোনটিতে পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি দিচ্ছে ফেয়ারফোন।
ফেয়ারফোন জেন ৬ প্লাস-এর পারফরম্যান্স, ক্যামেরা ও অন্যান্য
পারফরম্যান্সের দিক থেকেও পিছিয়ে নেই ফেয়ারফোন জেন ৬ প্লাস। ওয়্যারকাটারের পরীক্ষকেরা জানিয়েছেন, দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি তুলনামূলক ভারী কাজও স্বাচ্ছন্দ্যে সামলাতে পেরেছে ফোনটি। গেম খেলা, কয়েক মাইল পথ চলতে নেভিগেশন ব্যবহার কিংবা একই সঙ্গে একাধিক অ্যাপ ও অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় কোনো উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখা যায়নি।
ফোনটিতে রয়েছে স্ন্যাপড্রাগন ৭এস জেন ৪ প্রসেসর এবং ১২ জিবি র্যাম। গুগল পিক্সেল ১০এ, স্যামসাং গ্যালাক্সি এ৫৭ ৫জি ও আইফোন ১৭ই-এর মতো মাঝারি দামের ফোনগুলোর তুলনায় এতে ৫০ শতাংশ বেশি র্যাম রয়েছে।
এতে আরও রয়েছে ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেটের ৬ দশমিক ৩ ইঞ্চি ওএলইডি ডিসপ্লে, ৪ হাজার ৪১৫ মিলিঅ্যাম্পিয়ার-আওয়ারের ব্যাটারি এবং ৩০ ওয়াট দ্রুত চার্জিং সুবিধা।
ব্যাটারি একবার চার্জে এক দিনের বেশি চলে। তবে ফেয়ারফোনের বিজ্ঞাপনে দাবি করা দুই দিনের ব্যাটারি ব্যাকআপ পাওয়া যায়নি। ফোনটিতে শুরু থেকেই অপ্রয়োজনীয় কোনো অ্যাপ ইনস্টল করা নেই। ফলে ব্যাকগ্রাউন্ডে এসব অ্যাপ চালু থেকে ব্যাটারির চার্জ খরচ করার ঝুঁকিও কম।
ক্যামেরার ক্ষেত্রেও পরীক্ষকদের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক। ফোনটিতে রয়েছে ৫০ মেগাপিক্সেলের প্রধান ক্যামেরা, ১৩ মেগাপিক্সেলের আলট্রাওয়াইড ক্যামেরা এবং ৩২ মেগাপিক্সেলের ফ্রন্ট ক্যামেরা। প্রতি সেকেন্ডে ৩০ ফ্রেমে ৪কে ভিডিও ধারণ করা যায়।
ওয়্যারকাটারের পরীক্ষকেরা দিনের আলো ও ছায়ায়, বাইরে এবং ঘরের ভেতরে ছবি তুলে ক্যামেরার দ্রুত সাড়া দেয়ার বিষয়টি লক্ষ করেছেন। একটি ছবি তোলার পর সেটি প্রক্রিয়াজাত হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করেই পরের ছবি তোলা গেছে।
তাদের মতে, ফোনটির ক্যামেরায় তোলা ছবিতে অতিরিক্ত রং সংশোধন বা কৃত্রিম প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রবণতা কম। ফলে ছবিগুলো অনেক বেশি স্বাভাবিক দেখায়। তবে কিছু ছবিতে প্রত্যাশামতো ফোকাস পাওয়া যায়নি। আবার একটি বড় মাশরুমের তোলা ছবিও কিছুটা নিষ্প্রভ ও প্রাণহীন মনে হয়েছে।
মনোযোগ ধরে রাখার বিশেষ সুবিধা
ফেয়ারফোন জেন ৬ প্লাসে রয়েছে ‘মোমেন্টস’ নামের বিশেষ একটি মোড। এটি ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখতে স্মার্টফোনের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানোর জন্য তৈরি।
ফোনটির ডান পাশে থাকা উজ্জ্বল হলুদ রঙের সুইচটি চালু করলে সীমিত কিছু সুবিধা ব্যবহার করা যায়। ব্যবহারকারী চাইলে কোন কোন বার্তা ও কল আসবে, তা নির্ধারণ করতে পারবেন। অন্য সব কল ও নোটিফিকেশন নীরব থাকবে।
তবে হোয়াটসঅ্যাপ বা সিগন্যালের মতো তৃতীয় পক্ষের মেসেজিং অ্যাপের নোটিফিকেশন আলাদাভাবে চালু রাখার সুবিধা এতে নেই। চাইলে এসব অ্যাপ হোম স্ক্রিনে রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যায়।
ওয়্যারকাটারের পরীক্ষকেরা বই পড়ার সময় কিংবা কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে এই মোড ব্যবহার করেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কল মিস হয়ে যাচ্ছে কি না, সে ধরনের অস্বস্তিও অনুভব করেছেন তাঁরা। কেউ এই মোড ব্যবহার করতে না চাইলে সেটিংস থেকে সুইচটির কাজ পরিবর্তন কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারবেন।
২০৩৩ সাল পর্যন্ত নিরাপত্তা হালনাগাদ
দীর্ঘদিন ব্যবহারের উপযোগী স্মার্টফোন হিসেবে ফেয়ারফোন জেন ৬ প্লাসকে আকর্ষণীয় মনে করছে ওয়্যারকাটার। প্রতিষ্ঠানটি ফোনটির জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং ২০৩২ সাল পর্যন্ত অ্যান্ড্রয়েড হালনাগাদ দেয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে। অর্থাৎ বাজারে আসার সময় থেকে অন্তত সাত বছর ফোনটি ব্যবহারের উপযোগী রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুরোনো ফোনের ব্যবহার বাড়াতে পুনর্ব্যবহার ও রিসাইক্লিং কর্মসূচিও রয়েছে ফেয়ারফোনের। এর মাধ্যমে শুধু ফেয়ারফোনের পুরোনো ডিভাইস নয়, অন্যান্য ব্র্যান্ডের ফ্ল্যাগশিপ ফোন জমা দিয়েও স্টোর ক্রেডিট পাওয়া যায়। ফলে পুরোনো ফোন ফেলে না দিয়ে নতুন ফোন কেনার ক্ষেত্রে সেটি কাজে লাগানো সম্ভব।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস