ঠিকাদারের টাকায় রোড রোলার চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণ শিখতে সুইডেন যাচ্ছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পাঁচ কর্মকর্তা। গত ৬ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বিদেশ ভ্রমণের সরকারি অনুমোদনে এই তথ্য জানা গেছে। আদেশ অনুযায়ী, তাদের ২৫ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত সুইডেন সফরের কথা রয়েছে। গত ১১ মার্চ রোলারগুলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্টকে যুক্ত হয়েছে। সরবরাহের চার মাস পর কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভ্রমণ তালিকায় নাম থাকা এক কর্মকর্তা ভ্রমণের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বিষয়টি অস্বীকার করলেও আদেশ প্রকাশের ১৬ দিনেও এটি স্থগিতের কোনো আদেশ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি। তবে সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, সরকার কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করায় ভ্রমণে যাওয়ার পুরো ফাইল প্রক্রিয়া গোপন রাখা হয়েছে। যাতে ভ্রমণের আগে প্রকাশ না পায়। তাড়াহুড়ো করে এই সময়ে তারা সুইডেন না গেলেও পরবর্তী সময়ে এই ভ্রমণে যাওয়ার ফাইল প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছেন তারা। এদিকে কর্মকর্তাদের এই ভ্রমণকে স্রেফ প্রমোদ ভ্রমণ বলছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। প্রসঙ্গত এর আগে মশা মারা শিখতে ঠিকাদারের টাকায় সিটি করপোরেশনের আমেরিকা ভ্রমণ বাতিল করেছিল প্রধানমন্ত্রী।
ভ্রমণের তালিকায় রয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব আশরাফুল আমিন, সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম ও নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ ইমরান হোছাইন খোকা।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের চুক্তি অনুযায়ী, ৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় পাঁচটি ডাবল ড্রাম রোলার সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরকার কবির আহমেদ। যেখানে রোলারগুলো বিদেশ থেকে জাহাজে উঠার আগে তিনজন কারিগরি ব্যক্তির (টেকনিক্যাল পার্সন) প্রি-শিপমেন্ট পরিদর্শনের শর্ত ছিল। এছাড়া রোলারটি সরবরাহের সাতদিনের মধ্যে চট্টগ্রামে কর্মস্থলে একজন সহকারী প্রকৌশলী ও প্রতিটি রোলারের জন্য একজন চালকের সাতদিনের প্রশিক্ষণের কথা ছিল। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ১৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা। যা বহন করবে মেসার্স সরকার কবির আহমেদ।
এই রোলার চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণের জন্য ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর বিদেশ ভ্রমণের একটি অনুমোদন দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত করায় সেই অনুমোদন স্থগিত হয়ে যায়। সেই আদেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চার কর্মকর্তার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আবদুর রহমানের নাম ছিল। গত ৬ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (বর্তমানে যুগ্ম সচিব) রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত ভ্রমণ অনুমোদন আদেশে আবদুর রহমানের নাম বাদ দিয়ে মন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের নাম যুক্ত করা হয়। এছাড়া আগের আদেশে ভ্রমণের সময় ছিল ৭ দিন। গত ৬ জুলাই সেই আদেশ প্রতিস্থাপন করে সফরের মেয়াদ বাড়িয়ে ১০ দিন করা হয়।
সিটি করপোরেশনের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘রোলার চালাবেন চালক আর মেরামত করবেন মেকানিক। প্রশিক্ষণে গেলে তারা যাবেন। কর্মকর্তাদের সেখানে কাজ কি? মূলত সরকারি কেনাকাটায় এই ভ্রমণগুলো প্রমোদ ভ্রমণ হিসেবে রাখা হয়। আমরাও কর্মকর্তাদের আবদারে তখন রাখতাম।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেছেন, ‘এই ভ্রমণে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। পরিকল্পনাও নেই। আগে ভ্রমণটিতে স্থগিতাদেশ ছিল। এখন অনেকে যাচ্ছে। যেমন: ওয়াসা, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড। এই জন্য হয়তো স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে আবার ভ্রমণ অনুমোদন দিয়েছে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, ‘এই বিষয়ে আমাকে কেউ অবহিত করেনি। আমি খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেবো।’
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আতিথেয়তায় কর্মকর্তাদের এই সফর কেবল নীতিগত ভুল নয়, এটি প্রচলিত একাধিক আইনের অধীনে ফৌজদারি অপরাধ। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬-এর ৬৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, সরকারি কেনাকাটা ও চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ বা প্রদান করতে পারে না। ঠিকাদারের আতিথেয়তা গ্রহণ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী ‘অসদাচরণ ও দুর্নীতি’র শামিল। এছাড়া ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(১)(ডি) ধারা অনুযায়ী, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বৈধ পারিশ্রমিকের বাইরে ঠিকাদারের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ বা চুক্তি ভঙ্গের অপরাধে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। একই সাথে পিপিআর-এর ধারা অনুযায়ী উক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিলসহ তাকে কালো তালিকাভুক্ত করারও বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেছেন, ‘যেখানে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ বন্ধের সরকারি নির্দেশনা রয়েছে, সেখানে রোড রোলার চালানো শিখতে সচিব ও পিএসদের সুইডেন যাওয়া চরম হাস্যকর। তারা কি দেশে ফিরে রোলার চালাবেন? ঠিকাদারের টাকায় এমন বিলাস ভ্রমণের অর্থ হচ্ছে পরবর্তীতে কাজের মান খারাপ করে ঠিকাদার সেই টাকা উসুল করে নেবেন। যা স্পষ্টতই সরকারি অর্থের অপচয় ও অপরাধজনক আচরণ।’