Image description

বিশ্বকাপ যেন আর্জেন্টিনার জন্য কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের এক অন্তহীন কাব্য। তারা যেন হার মানতে জানেই না। ম্যাচ যত কঠিন হয়, আর্জেন্টিনা তত বেশি নিজেদের আসল রূপে ফিরে আসে। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন একজনই—লিওনেল মেসি।

আটলান্টার সেমিফাইনালেও আবার লেখা হলো সেই পরিচিত চিত্রনাট্য। দীর্ঘ সময় পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ উল্লাসের নহর বয়ে গেল আটলান্টা স্টেডিয়ামে। চারধারে তখন একটাই স্লোগান- "ভামোস আর্জেন্টিনা"! চলো এগিয়ে চলো আর্জেন্টিনা।
সামনে এখন আরেক মহারণ—শিরোপার জন্য স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল। ১৯ জুলাই সেই ফাইনাল।

প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা ছিল একটাই—মেসিকে আটকে রাখা। তারা সেটি অনেকটাই সফলভাবে করেছিলও। মাঝমাঠে একের পর এক চাপ, ডাবল মার্কিং, পাসের লেন বন্ধ করে দিয়ে আর্জেন্টিনার ছন্দ নষ্ট করে দেয় ইংলিশরা। গোলশূন্য প্রথমার্ধ শেষে মনে হচ্ছিল, কোচ টমাস টুখেলের পরিকল্পনাই বুঝি সফল হতে যাচ্ছে।
কিন্তু ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজার আগ পযন্ত কখনো পুরো গল্প বলে না। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ যদি হয় আর্জেন্টিনা, তাহলে তো কথাই নেই! আরেকবার ফুটবলের কামব্যাক কিং হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিল আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কিছুটা সতর্ক ছিল দুই দলই। তারপরই ৫৫ মিনিটে ইংল্যান্ডকে আনন্দে ভাসালেন গর্ডন। ডেকলান রাইস বল উদ্ধার করে মরগান রজার্সের কাছে দেন। ডান দিক থেকে রজার্সের অসাধারণ মাপা ক্রস আর্জেন্টিনার রক্ষণকে মুহূর্তেই ভেঙ্গে ফেলে। পেছন দিক থেকে নিখুঁত সময়ে দৌড়ে এসে অ্যান্থনি গর্ডন ছয় গজ বক্সের কিনারা থেকে ডান পায়ে বল জড়িয়ে দেন জালে। সহজ দেখালেও শেষটা মোটেও সহজ ছিল না। নিখুঁত টাইমিং আর অসাধারণ ফিনিশিংয়ে ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন নিউক্যাসল ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপে এটি তার প্রথম গোল।

ইংল্যান্ডের গ্যালারি তখন উল্লাসে বিস্ফোরিত। মনে হচ্ছিল, ফাইনালের দরজা বুঝি খুলেই গেছে। কিন্তু আপনি যদি সেটাই ভেবে থাকেন তাহলে ঠকেছেন! কারণ দলের নাম যে আর্জেন্টিনা। এই দল গোল খাওয়ার পর যেন প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করার জন্য বাড়তি জোস খুঁজে পায়। হলোও ঠিক তাই। গোল হজমের মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় আর্জেন্টিনার ঝড়। সেই ঝড়ে পুরো ইংল্যান্ড যেন বক্সিংয়ের পাঞ্চিং ব্যাগ। আর্জেন্টিনা একের পর এক ঘুসি মারছে, আর ইংল্যান্ড কোনো মতো নাক মুখ দিয়ে সেটা ঠেকাচ্ছে। কিন্তু এভাবে বাঁচা যায় না ফুটবল ম্যাচে। আর তাই একসময় ঠিকই নকআউট ইংল্যান্ড!

