বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে গলায় রানার্সআপের পদক, চোখে অশ্রু আর মুখে গভীর হতাশা। দীর্ঘ সময় মাঠে সতীর্থদের সাহস জুগিয়ে যাওয়া এমিলিয়ানো ‘এমি’ মার্তিনেজ যেন এবার নিজেকেই প্রশ্ন করলেন—আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটাই কি ছিল তার শেষ ম্যাচ।
ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী এই গোলরক্ষক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় ৩৩ বছর বয়সি মার্তিনেজ লিখেছেন, ‘স্বপ্ন দেখেছিলাম আবারও বিশ্বকাপ জিতব। ট্রফিটা আবার আর্জেন্টিনায় ফিরিয়ে নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ব। কিন্তু এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এখন অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে হবে, সামনে কীভাবে এগোব এবং আমার সরে দাঁড়ানোর সময় হয়েছে কি না।’
তিনি আরো লিখেছেন, ‘আমি দুঃখিত। দেশের জন্য, সতীর্থদের জন্য নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন ‘বাজপাখি’ নামে খ্যাত এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত গোলকিপিংয়ের স্বীকৃতি হিসেবে জিতেছিলেন গোল্ডেন গ্লাভস। তবে সে বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে ফাইনালের একেবারে শেষদিকে। অতিরিক্ত সময়ের অন্তিম মুহূর্তে ফ্রান্সের র্যান্ডাল কোলোমুয়ানির নিশ্চিত গোলের শট অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় বাম পা বাড়িয়ে ঠেকিয়ে দেন তিনি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেই সেভ আর্জেন্টিনাকে নিশ্চিত পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচায়। এরপর টাইব্রেকারেও অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে দলকে বিশ্বকাপ জেতাতে রাখেন সবচেয়ে বড় ভূমিকা।
শুধু শট ঠেকানোই নয়, বড় ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তা, প্রতিপক্ষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করা, পেনাল্টি ঠেকানোর অসাধারণ দক্ষতা, দুর্দান্ত রিফ্লেক্স, ওয়ান টু ওয়ান পরিস্থিতিতে অসামান্য উপস্থিত বুদ্ধি এবং ডিফেন্সকে সংগঠিত রাখার নেতৃত্বগুণÑএসবই মার্তিনেজকে সমসাময়িক গোলরক্ষকদের ভিড়ে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার আত্মবিশ্বাস এবং বড় মঞ্চে জ্বলে ওঠার ক্ষমতাই তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকে পরিণত করেছে।
এবারের বিশ্বকাপেও সে পরিচয়ের ব্যত্যয় ঘটেনি। আর্জেন্টিনার হয়ে টুর্নামেন্টের আট ম্যাচের প্রতিটি মিনিট খেলেছেন তিনি। দুটি ম্যাচে ক্লিন শিট রেখেছেন, আট গোল হজম করেছেন। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালেও বারবার দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। স্পেনের একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়ে তিনি মোট ১১টি সেভ করেন। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের ১০৫ মিনিটে ফেরান তোরেসের শটে পরাস্ত হলেও তার অনবদ্য গোলকিপিং না থাকলে ব্যবধান আরো বড় হতে পারত।
মার্তিনেজ ২০২৩ ও ২০২৪ সালে টানা দুবার ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে বিশ্বের সেরা গোলরক্ষকের স্বীকৃতি হিসেবে লেভ ইয়াসিন ট্রফি জেতেন। ২০২০ সাল থেকে ইংলিশ ক্লাব অ্যাস্টন ভিলার হয়ে খেলছেন। ক্লাবটির সঙ্গে তার চুক্তি ২০২৯ সাল পর্যন্ত থাকলেও চলতি মৌসুমে ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন রয়েছে।
আর্জেন্টিনার হয়ে এখন পর্যন্ত ৬৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন মার্তিনেজ। দুটি কোপা আমেরিকা, একটি ফিনালিসিমা এবং একটি বিশ্বকাপÑদেশের জার্সিতে সাফল্যের প্রায় সব বড় শিরোপাই জিতেছেন তিনি।
মার্তিনেজের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা শুরু হলেও আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি আগেই তাকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘দিবু এমন একজন গোলরক্ষক, যাকে পেছনে পেলে পুরো দলই অন্যরকম আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলে। বড় ম্যাচের জন্যই যেন ওর জন্ম।’
তাকে নিয়ে মেসির এমন মূল্যায়নই তার অসাধারণত্ব তুলে ধরতে যথেষ্ট।