তাইজুল ইসলামের করা দিনের শেষ ওভারে লং অন আর ডিপ মিড উইকেটের ওপর দিয়ে একজোড়া ছক্কা হাঁকালেন কায়েস আহমেদ। এ আফগান স্পিনারের ওই ২ ছক্কায় খেলার চালচিত্র পাল্টায়নি একটুও।
এমন নয়, আফগানরা জয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, কায়েসের ওই ২ ছক্কার মারে তারা লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। তা নয়। আফগানরা জেতেনি। আবার বাংলাদেশও জয় পায়নি। ম্যাচ ড্র’ই থেকে গেছে। তবে আফগানদের কাছে এ ড্র ‘জয়ের চেয়ে কম নয়। তাই তো খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আফগান শিবিরে আনন্দ। উল্লাস। আফগানরা ম্যাচ ড্র করেও উচ্ছ্বাস করতেই পারে। কারণ কাজটা সহজ ছিল না মোটেই। ৭ উইকেট হাতে নিয়ে সারা দিন উইকেটে কাটানো ছিল অনেক কঠিন।
কিন্তু সেদিকুল্লাহ অটল (৫১৪ মিনিট ক্রিজে থেকে ৩৩২ বল খেলে ১১১), অধিনায়ক রহমত শাহ (১৪৫ মিনিটে ১২৪ বলে ৫১), ইকরাম আলিখিল (৯৯ মিনিটে ৬৯ বলে ৩৩), ইয়ামিন আহমদজাই (১১৯ মিনিটে ৮৫ বলে ১৯) আর কায়েস আহমেদ (৮৬ মিনিটে ৮০ বলে ৪৯) দাঁতে দাঁত চেপে শেষদিন পুরো সময় উইকেটে কাটিয়ে নিশ্চিত হার এড়িয়ে কৃতিত্বপূর্ণ ড্র করলেন।
অন্যদিকে ৪৭৮ রানে এগিয়ে গতকাল সোমবার চতুর্থ দিন মাঝামাঝি সময় ইনিংস ঘোষণা করেও শেষ হাসি হাসতে পারেনি বাংলাদেশ। আজ মঙ্গলবার পঞ্চম ও শেষ দিন টাইগার বোলাররা ৫ উইকেটের বেশি পতন ঘটাতে পারেননি।
যদিও বাংলাদেশের ২ স্পিনার তাইজুল (১/১০৬) আর মিরাজ (৩/৭৩) মিলে ৪ উইকেট পেয়েছেন, তারপরও তাদের বল ঘোরেনি। অবশ্য উইকেটের সহায়তাও ছিল না একদম। আজ শেষ দিনও বল মোটেই স্পিন করেনি। একদম নির্ভেজাল ফ্ল্যাট ট্র্যাক। এ ধরনের পিচে আঙুল ও কব্জির কারুকাজে বল ঘোরাতে না পারলে স্পিন আদায় করা কঠিন। বাঁ-হাতি তাইজুল, অফস্পিনার মেহেদি মিরাজ আর নাঈম হাসানের কেউই তা পারেননি। অবশ্য তারা যে অন্য সময়ও নিজের দক্ষতা আর কারিশমায় বল ঘোরান, তাও নয়। তাদের স্পিন পেতে হলে উইকেটের সহায়তা লাগে প্রচুর। উইকেটে বল না ঘুরলে তাইজুল আর মিরাজদের কার্যকারিতা যে কমে যায়, সেটা আগেও দেখা গেছে। আজ ১৩ অক্টোবর আবুধাবির আবু জাইদ স্টেডিয়ামে তা আবারও চোখে পড়ল।
উইকেটের সাহায্য না থাকায় বাংলাদেশের স্পিনাররা টেস্টের পঞ্চম ও শেষ দিনও আফগানদের কাছ থেকে এতটুকু সমীহ আদায় করে নিতে পারেননি। বাংলাদেশের স্পিনারদের বিপক্ষে সে অর্থে অস্বস্তিবোধ করেননি আফগানরা।
অন্যদিকে ২ পেসার হাসান মাহমুদ আর এবাদত হোসেনও আজ মঙ্গলবার শেষ দিন বাড়তি কিছু করতে পারেননি। গরমে অনেকটা সময় বোলিং করে দুজনকেই ক্লান্ত মনে হয়েছে। তাঁদের বলের গতি ও ধার দুই-ই অনেক কম মনে হয়েছে আজ।
উইকেট না ভাঙা, তিন স্পিনার নিয়ে মাঠে নামা আর শেষ দিন পেসারদের অকার্যকারিতা- তিনে মিলে জয় ধরা দেয়নি। প্রায় দেড় দিন ব্যাট করে ম্যাচ ড্র করে মাঠ ছেড়েছে রহমত শাহর দল। আজ মঙ্গলবার পঞ্চম ও শেষ দিনও কিছু ভুলত্রুটি আর ব্যর্থতা চোখে পড়েছে। ক্যাচ ড্রপ, স্টাম্পিং চান্স মিস, একাধিক রান আউটের সুযোগ হাতছাড়া করেছেন ফিল্ডাররা।
