পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাবে রূপান্তরের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এ মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্বের আধুনিক পর্যটন নগরীর আদলে পরিবেশ ও উন্নয়নকে সমন্বয় করে কক্সবাজারের পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মাস্টারপ্ল্যানে পর্যটন করপোরেশনের হোটেলগুলোর আধুনিকায়ন, মেরিন ড্রাইভে ভিজিটরস পয়েন্ট স্থাপন, রাতে পর্যটকদের বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি এবং ব্লু ইকোনমি ইউনিভার্সিটি স্থাপনের বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশিবিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করার নীতিমালাও এতে যুক্ত করা হচ্ছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, পাহাড়, সমুদ্র ও সমতল-এই তিন বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে। পরিবেশ ও ভূমির ওপর ন্যূনতম চাপ রেখে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলাই হবে মূল লক্ষ্য। সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের আধুনিক পর্যটন নগরীর মডেল অনুসরণ করে কক্সবাজারের জন্য একটি নিজস্ব উন্নয়ন মডেল তৈরি করা হবে। পরে সেই মডেলের ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের পর্যটন খাতসহ জেলার সমন্বিত উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, কক্সবাজারকে পর্যটন হাবে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে। এজন্য বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হোটেলগুলোর আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের উন্নয়নে ইকোট্যুরিজম মডেল অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্বোধনের প্রস্তুতি চলছে। বিমানবন্দরটি চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের কাছে কক্সবাজার আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। সভায় মেরিন ড্রাইভে ভিজিটরস পয়েন্ট ও ব্লু ইকোনমি ইউনিভার্সিটি স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পর্যটন) এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আবদুর রউফ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাবে রূপান্তর একটি মাল্টিসেক্টরাল পরিকল্পনা। এখানে বিভিন্ন খাতের কাজ থাকবে। মাস্টারপ্ল্যানটি এখন খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। পর্যটনের পাশাপাশি পরিবেশসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়েই এটি করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, মাস্টারপ্ল্যানে দেশিবিদেশি ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি এফডিআইয়ের বিষয়ও রাখা হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত নীতিমালার একটি খসড়া তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ একটি সেনাবাহিনী-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত পরিকল্পনা আমাদের কাছে দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, কোন এলাকায় কী ধরনের উন্নয়ন হবে, কোথায় কী বিধিনিষেধ থাকবে-এসব বিষয় মাস্টারপ্ল্যানে নির্ধারণ করা হবে। এরপর স্টেকহোল্ডার, উন্নয়ন সহযোগী এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রকল্প প্রস্তাব আহ্বান করা হবে। প্রকৌশল ও পরিবেশগত বিধিবিধান মেনে অনুমোদন দেওয়া হবে। দেশিবিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা এ কাজে যুক্ত থাকবেন। সরকারের অনুমোদনের পর পুরো জেলার জন্য একটি সমন্বিত উন্নয়ন রোডম্যাপ প্রকাশ করা হবে।
রাতের পর্যটনেও গুরুত্ব : মাস্টারপ্ল্যানে রাতের পর্যটনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য আধুনিক পর্যটন নগরীর মতো কক্সবাজারেও রাতে পর্যটকদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল এবং বিনোদনের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। হিমছড়ি থেকে টেকনাফের জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ উন্নয়নের পাশাপাশি এর বিভিন্ন পর্যটন স্পটে রাতেও পর্যটকদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হবে।
কক্সবাজারের পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও আমন্ত্রণ জানানো হবে। মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হওয়ার পর স্টেকহোল্ডারদের অবহিত করে বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকল্পগুলো উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেন্ট মার্টিনের নির্ধারিত এলাকাকে পরিবেশবান্ধবভাবে উন্নয়ন এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।
এর আগে কক্সবাজারের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৩ সালে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হলেও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে তা কার্যকর হয়নি। পরে ২০২৩ থেকে ২০৪৩ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের জন্য ‘কক্সবাজারকে স্মার্ট শহরে রূপান্তরের’ পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এতে কক্সবাজার-সাবরাং ও কক্সবাজার-মহেশখালী রুটে ক্যাবল কার, সমুদ্রসৈকতে ওয়াটার স্পোর্টস ও বিনোদন সুবিধা, ইনডোর বিনোদন পার্ক, মহেশখালীতে ইকোরিসোর্ট, সি-প্লেন, ক্রুজ শিপ ও হেলিকপ্টার সার্ভিস চালুর মতো বিভিন্ন প্রস্তাব ছিল। এবার এসব বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে কক্সবাজারের পর্যটন উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।