Image description

যেখানে যমুনা সেতুতে এক বছরেই টোল আদায় হয়েছে নির্মাণ ব্যয়ের এক-পঞ্চমাংশ, পদ্মা সেতু থেকে নির্মাণ ব্যয় উঠবে ৩৫ বছরে এবং হানিফ ফ্লাইওভার থেকে উঠবে ২৪ বছরে; সেখানে কর্ণফুলী টানেল থেকে টোল আদায় করে নির্মাণ ব্যয় তুলতে লাগবে ২৬৫ বছর। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রত্যাশিত যানবাহন না পাওয়া এবং আশপাশের অঞ্চলগুলোতে সম্ভাব্য শিল্পায়নে গতি না থাকায় আর্থিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে কর্ণফুলী টানেল। এই টানেল নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। অথচ বর্তমান টোল আদায়ের হার দিয়ে এই নির্মাণ ব্যয় তুলতে সময় লাগবে প্রায় ২৬৫ বছর। যদিও সম্প্রতি লোকসানের পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে। এখন প্রতি মাসে অন্তত ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনছে এই মেগা প্রকল্প।

নির্মাণের সময় সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, প্রতিদিন ২৮ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করবে এই টানেল দিয়ে। অথচ বর্তমানে দৈনিক মাত্র ৪ হাজার যানবাহন চলাচল করছে, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৪ শতাংশ। এসব গাড়ি থেকে টোল বাবদ আদায় করা অর্থ দিয়ে টানেলটি রক্ষণাবেক্ষণ করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে প্রকল্পটি সরকারের আর্থিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রভাব মূল্যায়ন শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।

এতে উল্লেখ করা হয়, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ঋণের সুদ এবং অন্যান্য আর্থিক দায় বিবেচনায় নিলে প্রকল্পটির আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে টানেলের প্রবেশপথে গতিরোধক কার্যকর না হওয়া ও উচ্চতা সংক্রান্ত নির্মাণ ত্রুটি থাকার কারণে সেখানে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে বিভাগটির মূল্যায়নে উঠে এসেছে। এজন্য আর্থিক ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি সুপারিশ করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ।

যেমন- লোকসান কমাতে কক্সবাজারের পর্যটন খাতের সম্প্রসারণ, সমুদ্রসৈকতের ওপারের আরেক উপজেলায় আনোয়ারায় দ্রুত শিল্পায়ন ঘটানো ও মাতারবাড়ী বন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করার কথা বলা হয়েছে। এতে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এই টানেলের আর্থিক অবদান স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির আর্থিক সুবিধার কারণে ওই এলাকায় কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। যার অবদান এসে পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে। অন্যথায় এই লোকসানের ভার দিনে দিনে আরও বাড়বে। যা দেশ ও সরকারের ভিতরে আর্থিক ঝুঁকি বাড়াবে।

আইএমইডির হিসাবে, বর্তমানে টানেল থেকে বছরে টোল আদায় হচ্ছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এই আয় দিয়ে শুধু নির্মাণ ব্যয় হিসাব করলেই ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ওঠাতে প্রায় ২৬৫ বছর প্রয়োজন হবে। তবে এটি সরল গাণিতিক হিসাব। পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাদ দিলে প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্র আরও কঠিন হবে বলে মনে করে বিভাগটি।

এদিকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) তথ্য অনুযায়ী, যমুনা সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই সেতু থেকে টোল বাবদ আদায় হয়েছে ৭৪৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক অর্থবছরেই টোল হিসেবে এসেছে সেতু নির্মাণ ব্যয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (সূত্র :  Bangladesh Bank)। সেতু কর্তৃপক্ষের হিসাবে, চালুর পর থেকেই যমুনা সেতুতে পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি টোল আদায় হয়ে আসছে। ১৯৯৮ সালে সেতুটি চালুর সময় ধারণা করা হয়েছিল, দীর্ঘমেয়াদে টোলের মাধ্যমে নির্মাণে বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে আনা হবে। বাস্তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্মাণ ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ টোল থেকে উঠে আসে।

প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালের জুন থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ২৬ বছরে যমুনা সেতু থেকে টোল আদায় হয়েছে ৭ হাজার ৮৭৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। যোগাযোগের আরেক বৃহৎ অবকাঠামো পদ্মা সেতু থেকে টোল আদায় করে নির্মাণ ব্যয় উঠবে ৩৫ বছরে। পদ্মা সেতু থেকে বছরে টোল আসে প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা, ঋণ পরিশোধও চলছে টোলের আয় থেকে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এদিকে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের প্রকল্প ব্যয়  ২,৩০০ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়।