তারপরও ক্রিকেটারদের ব্যর্থতা, ঘাটতি আর ম্যাচ জয়ের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষায় কমতির চেয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের অদূরদর্শিতা প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। যে পিচে আফগানরা তিন দ্রুতগতির বোলার (মোহাম্মদ ইয়ামিন, মোহাম্মদ সালিম, ইসমত আলম) নিয়ে মাঠে নেমেছে, সেই পিচে বাংলাদেশ খেলছে ২ পেসার নিয়ে।
এই একজন পেসার কম নিয়ে খেলাই শেষ পর্যন্ত কাল হয়েছে। প্রথম ইনিংসে আফগানিস্তানের ৯ উইকেট ভাগ করে নেওয়া হাসান মাহমুদ (৫/৫৬) ও এবাদতকে (৪/৫৫) দ্বিতীয় ইনিংসে পরিষ্কার ক্লান্ত মনে হয়েছে। হাসান মাহমুদ প্রথম ইনিংসে ২১ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ২৬ মিলে ৩৭ ওভার বোলিং করেছেন।
অন্যদিকে প্রথমবার ১৫.১ ওভার বোলিং করা এবাদত দ্বিতীয় ইনিংসে করেছেন ২১ ওভার; মোট ম্যাচে ৩৬.১ ওভার। দুজন দুই ইনিংস মিলে এত দীর্ঘ সময় ধরে বোলিং করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই তাঁদের বোলিং কার্যকারিতাও গেছে কমে। আজ শেষ দিন বাংলাদেশের ২ পেসার মিলে একটি মাত্র উইকেট (এবাদত) পেয়েছেন।
আবুধাবির কড়া রোদ ও প্রচণ্ড খরতাপে বেশি সময় বোলিংয়ে ক্লান্তি-অবসাদ আসতেই পারে। একজন থার্ড সিমার থাকলে হয়তো এবাদত আর হাসান মাহমুদের ওপর এত বাড়তি চাপ পড়ত না। তাঁরা বিশ্রাম পেতেন। বলের ধারটাও বজায় থাকত। কিন্তু ক্লান্ত-অবসন্ন হাসান মাহমুদ আর এবাদতের বলের ধার, কারুকাজ ছিল অনেক কম। পেসারদের ওপর বাড়তি শারীরিক ধকল পড়েছে টিম ম্যানেজমেন্টের অদূরদর্শিতায়।
বাংলাদেশের কোচ, ক্যাপ্টেন ও টিম ম্যানেজমেন্ট উইকেটের চরিত্র বুঝে তিন পেসার খেলানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। তারা ভেবেছিলেন পিচ স্পিনারদের সাহায্য করবে। তাই ২ পেসারের সঙ্গে ৩ স্পিনার (তাইজুল, মিরাজ আর নাঈম) নিয়ে নেমে পড়েছেন। ৩ স্পিনার ফর্মুলা মোটেই কাজে দেয়নি। বাড়তি পেসার থাকলে আফগান ব্যাটারদের ওপর বাড়তি চাপ প্রয়োগ করা যেত। কোনোরকম ভনিতা না করেই বলে দেওয়া যায়, একজন পেসার কম খেলানোটাই বাংলাদেশের জিততে না পারার বড় কারণ।
আফগান ব্যাটাররা জানেন চতুর্থ ইনিংসে ৪৭৯ রানের রেকর্ড টার্গেট ছোঁয়া সম্ভব নয়। তাই জেতার জন্য না দৌড়ে, ম্যাচ বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেছে রহমত শাহর দল। জয়ের অলীক চিন্তা মাথায় না এনে, বাড়তি ও ঝুঁকিপূর্ণ শটস না খেলে ধৈর্য্য ধরে রক্ষণাত্মক ঢং ও কৌশলে ব্যাট করেছেন সবাই।
খুব আলগা ডেলিভারি না পেলে কেউই শটস খেলার চেষ্টা করেননি। তাদের এই রক্ষণাত্মক কৌশলের জবাবে যতটা বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল আর আক্রমণাত্মক বোলিং এবং টাইট ফিল্ডিং করা দরকার ছিল, শান্তর দল তা পারেনি। সেই না পারাই হয়েছে কাল। একটি নিশ্চিত জয় হয়েছে হাতছাড়া।