Image description

রাজধানীতে তীব্র সিএনজি গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গাড়িচালক ও সাধারণ পরিবহন শ্রমিকরা। পর্যাপ্ত প্রেসার না থাকায় বা সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পাম্পগুলোতে রাজপথজুড়ে জমে উঠছে শত শত গাড়ি ও সিএনজি অটোরিকশার দীর্ঘ সারি। গ্যাসের জন্য চালকদের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হচ্ছে। এ নিয়ে চালকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষোভের মুখে রাজধানীর নিকুঞ্জে সড়ক অবরোধের মতো ঘটনাও ঘটেছে। চালকদের অভিযোগ, এটি স্রেফ গ্যাসের দাম বাড়ানোর কৌশল বা পাঁয়তারা। 

বুধবার (২২ জুলাই) দুপুর আড়াইটায় রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের সিভিল অ্যাভিয়েশন সদর দফতরের বিপরীতে ডিএল ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, তেল দেওয়া স্বাভাবিক থাকলেও সিএনজি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর পাশেই এয়ার কম স্টেশনে সিএনজি দিলেও পর্যাপ্ত প্রেসার (চাপ) না থাকায় সেটিও একপর্যায়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কবে বা কখন গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা বলতে পারছেন না পাম্পকর্মীরা। 

উত্তরা রাজলক্ষ্মী থেকে কুর্মিটোলা: মাইলের পর মাইল গাড়ির সারি

গ্যাসের আশায় ডিএল ও এয়ার কম স্টেশনের সামনে থেকে প্রাইভেটকার ও সিএনজি অটোরিকশার দীর্ঘ সারি রাজপথের উত্তরা রাজলক্ষ্মী পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। সকাল থেকে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস। 

পর্যাপ্ত প্রেশার না থাকায় বা সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পাম্পগুলোতে রাজপথজুড়ে জমে উঠছে শত শত গাড়ি ও সিএনজি অটোরিকশার দীর্ঘ সারি (ছবি বাংলা ট্রিবিউন)

পর্যাপ্ত প্রেশার না থাকায় বা সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পাম্পগুলোতে রাজপথজুড়ে জমে উঠছে শত শত গাড়ি ও সিএনজি অটোরিকশার দীর্ঘ সারি (ছবি বাংলা ট্রিবিউন) 

সকাল সাড়ে ৮টায় লাইনে দাঁড়ানো আবুল হোসেন নামের এক সিএনজিচালক বলেন, “রাজলক্ষ্মীর সামনে থেকে ধীরগতিতে আসতে আসতে দুপুর আড়াইটায় এই পর্যন্ত এসেছি। এখন এসে দেখি গ্যাস দেওয়া বন্ধ! কখন আসবে, আর কখন পাবো কেউ বলতে পারে না। একবার তেল নিয়ে পাঁয়তারা হলো, এবার গ্যাস নিয়ে শুরু হয়েছে। গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি না করে প্রেসার ঠিক রাখুক। আমাদের কষ্ট না দিয়ে দরকার হলে দাম বাড়িয়ে দিক, আমরা বাড়তি দামেই গ্যাস নেবো। তাও এমন হয়রানি বন্ধ হোক।” 

আরেক সিএনজিচালক নবিউল হোসেন জানান, তিনি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাননি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দাম বাড়ানোর পরই দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে। এর আগে তেলের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই দেখেছি আমরা।” 

এয়ার কম ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মী সাব্বির আহমেদ বলেন, “দুপুর পর্যন্ত যে প্রেসার পেয়েছিলাম, তা দিয়ে আমরা গ্যাস দিয়েছি। এখন আর প্রেসার নেই, তাই প্রেসার বাড়ার অপেক্ষায় আছি। আগে চাপ কম থাকলেও দেওয়া যেতো, কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। তবে আমরা সরকার নির্ধারিত হারেই দাম রাখছি।” 

অর্ধেক গ্যাসে দ্রুত শেষ, দ্বিগুণ সময়ে সীমাহীন ভোগান্তি 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমগ্র রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোর চিত্র একই। গ্যাস প্রেসার তলানিতে নামায় কোনও পাম্প বন্ধ থাকছে, আর যেখানে দেওয়া হচ্ছে সেখানে সময় লাগছে দ্বিগুণেরও বেশি। একটি প্রাইভেটকারের ৬০ সিলিন্ডারে যেখানে ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকার গ্যাস আটকার কথা, সেখানে প্রেসার কম থাকায় মাত্র ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকার বেশি গ্যাস ঢুকছে না। এতে গাড়ি সামান্য দূর চলতেই গ্যাস শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং চালকদের দিনে বারবার ৮-১০ ঘণ্টা লাইনে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।

নিকুঞ্জ এলাকার সিটি ওভারসিজ স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় সিএনজি ও প্রাইভেটকারের বিশাল লাইন কুর্মিটোলা হাসপাতাল ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে চালকরা একপর্যায়ে সড়ক অবরোধ করে বসেন। এতে রাস্তায় যানজট সৃষ্টি হয়। পরে প্রায় ২০ মিনিট পর পুলিশ কর্মকর্তারা এসে পরিস্থিতি বুঝিয়ে চালকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেন।

সড়ক অবরোধে অংশ নেওয়া সিএনজিচালক আতাউর, শামীম ও রনি বলেন, এটি সরকারের কৌশল। সারা দিনে আমাদের ১৫০০ টাকার মতো মহাজনকে জমা দিতে হয়। গ্যাসের কারণে যদি গাড়িই চালাতে না পারি, তবে জমার টাকা দেবো কীভাবে আর পরিবারকেই বা খাওয়াব কীভাবে? সরকার এই কষ্ট দেওয়া বন্ধ করুক এবং গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করুক। আমরা বাড়তি দামেই গ্যাস কিনবো। 

পর্যাপ্ত প্রেশার না থাকায় বা সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পাম্পগুলোতে রাজপথজুড়ে জমে উঠছে শত শত গাড়ি ও সিএনজি অটোরিকশার দীর্ঘ সারি (ছবি বাংলা ট্রিবিউন) পর্যাপ্ত প্রেশার না থাকায় বা সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পাম্পগুলোতে রাজপথজুড়ে জমে উঠছে শত শত গাড়ি ও সিএনজি অটোরিকশার দীর্ঘ সারি (ছবি বাংলা ট্রিবিউন)

প্রাইভেটকার চালক শরিফুল ইসলাম বলেন, “আমরা ৭-৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করছি গ্যাসের জন্য। এই গ্যাস তো আমদানি করা লাগে না। তাহলে কেন এই অবস্থা হবে?” তিনিও অভিযোগ করেন, দাম বাড়ানোর জন্য এগুলো করা হচ্ছে।  

একই চিত্র সাফা রিফুয়েলিং স্টেশনেও 

একই লাইনে অবস্থিত সাফা রিফুয়েলিং স্টেশনে গিয়েও একই চিত্র চোখে পড়ে। সকাল ৮টা থেকে গ্যাস দেওয়া বন্ধ থাকায় শত শত গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সকাল ৮টা থেকে সেখানে লাইনে অপেক্ষা করা সিএনজি চালক আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা যাবো কোথায়? গাড়ি চালাতে না পারলে খাবো কী? সরকারের আমাদের দিকটা দেখা উচিত।” 

স্টেশনের বিক্রয়কর্মী আলী আকবর বলেন, “সকাল ৮টা পর্যন্ত সামান্য প্রেসার ছিল, তখন দিতে পেরেছি। এখন প্রেসার না থাকায় মেশিন সচল থাকলেও বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। প্রেসার এলে আবার গ্যাস দেওয়া শুরু করা হবে।” 

তিনি বলেন, “আমাদের এখানে করার কিছু নাই। গ্যাস এলে দেবো, না এলে বসে থাকতে হবে।”