Image description

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলকে আরও কার্যকর করতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ তথ্য। ইন্টারনেটে সহজে পাওয়া যায় না, এমন পুরোনো ও দুর্লভ বইও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হতে পারে। আর সেই কারণেই কি হঠাৎ বাড়ছে সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের চাহিদা? যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের বই বিক্রেতাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা অন্তত এমন প্রশ্নই সামনে এনেছে।

গত কয়েক মাসে ফ্রিল্যান্স বই বিক্রেতারা অস্বাভাবিক বড় কিছু অর্ডার পাচ্ছেন। এসব অর্ডারে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ভিত্তিক ধারাবাহিকতা নেই। ১৮ শতকের কৃষিবিষয়ক বই, দুর্লভ ল্যাটিন ভাষার বই থেকে শুরু করে রেসিংয়ের জীবনী বা কাউবয় উপন্যাস—বিভিন্ন ধরনের পুরোনো বই কিনছেন ক্রেতারা। অনেক বইয়ের তথ্য অনলাইনে সহজে পাওয়া যায় না।

নর্থাম্বারল্যান্ডের বারটার বুকসের সহ-মালিক স্টুয়ার্ট ম্যানলি বলেন, তার দোকানে সাধারণত সপ্তাহে দুই থেকে তিন হাজার বই বিক্রি হয়। কিন্তু সম্প্রতি কানাডার একটি প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অর্ডারেই প্রায় সাত দিনের স্বাভাবিক বিক্রির সমান বই বিক্রি হয়েছে। ৩০ বছরের সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের ব্যবসায় এমন ঘটনা তিনি আগে দেখেননি বলেও জানান।

ম্যানলি একা নন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বই বিক্রেতারাও একই ধরনের বড় অর্ডারের কথা জানিয়েছেন। এসব বই শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই তারা জানেন না। কিছু ক্রেতা ছদ্মনাম ব্যবহার করে একই গন্তব্যে বই পাঠাচ্ছেন। বড় অর্ডার হলেও তারা কোনো ছাড় চাইছেন না, যা সাধারণ সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের ক্রেতাদের আচরণের সঙ্গে মেলে না।

তবে এসব অর্ডারের সঙ্গে সরাসরি এআই কোম্পানির সম্পৃক্ততার নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বই বিক্রেতাদের সন্দেহ, এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য এসব বই সংগ্রহ করা হতে পারে।

 

আদালতের নথিতে এআইয়ের বই সংগ্রহ

এ ধরনের সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যান্থ্রপিকের বই সংগ্রহ ও ডিজিটাইজেশন প্রকল্পের তথ্য প্রকাশের পর। ২০২৫ সালে অ্যান্থ্রপিকের বিরুদ্ধে তিন লেখকের করা মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের এক বিচারক রায় দেন, এআই প্রশিক্ষণে এভাবে কেনা বই ব্যবহার দেশটির কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করে না। বিচারক উইলিয়াম আলসাপ অ্যান্থ্রপিকের বই ব্যবহারের পদ্ধতিকে ‘অত্যন্ত রূপান্তরমূলক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

পরে আদালতের নথি প্রকাশের পর জানা যায়, অ্যান্থ্রপিকের পুরোনো বই সংগ্রহ ও ডিজিটাইজেশনের প্রকল্পটির নাম ছিল ‘প্রজেক্ট প্যানামা’। এতে বইয়ের মেরুদণ্ড বা বাঁধাইয়ের অংশ কেটে দ্রুতগতিতে সব পৃষ্ঠা স্ক্যান করা হতো। এরপর বইয়ের অবশিষ্ট অংশ পুনর্ব্যবহার করা হতো।

অ্যান্থ্রপিকের একজন মুখপাত্র বলেছেন, তাদের এআই মডেল ক্লড প্রশিক্ষণে উন্মুক্ত ওয়েব ডেটা, বাণিজ্যিকভাবে সংগৃহীত ডেটাসেট এবং নিজেদের তৈরি করা ডেটা ব্যবহার করা হয়। বই সংগ্রহ করে এআই প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা পুরো শিল্পেই প্রচলিত একটি পদ্ধতি বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে তারা জানিয়েছে, তাদের কোনো ডেটা সংগ্রহ কর্মসূচিতে দুর্লভ বা পুরোনো বই কিনে ধ্বংস করা হয় না।

তারপরও বই স্ক্যান করে ধ্বংস করার বিষয়টি বই বিক্রেতা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

‘দুর্লভ বই ধ্বংস হলে ক্ষতি অপূরণীয়’

উত্তর লন্ডনের ওয়াল্ডেন বুকসের মালিক ডেভিড টোবিনও সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক কিছু বই বিক্রির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, বহু বছর বিক্রি না হওয়া কিছু বই আবার বিক্রি হওয়া ব্যবসার জন্য ভালো। তবে বইগুলো শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করা হলে তা দুঃখজনক হবে।

এডিনবার্গের ম্যাকনটানস বইয়ের দোকানের মালিক ডেরেক ওয়াকারও বিষয়টি নিয়ে দ্বিধার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, মাত্র ১০০ কপি ছাপা কোনো সাম্প্রতিক একাডেমিক বইয়ের একটি কপি নষ্ট হলে হয়তো বড় ক্ষতি হবে না, বিশেষ করে ওই বইয়ের ৭৫টি কপি যদি ইতোমধ্যে বিভিন্ন লাইব্রেরিতে থাকে। কিন্তু ১৮ শতকের কোনো বইয়ের একমাত্র টিকে থাকা কপি নষ্ট হলে সেটি হবে অনেক বড় ক্ষতি।

বই বিক্রেতা স্টুয়ার্ট ম্যানলিও মনে করেন, অনেক বইয়ের ক্ষেত্রে পুনর্ব্যবহার করা ভালো সমাধান হতে পারে। বিশেষ করে এমন বই, যেগুলোর বিপুলসংখ্যক কপি মানুষ আর ঘরে রাখতে চায় না। তিনি বলেন, তার ওয়েবসাইটে ২০ বছর ধরে বিজ্ঞাপন দেওয়া কিছু বইও এখন বিক্রি হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যে কপিরাইট নিয়ে ভিন্ন প্রশ্ন

এআই প্রশিক্ষণের জন্য বই কপি ও ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাজ্যের আইন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে আলাদা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাস্বত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এমিলি হাডসন বলেন, যুক্তরাজ্যে বইয়ের কপি তৈরি করে প্রশিক্ষণের জন্য একটি লাইব্রেরি তৈরি করা এবং সেই কপি ব্যবহার করে এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত কপিরাইট মালিকের অনুমতি প্রয়োজন।

বই বিক্রেতাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তাই এআইয়ের ক্রমবর্ধমান তথ্যের চাহিদার একটি সম্ভাব্য নতুন দিক সামনে আনছে। একদিকে বহু বছর ধরে অবিক্রীত থাকা বইয়ের চাহিদা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে দুর্লভ বই স্ক্যান করার পর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ফলে সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের বাজারে এআইয়ের প্রভাবের পাশাপাশি তথ্য সংরক্ষণ, কপিরাইট এবং বই সংগ্রহের নৈতিকতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।