আগামী মাসেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসাবে চালু হচ্ছে কক্সবাজার বিমানবন্দর। উদ্বোধনের প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন। আন্তর্জাতিক বেসামরকি বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অডিট হতে যাচ্ছে ২৬ অক্টোবর। ভাবমূর্তির জন্য এই ধাপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রানওয়ের মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি হওয়ার ভেতরে-বাইরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সমুদ্রের লোনাপানি পর্যন্ত সম্প্রসারিত রানওয়েতে বসানো কোটি টাকা মূল্যের ‘ক্যাটাগরি-২ প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেম’র বৈদ্যুতিক তারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরি হচ্ছে। এর আগেও চুরির ঘটনা ঘটেছে। তবে উদ্বোধনের আগের মাসে এবং অডিটের ২ সপ্তাহ আগে চুরির ঘটনা নিয়ে বিমানবন্দরের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেওয়া ছাড়াও কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটির (এনসিএএসসি) বৈঠকেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, কেপিআই এলাকায় এ ধরনের যন্ত্রাংশ বা তার চুরির ঘটনা চরম নিরাপত্তাঘাটতির বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে আইকাওর অডিট যখন দোরগোড়ায়, তখন এ ঘটনা দেশের এভিয়েশন খাতের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলতে পারে। সমুদ্রবক্ষের এই স্পর্শকাতর নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই। দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের বিমান নিরাপত্তার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং অডিটে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জানতে চাইলে, বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর মো. আসিফ ইকবাল যুগান্তরকে বলেন, এনসিএএসসির সভায় এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের সমুদ্রবক্ষে স্থাপিত লাইটিং সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের স্পর্শকাতর স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
জানা গেছে, ৭ অক্টোবর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরে এনসিএএসসির ১৪তম সভায় কক্সবাজার বিমানবন্দরের সমুদ্রে স্থাপিত লাইটিং সিস্টেমের বৈদ্যুতিক তার ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বারবার চুরির বিষয়টি আলোচনায় উঠে। সভায় জানানো হয়, বিমানবন্দরের পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালকের কাছ থেকে প্রায়ই এ ধরনের চুরির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রানওয়ের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই লাইটিং সিস্টেমের মূল্যবান বৈদ্যুতিক তার ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চুরি যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের নথিতেও কক্সবাজার বিমানবন্দরের লাইটিং সিস্টেমের নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে।
জানা গেছে, বিমানবন্দরের রানওয়ে সমুদ্রের দিকে সম্প্রসারণের ফলে উড়োজাহাজ চলাচলের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বও বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে কম দৃশ্যমানতা, কুয়াশা কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় উড়োজাহাজের নিরাপদ অবতরণে অ্যাপ্রোচ লাইটিং সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ব্যবস্থার বৈদ্যুতিক সংযোগ বা সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম চুরি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হলে উড়োজাহাজের অবতরণে পরিচালনাগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে স্পর্শকাতর এই অবকাঠামোয় বারবার চুরির ঘটনা বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে বেবিচকের সুপারিশের ভিত্তিতে পর্যটন মন্ত্রণালয় যোগাযোগ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। চিঠিতে নৌপুলিশের মাধ্যমে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করা হয়েছে।
বেবিচকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সমুদ্রে বিস্তৃত এলাকায় স্থাপিত লাইটিং সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্থলভাগের কোনো স্থাপনা পাহারা দেওয়ার কাজটি সহজ নয়। সেখানে সমুদ্রপথে অনুপ্রবেশের আশঙ্কা, নজরদারি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় টহল পরিচালনার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হয়। তবে এসব চ্যালেঞ্জ আগে থেকেই বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা।