Image description

বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে। উগ্র জাতীয়তা বোধের যে জোয়ারে একদিন নাড়িয়ে দিয়েছিল মার্কিন ক্যাপিটল হিলের দেয়াল, সেই স্রোতেই এখন ভাটার টান! জনপ্রিয়তার সে শ্বেতাঙ্গ আকাশেই এখন অসন্তোষের সূর্য! দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছর না যেতেই মার্কিনিদের মন থেকে

খসে পড়েছেন সেই ‘দুর্বার’ নায়ক ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট। ইপসোস-রয়টার্সের সর্বশেষ জরিপে গতকাল সেই আলামতই দেখল বিশ্ব। যেখানে দেখা যাচ্ছে, ভোটারদের মন থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রেকর্ড পতন যাকে বলে! দেশের মাত্র ৩৩ শতাংশ জনগণ তার ওপর সন্তুষ্ট! যার প্রভাব পড়বে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনেও!

ইরান যুদ্ধই কাল হয়ে দাঁড়াল ট্রাম্পের! যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের বেশি গড়াবে না— শুরুতে এমনই আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি। প্রায় ছয় মাস পর ছবিটা ঠিক উল্টো। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের শেষ কোথায়, তা নিয়ে অনিশ্চিত আমেরিকা; পেট্রল পাম্পে বাড়তি দাম গুনছেন সাধারণ মানুষ। আর সেই যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্যও এখন দিতে হচ্ছে হোয়াইট হাউজকে। সর্বশেষ জনমত জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন নেমে এসেছে তার বর্তমান প্রেসিডেন্সির সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

চার দিন ধরে চালানো রয়টার্স-ইপসস জরিপটি শেষ হয় সোমবার (১৭ আগস্ট)। ফল প্রকাশিত হয়েছে ১৮ আগস্ট। জরিপে অংশ নেওয়া ১ হাজার ১৬৬ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের মাত্র ৩৩ শতাংশ বলেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কাজ তারা অনুমোদন করেন। বিপরীতে ৬৪ শতাংশ তার কাজে অসন্তুষ্ট। মাসের শুরুতে ট্রাম্পের সমর্থন ছিল ৩৫ শতাংশ। বর্তমান ৩৩ শতাংশ শুধু দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্ন নয়, তার প্রথম মেয়াদে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের সর্বনিম্ন হারকেও ছুঁয়েছে। জরিপটির ত্রুটির সীমা তিন শতাংশ পয়েন্ট।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ইরান যুদ্ধ নিয়ে। জরিপে ৮০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা আরও দীর্ঘ সময় চলবে। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের ৮৭ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদেরও ৭১ শতাংশ একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। মাত্র ১৬ শতাংশ মনে করেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হতে পারে।

আর যুদ্ধটি আদৌ সেই মূল্য দেওয়ার মতো কি না, সেখানেও ট্রাম্পের জন্য অস্বস্তিকর বার্তা। সর্বশেষ জরিপে মাত্র প্রতি পাঁচজনের একজন বলেছেন, ইরান যুদ্ধের খরচ ও লাভ বিবেচনায় এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সার্থক হয়েছে। এমনকি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও এই মত দিয়েছেন মাত্র প্রায় অর্ধেক।

এর আগে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এপি-এনওআরসি জরিপেও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিনি বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধ লড়ার মতো ছিল না। তখন ট্রাম্পের ইরাননীতি অনুমোদন করেছিলেন মাত্র ২৮ শতাংশ; আগের মাসে হারটি ছিল ৩৪ শতাংশ। রিপাবলিকানদের মধ্যেও তাঁর ইরাননীতি নিয়ে সমর্থন ৭১ শতাংশ থেকে প্রায় ৬১ শতাংশে নেমেছিল।

ট্রাম্পের জন্য সমস্যাটা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, সরাসরি আমেরিকানদের পকেটেও পৌঁছেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর সংঘাত বিশ্বের তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশকে ব্যাহত করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহণ স্বাভাবিক না হওয়ায় পেট্রলের দাম বেড়েছে, যার চাপ পড়ছে মার্কিন পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয়ে। জুলাইয়ের শেষ দিকে জাতীয় গড় পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি চার ডলারের ওপরে উঠেছিল।