চুক্তি অনুযায়ী বেসরকারি উদ্যোক্তা টোল আদায় করে ২৪ বছর পরিচালনার পর ফ্লাইওভারটি সরকারের কাছে হস্তান্তর করার কথা। এ ছাড়া মেট্রোরেল লাইন ৬ স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৩২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মেট্রোরেলের টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ২৪৪ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে আংশিকভাবে চলাচল করায় আয় হয়েছিল ২২ কোটির কিছু বেশি। এতে শুধু ভাড়া দিয়ে ব্যয় তুলতে লাগবে ১৩০ বছর। তবে এসব মেগা প্রকল্প যোগাযোগের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে এ কারণে অর্থনীতিতে এসব প্রকল্পের অবদান অনেক বেশি।

কিন্তু কর্ণফুলী টানেলের ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রম। কারণ সেটা যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে ওয়ান সিটি টু টাউন ধারণা। সে ধারণাই এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক ঢাকার সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশে প্রকল্প ব্যয় অনেক বেশি। গত ১৫ বছরে মেগা প্রকল্প যেগুলো হয়েছে সেগুলোর ব্যয় আরও বেশি। এর চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে প্রকল্পগুলো নির্মাণের ক্ষেত্রে সময় এবং প্রয়োজনীয়তা সুষ্ঠুভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

জানা গেছে, প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতার অন্যতম বড় সমস্যা হলো- টানেল দিয়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় যানবাহন চলাচল না করা। ফলে টোল থেকে আয়ও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হচ্ছে না। টানেলের ব্যবহার বাড়াতে পারলেই আয় বাড়বে বলে মনে করছে আইএমইডি। তবে শুধু টোলের হার বাড়িয়ে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। টানেলকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে যে শিল্প ও পর্যটনভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠার কথা ছিল, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সংস্থাটি। 

আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, কর্ণফুলী টানেলের প্রকৃত সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করছে এর দুই প্রান্তে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কত দ্রুত বাড়ে তার ওপর। বিশেষ করে আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্পায়ন এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী ড্রাই ডক এবং চীনা ও কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের মতো প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে টানেলকেন্দ্রিক পণ্য ও যাত্রী পরিবহন বাড়বে এবং টোল আয়ের সম্ভাবনাও বাড়বে।

টানেলের অর্থনৈতিক ব্যবহার বাড়াতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে টানেলের মাধ্যমে মাতারবাড়ী বন্দর ও কক্সবাজারকে কার্যকরভাবে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে আইএমইডি। সম্প্রতি মাতারবাড়ী ঘুরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আনোয়ারা, মাতারবাড়ী, পতেঙ্গা, কক্সবাজারসহ এসব অঞ্চলে চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বাড়লে কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহারও বাড়তে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল, মাতারবাড়ী বন্দর এবং কক্সবাজারকে একটি সমন্বিত পরিবহন ও অর্থনৈতিক করিডরের আওতায় আনা গেলে টানেলের কাক্সিক্ষত ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া টানেল এলাকায় নির্মিত প্রায় ৪৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ের সার্ভিস এরিয়া থেকে আয় বাড়ানোর বিষয়েও সুপারিশ রয়েছে। এটি বেসরকারি খাতের মাধ্যমে অথবা বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।

আইএমইডির মূল্যায়নের মূল বার্তা হলো- কর্ণফুলী টানেলকে বিচ্ছিন্ন একটি যোগাযোগ অবকাঠামো হিসেবে দেখলে এর আর্থিক সুফল পাওয়া কঠিন। টানেলের দুই প্রান্তে শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন ও বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। আনোয়ারায় শিল্পায়ন, কক্সবাজারে পর্যটন এবং মাতারবাড়ীতে বন্দর ও শিল্প অবকাঠামোর দ্রুত বাস্তবায়ন হলে টানেলে যানবাহনের চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে টানেলের লোকসান বা আর্থিক ঝুঁকি কমাতে এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত টোল বাড়ানো নয়, টানেলের ব্যবহার বাড়ানো। আর সে জন্য দ্রুত শিল্পায়ন, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন, মাতারবাড়ী বন্দর ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ শেষ করা এবং কার্যকর সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।