Image description
লিভার ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হতে পারে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বা লিভার প্রতিস্থাপন। তবে ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা এখনও দেশের অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। অনেক রোগীর জন্য চিকিৎসার খরচ জোগাড় করাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
 
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর কয়েক হাজার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হলেও বাংলাদেশে এর সংখ্যা এখনও হাতেগোনা। প্রয়োজনের তুলনায় দেশে এই চিকিৎসার সুযোগও সীমিত। কেন এমন পরিস্থিতি? আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও দক্ষ চিকিৎসক থাকার পরও কেন বাংলাদেশে গড়ে উঠছে না সহজলভ্য ও নিয়মিত লিভার ট্রান্সপ্লান্টের ব্যবস্থা?
 
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে স্টার নিউজ কথা বলেছে রুমার সঙ্গে। স্বামীর চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে কঠিন সময় পার করছেন তিনি। প্রতিদিনই বাড়ছে চিকিৎসার খরচ, আর সেই অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে রুমাকে। স্বামীকে বাঁচানোর আশায় প্রতিনিয়ত নতুন করে অর্থের সন্ধান করছেন তিনি।
 
রুমার প্রশ্ন, সরকারি ব্যবস্থায় কেন লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা যাচ্ছে না? ব্যয়বহুল এই চিকিৎসার খরচ জোগাতে সে কার কাছে বা কাছে হাত পাতবে? নিজের আর্থিক সংকট ও স্বামীর চিকিৎসার ব্যয়ের কথা বলতে গিয়ে স্টার নিউজের সঙ্গে আলাপকালে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রুমা। জানান, স্বামীকে বাঁচানোর লড়াইয়ে কীভাবে প্রতিটি দিন পার করছেন তিনি।
 
রুনা বলেন, ‘আমার পরিবারে কেউ নেই। আমার স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন। ডাক্তার বলেছেন, যত দিন বেঁচে আছেন, তত দিন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। প্রতিদিন ইনজেকশন দিতে হবে। প্রতি ডোজের দাম ৭-৮ হাজার টাকা। আমাদের তো এত টাকা নেই। না পারছি অপারেশন করাতে, না পারছি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে। উনি চলে গেলে আমার মাথার ওপর ছাদ থাকবে না। আমার সন্তানকে দেখারও কেউ থাকবে না।’
 
লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন, সহজ ভাষায়, একই ব্লাড গ্রুপের কোনো ব্যক্তি বা রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় তার নিজের লিভার থেকে কিছু অংশ প্রিয় ব্যক্তিকে ডোনেট করবেন। অনেকটা রক্তদানের মতো। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো লিভার দান করার পর মাত্র দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে লিভার পুনরায় আগের রূপে ফিরে আসে, যেভাবে শরীরে পুনরায় রক্ত তৈরি হয়।
 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, লিভার ফেইলরের পেছনে অন্যতম দায়ী হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পুরো বিশ্বে প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজনের মৃত্যু হচ্ছে। এ ভাইরাস ছাড়াও মদ্যপান ও ফ্যাটি লিভারের কারণে মৃতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে।
 
লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন ডা. আসাদুজ্জামান নূর স্টার নিউজকে বলেন, ‘আমাদের দেশের রোগীরা চিকিৎসার জন্য ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মতো দেশে যান। ভারতে এই চিকিৎসার জন্য প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এখানেই শেষ নয়, ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর রোগীকে আজীবন ওষুধ সেবন করতে হয়। ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর প্রথম ৩–৪ মাসে ওষুধ ও চিকিৎসার পেছনে মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়।’
 
সার্জন ডা. আসাদুজ্জামান আরও জানান, বাইরের দেশগুলোতে এলজিস্টেমে সরকার চিকিৎসার ব্যয় ও ইনস্যুরেন্সের মাধ্যমে খরচ কভার করে। তাই সেখানে সব ধরনের চিকিৎসা করা সম্ভব হয়— ব্যয় ২ লাখ টাকা হোক কিংবা ১০ লাখ টাকা, সেটি রোগীর জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে এই পুরো ব্যয় রোগীর নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। ফলে বিষয়টি অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের কাছে সব ধরনের প্রযুক্তি ও আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও, শুধুমাত্র ব্যয়ের কারণে অনেক সময় রোগীকে সেই চিকিৎসা দেয়া কঠিন হয়ে যায়।
 
বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের পাইওনিয়ার হিসেবে পরিচিত প্রফেসর মোহাম্মদ আলী। ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল এই অপারেশনের সার্জন হিসেবে কাজ করছেন। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি মাত্র তিনটি লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করতে পেরেছেন।
 
কাছাকাছি দূরত্বের দেশগুলোতে যেখানে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশে এই সংখ্যা এখনও হাতেগোনা কয়েকটি। কেন এমন পরিস্থিতি? কী কারণে দেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের অগ্রগতি আটকে আছে?
 
এমন প্রশ্নের উত্তরে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী স্টার নিউজকে জানান, ফ্যাটি লিভার থেকে সৃষ্ট রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং তা বি-৬-কে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাই না। কেবল ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস আসে, এ উপলক্ষে অনেক অনুষ্ঠান ও নানা ধরনের কর্মসূচি হয়। কিন্তু ২৯ জুলাই থেকে আবার সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
 
এখনও যেন সব পরিবর্তন আটকে আছে ওই একটি দিবসকে ঘিরেই। একটি কার্যকর স্ট্র্যাটেজি কন্ট্রোল সিস্টেম চালু করতে অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত কম দৌড়াদৌড়ি করেননি তিনি।
 
অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী আরও বলেন, ‘আমি নিজে গিয়ে সচিব মহোদয় ও পরিচালককে চিঠি দিয়ে এসেছি, যাতে আমাদের দেশে ভাইরাল হেপাটাইটিসের জন্য একটি কন্ট্রোল স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা হয়। এটি অত্যন্ত জরুরি। একটি সুনির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি না থাকলে আমরা কীভাবে কাজ করব।’
 
দেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের এই দুরবস্থা নিয়ে কথা বলতে আমরা ছুটে যাই সচিবালয়ে। সেখানে স্টার নিউজের মুখোমুখি হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
 
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন স্টার নিউজকে জানান, ‘আমি নিজেকে খুব অসহায় মনে করি। আমি দেশ-বিদেশে ঘুরি, তাদের চিকিৎসাব্যবস্থা দেখলে নিজেকে এবং আমার দেশের রোগীদের খুব অসহায় মনে হয়। তবে একটা ভালো লাগার বিষয় হলো, আমরা সহজ-সরল, সৎ ও আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত—এ কথা বললে মিথ্যা বলা হবে। তবে উন্নয়ন হবে, কিন্তু সময় লাগবে।’
 
নির্বাচনের পর এমনই প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশ্বাসই যেন পরিণত হয়েছে দীর্ঘশ্বাসে। কবে দূর হবে স্বাস্থ্যসেবার এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ? কবে সহজে, সুলভে ও সম্মানের সঙ্গে মিলবে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা? - রোগী ও স্বজনদের এই প্রশ্ন যেন থেকেই যাচ্ছে।