গোল হজম করার পর ইংল্যান্ড অকারণেই অনেক নিচে নেমে যায়। পুরো দল নিজেদের বক্সের সামনে গুটিয়ে ফেলে। যেন এক বিশাল 'লো ব্লক'। আর সেটাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। বলের দখল প্রায় পুরোপুরি চলে যায় আর্জেন্টিনার কাছে। ৫৬ মিনিট থেকে নির্ধারিত সময়ের শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বল দখল ছিল মাত্র ১২ শতাংশ, বিপরীতে আর্জেন্টিনার ৮৮ শতাংশ। এমন একতরফা আধিপত্য আন্তর্জাতিক ফুটবলের সেমিফাইনালে খুব কমই দেখা যায়।

তবু ইংল্যান্ড বেঁচে ছিল জর্ডান পিকফোর্ডের অসাধারণ গোলকিপিংয়ে। ৬৯ মিনিটে নিকোলাস গনজালেসের কাছ থেকে আসা কাছের দূরত্বের হেড অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন তিনি। এরপর একের পর এক ক্রস, একের পর এক আক্রমণ। ৮০ মিনিটে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শক্তিশালী হেড পোস্টে লেগে ফিরে এলে ভাগ্যও যেন তখন ইংল্যান্ডের পক্ষেই ছিল।

কিন্তু ভাগ্য চিরকাল একপক্ষের হয় না।

৮৬ মিনিটে আসে সেই প্রতীক্ষিত সমতা। কর্নার থেকে ফেরত আসা বল অনেকটা ফাঁকা জায়গায় পেয়ে যান এনজো ফার্নান্দেজ। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে ডান পায়ের ইনসাইডে নেওয়া তাঁর বাঁকানো শট পিকফোর্ডের নাগালের অনেক বাইরে গিয়ে জড়িয়ে যায় জালের ওপরের কোণে। বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলের দাবিদার হতে পারে এই শট। মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের আবহ। একটু জানিয়ে দেই এই বলে শেষ পাস দিয়েছিলেন কিন্তু ঐ একজনই- মেসি।

ইংল্যান্ড তখন আর আক্রমণে ফিরতে পারেনি। বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। কিন্তু মেসি তখন ধীরে ধীরে নিজের জাদুর বাক্স খুলে বসেছেন।
অতিরিক্ত সময়ে ম্যাক অ্যালিস্টারের শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে বলটি কুড়িয়ে নেন মেসি। ডান দিক ধরে এগিয়ে গিয়ে তিনি যে ক্রসটি ভাসিয়ে দেন, সেটি ছিল শিল্পের পর্যায়ে। নিখুঁত গতি, নিখুঁত উচ্চতা, নিখুঁত দিক তাও আবার ডান পায়ের শটে! সেই বলের সামনে শুধু মাথা ছোঁয়ালেই যথেষ্ট ছিল। বদলি হিসেবে নামা লাউতারো মার্তিনেজ সেটাই করলেন। বল জালে জড়াতেই স্তব্ধ হয়ে যায় ইংল্যান্ড, আর বিস্ফোরিত হয় আর্জেন্টিনা।
শেষ বাঁশি বাজতেই আবারও প্রমাণ হলো—আর্জেন্টিনাকে কখনোই শেষ বলে ধরে নেওয়া যায় না।

এই দলটি শুধু ম্যাচ জেতে না, তারা প্রতিপক্ষের বিশ্বাস ভেঙে দেয়। আর লিওনেল মেসি? পুরো ম্যাচে হয়তো তিনি খুব বেশি দৃশ্যমান ছিলেন না। কিন্তু ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়দের পরিচয়ই তো এটাই—একটি মুহূর্তই যথেষ্ট। সেই একটি পাসেই তিনি বদলে দিলেন পুরো বিশ্বকাপের গল্প।

আবারও ফিরে এল আর্জেন্টিনা। আবারও অলৌকিক প্রত্যাবর্তন। আর এখন তাদের সামনে শেষ অধ্যায়—স্পেনকে হারিয়ে বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন।