যুদ্ধ থামেনি, ক্ষতও শুকায়নি। তবু ফুটবল আবার ফিরছে ফিলিস্তিনে। দীর্ঘ প্রায় তিন বছরের বিরতির পর আগামী ৪ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে গড়াবে ফিলিস্তিনি ক্লাব ফুটবল। এই প্রত্যাবর্তনের প্রথম আয়োজনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘থাউজ্যান্ড মার্টিয়ার্স কাপ’ অর্থাৎ হাজারও শহীদের স্মরণে এই নাম। যে নামের মধ্যেই মিশে আছে হারানোর বেদনা, স্মৃতি আর নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রত্যয়। ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএফএ) জানিয়েছে, এটি হবে দীর্ঘ বিরতির পর দেশটির ফুটবলে কার্যক্রম পুনরায় চালুর প্রথম ধাপ।
সোমবার পশ্চিম তীরের আল-বিরেহতে জোসেফ ব্লাটার একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিযোগিতা শুরুর ঘোষণা দেন পিএফএ সভাপতি জিব্রিল রাজুব। তার ভাষায়, এই আয়োজনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ক্রীড়াঙ্গন জাগরণের চেষ্টা করা হবে। দেশে ও প্রবাসে থাকা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন আশার আলো এবং আনন্দের উপলক্ষ এনে দেওয়াই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে চলমান আর্থিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট মোকাবিলায় ফিফা ও আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও চেয়েছেন তিনি।
প্রথম আসরে অংশ নেওয়ার জন্য মোট ২২৬টি ক্লাবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ১৪৬টি, গাজার ৪৪টি এবং লেবাননের ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরের ৩৬টি ক্লাব রয়েছে। প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্বে অঞ্চল ও ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের শাখাভিত্তিক গ্রুপ পদ্ধতিতে খেলা অনুষ্ঠিত হবে। উদ্বোধনী ম্যাচও একই সময়ে তিন অঞ্চলে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পশ্চিম তীরে জাবাল আল-মুকাবের মুখোমুখি হবে শাবাব আল-খলিল। গাজায় শাবাব রাফাহ খেলবে খাদামাত রাফাহর বিপক্ষে। আর লেবাননের আইন আল-হিলওয়া শরণার্থী শিবিরে মুখোমুখি হবে আল-আনসার ও আল-নাহদা।
‘থাউজ্যান্ড মার্টিয়ার্স কাপ’ নামকরণও প্রতীকী। পিএফএর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে সংঘাতের সময় নিহত ১,০১৪ ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদকে স্মরণ করেই প্রতিযোগিতাটির নাম রাখা হয়েছে। পশ্চিম তীর, গাজা ও লেবাননের জন্য আলাদা তিনটি ট্রফি তৈরি করা হচ্ছে এবং প্রতিটি ট্রফিতে ওই ১,০১৪ ক্রীড়াবিদের নাম যুক্ত থাকবে।
ক্লাবগুলোর মাঠে ফেরার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সমস্যাও বড় চ্যালেঞ্জ। পিএফএ জানিয়েছে, নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী প্রতিটি ক্লাবকে সমান আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। সরঞ্জাম কেনা ও যাতায়াতের ব্যয় মেটাতে এই অর্থ ব্যবহার করতে পারবে ক্লাবগুলো। জিব্রিল রাজুব বলেছেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ফিলিস্তিনিরা তাদের জাতীয় ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাস হারায়নি। তাঁর মতে, খেলাধুলা এখনো ফিলিস্তিনিদের জন্য আশা ও জীবনের প্রতীক হয়ে আছে। দীর্ঘ বিরতির পর ফুটবল পুনরায় চালুর উদ্যোগকে তিনি কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং ফিলিস্তিনি ক্রীড়াঙ্গনকে পুনর্গঠনের সূচনা হিসেবেও দেখছেন।
প্রথম আসরটি মূলত একটি অন্তর্বর্তী প্রতিযোগিতা হিসেবে আয়োজন করা হচ্ছে। এর পরের মৌসুমে নিয়মিত শ্রেণিবদ্ধ লিগ কাঠামো চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ ৪ সেপ্টেম্বরের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি ফুটবল শুধু একটি টুর্নামেন্ট দিয়ে ফিরছে না, বরং দীর্ঘ বিরতির পর নিয়মিত ঘরোয়া ফুটবলে ফেরার পথও তৈরি করছে।
ফলে ৪ সেপ্টেম্বর কেবল একটি টুর্নামেন্টের উদ্বোধন হছে না; ফিলিস্তিনি ফুটবলের ফিরে আসার দিন হিসেবেও ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিতে যাচ্ছে। যুদ্ধ যাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে, তাদের স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়েই আবার মাঠে নামবে ফুটবলাররা। ধ্বংসস্তূপের পাশে গড়িয়ে যাবে বল, উঠবে গোলের উল্লাস আর সেই মুহূর্তে ফুটবল হয়তো আবার মনে করিয়ে দেবে, ‘জীবন থেমে থাকে না।’