এখানেই ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার সংঘাত আরও স্পষ্ট। ২০২৪ সালের প্রচারে তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আমেরিকাকে দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ইরান যুদ্ধ শুরুর পরও প্রথম দিকে বলেছিলেন, সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। তার যুক্তি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতেই সামরিক অভিযান জরুরি। কিন্তু তেহরান এখনও নতি স্বীকার করেনি এবং হরমুজে তেল চলাচলও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

গত শুক্রবার নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে এক রাজনৈতিক সমাবেশে জ্বালানির বাড়তি দাম নিয়েও নিজের অবস্থান রক্ষা করেন ট্রাম্প। তার বক্তব্য, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখতে হলে সাধারণ মানুষকে পেট্রলের জন্য সামান্য বেশি দাম দিতে হলেও সেটি মেনে নেওয়ার মতো মূল্য। কিন্তু জনমত জরিপ বলছে, সাধারণ ভোটারের অগ্রাধিকার অন্য দিকে সরে যাচ্ছে। এপি-এনওআরসি জরিপে ৭২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, দেশের তেল ও গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা তাঁদের কাছে অত্যন্ত বা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় একই অনুপাতে মানুষ ইরানের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।

এই অসন্তোষের রাজনৈতিক অভিঘাত পড়তে পারে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এমনিতেই অল্প। এখন ডেমোক্র্যাটরা সিনেট নিয়েও নতুন আশাবাদ দেখছে। সর্বশেষ জরিপে অর্থনীতি পরিচালনায় ডেমোক্র্যাটদের বেশি যোগ্য মনে করেছেন ৩৮ শতাংশ ভোটার, রিপাবলিকানদের পক্ষে ৩৫ শতাংশ। প্রায় এক দশকের মধ্যে এই ইস্যুতে রিপাবলিকানদের ওপর ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে যাওয়াকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটদের প্রতি আস্থা বেড়েছে।

ট্রাম্পের আরেক শক্তিশালী জায়গা অভিবাসননীতিতেও ব্যবধান দ্রুত কমেছে। বর্তমান জরিপে ৪০ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার বলেছেন, অভিবাসন প্রশ্নে রিপাবলিকানদের নীতি ভালো; ডেমোক্র্যাটদের বলেছেন ৩৮ শতাংশ। ব্যবধান মাত্র দুই শতাংশ পয়েন্ট। অথচ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই একই প্রশ্নে রিপাবলিকানরা ২৬ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিল।

হোয়াইট হাউস অবশ্য জনমতের ওঠানামাকে নীতি নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে মানতে নারাজ। প্রশাসনের বক্তব্য, ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য এখনও একই, ইরান যেন কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। এর আগে হোয়াইট হাউস বলেছিল, দ্রুত বদলে যাওয়া জনমত জরিপ দেখে প্রেসিডেন্ট জাতীয় নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নেবেন না।

কিন্তু ভোটারের মন অন্য হিসাব করছে। যে ট্রাম্প দীর্ঘ যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন, তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বোঝাগুলোর একটিই এখন সেই যুদ্ধ। ছয় মাসে ইরানকে কতটা দুর্বল করা গেছে, সেই হিসাব ওয়াশিংটন দিতে পারে; কিন্তু আমেরিকার ঘরে ঘরে হিসাবটা অনেক সরল, যুদ্ধ কবে শেষ হবে, পেট্রলের দাম কবে কমবে, আর তার জন্য আরও কত মূল্য দিতে হবে?

ইরানের আকাশে যুদ্ধের উত্তর এখনও মেলেনি। কিন্তু আমেরিকার জনমত একটি উত্তর ক্রমেই স্পষ্ট করে দিচ্ছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক সময় ততই ছোট হয়ে আসছে।জনৈতিক সময় ততই ছোট হয়ে আসছে।