Image description

দেশে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে যাওয়া এসব রিকশার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন দিনের চেয়ে মধ্যরাতেই চাহিদা বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এ রিকশাগুলোই মধ্যরাতে গিলে খাচ্ছে (চার্জে) ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে বাধ্য হয়ে সরকারকে উচ্চমূল্যের তেলের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হচ্ছে।

অন্যদিকে গ্যাস সংকট ও এলপিজির উচ্চমূল্যের কারণে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহারও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। দেশে বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে দিনে নতুন করে আরও প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বৈদ্যুতিক চুলা নয়, সরকারের মূল চিন্তার বিষয় ব্যাটারিচালিত রিকশা। কাগজে-কলমে ‘পিক’ ও ‘অফ-পিক’ শব্দ থাকলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। মধ্যরাতে এখন দিনের চেয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকছে। তিনি বলেন, দেশে কত ব্যাটারিচালিত রিকশা আছে, এর হিসাব কারও কাছে নেই। তবে মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা দেড় থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট কম থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা থাকছে না।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাত ১টায় (অফ-পিক) বিদ্যুতের চাহিদা দিনের সর্বোচ্চ চাহিদাকে (পিক) ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা না কমায় বাধ্য হয়ে সরকারকে উচ্চমূল্যের জ্বালানি তেলের (প্রতি ইউনিট ২৫ টাকার বেশি) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখতে হচ্ছে। পিডিবি, ডেসকো ও ডিপিডিসির হিসাব অনুযায়ী, মধ্যরাতে কেবল ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দিতে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।

দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা কত : দেশে ঠিক কত ব্যাটারিচালিত রিকশা আছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান গত সপ্তাহে যুগান্তরকে জানান, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে; যার অন্তত ২০ থেকে ২৫ লাখ শুধু ঢাকায়ই চলাচল করে। তিনি বলেন, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোকে অনেকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. সেবাস্তিয়ান গ্রোহের গবেষণায়ও দেশে প্রায় ৬০ লাখ রিকশা থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। সম্প্রতি এক সেমিনারে তিনি বলেন, দৈনিক ৩/৪ হাজার নতুন রিকশা রাস্তায় নামছে। দেশীয় ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স ব্যাটারিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইমরান করিমের মতে, বর্তমানে বাজারে ৫০ লাখের বেশি রিকশা চালু আছে এবং প্রতি মাসে অন্তত ৫ লাখ নতুন ব্যাটারি বিক্রি হচ্ছে।

২৭ সেপ্টেম্বর উত্তরখানে গিয়ে দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশা ছাড়া সেখানে তেমন কোনো যানবাহন নেই। এ এলাকার ব্যাটারিচালিত রিকশার একটি গ্যারেজ হোসনে আরা এন্টারপ্রাইজ। এর মালিক মোহাম্মদ দাউদ যুগান্তরকে জানান, শুধু উত্তরখানে বৈধ গ্যারেজ আছে ১৪৭টির বেশি। এর বাইরে অবৈধ কত গ্যারেজ আছে, তার কোনো হিসাব নেই।

রাজধানীর কাওরান বাজারের রিকশার পাইকারি বিক্রেতা আল আমিন ট্রেডার্সের মালিক মোহাম্মদ লিয়াকত শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, এক বছর আগেও তিনি দৈনিক ১০/১৫টি রিকশা বিক্রি করতেন। তার মতো ঢাকায় হাজারের মতো দোকান আছে। এখন দৈনিক একটির বেশি বিক্রি হয় না।

বৈদ্যুতিক চুলার কারণে বাড়তি চাপ : গ্যাস-সংকট ও এলপিজির উচ্চমূল্যের কারণে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার (ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড) ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। দেশীয় কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহৃত হচ্ছে।

ওয়ালটনের হোম অ্যাপ্লায়েন্স বিভাগের ম্যানেজার মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ২০২৪ সালের আগে মাসে গড়ে ১০ হাজার চুলা বিক্রি হলেও গত আগস্টে তা ৪ লাখে গিয়ে ঠেকেছিল। একটি দেশীয় বৈদ্যুতিক চুলা কোম্পানির হিসাবে, বৈদুতিক চুলা ব্যবহার করলে দিনে ২ থেকে ৩ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে।

পিডিবির সদস্য জহুরুল ইসলামের মতে, এসব চুলার কারণে দিনে নতুন করে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা কয়েক বছর আগে ছিল না।

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে আশার আলো : সংকটের মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা দেখছে সবুজ জ্বালানি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘সোলশেয়ার’। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (বিজনেস) ইসা আবরার আহমেদ জানান, বর্তমানে দেশের ৯৫ শতাংশ রিকশায় ‘লিড-অ্যাসিড’ ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পরিবর্তে আধুনিক ‘লিথিয়াম-আয়ন’ ব্যাটারি ব্যবহার করা গেলে প্রতিদিন ১৩ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।

সোলশেয়ারের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে দেখা গেছে, সারা দিন রিকশা চালানোর পরও লিথিয়াম ব্যাটারিতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ মজুত থাকে। এই চার্জ দিয়ে রাত ১২টার আগে উলটো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়। রাজধানীর উত্তরখানের হোসনে আরা এন্টারপ্রাইজ নামের গ্যারেজ ইতোমধ্যে ‘নেট মিটারিং’ সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের ব্যাটারি থেকে ১ হাজার ৭২ ইউনিট বিদ্যুৎ ডেসকোর লাইনে যুক্ত করে সফলতার প্রমাণ দিয়েছে।

গ্যারেজের মালিক মোহাম্মদ দাউদ যুগান্তরকে বলেন, লিড অ্যাসিডের ব্যাটারিতে দিনে ১৩০-১৩৫ টাকার আর লিথিয়াম ব্যাটারিতে ৮০-৮৫ টাকার চার্জ লাগে। লিথিয়াম ব্যাটারি তিন বছর চলে। লিড ব্যাটারি এক বছরের কম চলে। হোসনে আরা এন্টারপ্রাইজে পরীক্ষামূলকভাবে ১৮ কিলোওয়াটের একটি সোলার প্যানেলও বসানো হয়। ওই প্যানেল দিয়ে দিনে তিনটি রিকশার লিথিয়াম ব্যাটারির চার্জ দেওয়া যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যুৎ খাতের এই চ্যালেঞ্জকে বড় সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া সম্ভব।

সোলশেয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সেবাস্তিয়ান গ্রোহের যুগান্তরকে বলেছেন, আমাদের দেশের ৬০ লাখ ইলেকট্রিক রিকশাকে আমরা চাইলেই একটি স্মার্ট, লিথিয়ামচালিত ‘ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্টে’ বদলে ফেলতে পারি এমন সব ব্যাটারি দিয়ে, যা গ্রিডের সঙ্গেও কানেক্ট করা যাবে, আবার দেশেই রিসাইকেল করা যাবে। এই কাজটি যদি আমরা বড় পরিসরে করতে পারি, তাহলে বছরে আমাদের প্রায় ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাঁচবে।