Image description

বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালীন সরাসরি সম্প্রচারে রেফারিকে ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা করায় টুর্নামেন্টের বাকি অংশ থেকে নিষিদ্ধ হয়েছেন প্যারাগুয়ের জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার হোর্হে ‘চিপি’ ভেরা। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বকাপে তার অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করেছে ফিফা।

ঘটনাটি ঘটে তুরস্কের বিপক্ষে প্যারাগুয়ের গ্রুপ ‘ডি’-এর ম্যাচে। ওই ম্যাচে মাতিয়াস গালারসার গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় প্যারাগুয়ে। তবে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার মিগেল আলমিরন লাল কার্ড দেখলে ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। পুরো দ্বিতীয়ার্ধ ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় প্যারাগুয়েকে।

আলমিরন প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে কথা বলার সময় মুখ ঢেকে রাখেন। বিশ্বকাপের আগে চালু হওয়া ফিফার নতুন নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের আচরণ শাস্তিযোগ্য হওয়ায় রেফারি ইভান বার্টন সিসনেরোস তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান।

 
 

চলতি বছরের শুরুতে জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ানিকে ঘিরে বিতর্কের পর এই নিয়ম প্রবর্তন করা হয়। প্রেস্টিয়ানির বিরুদ্ধে ফেব্রুয়ারিতে রিয়াল মাদ্রিদ ও বেনফিকার মধ্যকার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে বর্ণবাদী মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। পরে সমকামীবিদ্বেষী আচরণের দায়ে তাকে ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেয় উয়েফা।

 
 

এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে প্যারাগুয়ের এবিসি নেটওয়ার্কের হয়ে ধারাভাষ্য দেওয়া ভেরা সরাসরি সম্প্রচারে রেফারি ও ফিফা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় মন্তব্য করেন। তিনি রেফারিকে ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ফিফা ফুটবলকে ধ্বংস করছে এবং এই অবস্থার জন্য ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দায়ী।

 

হোর্হে বলেন, ‘চোর, চোর বার্টন (রেফারি ইভান বার্টন সিসনেরোস)। তোমরা ফুটবলকে মেরে ফেলেছ। ফিফা, তোমরা ফুটবলকে ধ্বংস করেছ। ইনফান্তিনো, এর জন্য তুমি দায়ী।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফুটবলকে এ অবস্থায় নিয়ে আসার জন্য ফিফাকে দায় নিতে হবে। এটা লজ্জাজনক। ইনফান্তিনো, তোমার লজ্জা পাওয়া উচিত।’

শুধু ফিফা নয়, দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন (কনমেবল) সভাপতি আলেহান্দ্রো ডোমিঙ্গেজকেও আক্রমণ করেন ভেরা। তিনি অভিযোগ করেন, ফুটবলের ক্ষতি করা হচ্ছে এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্যারাগুয়েকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

এ ধারভাষ্যকার বলেন, ‘আলেহান্দ্রো ডোমিঙ্গেজ, ইনফান্তিনোর সঙ্গে ছবি তোলা কমান। সাহস দেখান। তোমরা চোর।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বকাপে কি আমাদের এসবই দেখতে হবে? এটা ব্যাখ্যাতীত, এটা লজ্জাজনক। তারা ফুটবলকে ধ্বংস করছে এবং আমাদের একজন খেলোয়াড় কমিয়ে দিয়েছে।’

আলমিরনের প্রসঙ্গে ভেরা বলেন, ‘মিগেল আলমিরন তুরস্কের খেলোয়াড়কে কী ধরনের বর্ণবাদী মন্তব্য করতে পারে? আমাকে একটু সাধারণ বোধবুদ্ধি দেখান।’

এদিকে তার এমন তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর সমালোচনার মুখে পড়ে পরবর্তীতে নিজের বক্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চান ভেরা। তবে তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। ফিফা তার বিশ্বকাপ অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়, ফলে টুর্নামেন্টের বাকি অংশে তিনি আর স্টেডিয়ামের ভেতর বা বাইরে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক কভারেজে অংশ নিতে পারবেন না। এক বিবৃতিতে ভেরা বলেন, ‘ফিফা এই বিশ্বকাপের জন্য আমার অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে আমি আর এবিসির হয়ে স্টেডিয়ামের ভেতরে বা বাইরে কোনো ধরনের বিশ্বকাপ কভারেজে অংশ নিতে পারব না।’

তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অজুহাত দিতে আসিনি। কোনো নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা রেফারির সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কখনোই আমার মতো করে নিয়ন্ত্রণ হারানোর যৌক্তিকতা তৈরি করে না। আমি দায় অন্য কারও ওপর চাপাতেও চাই না। আমি যা বলেছি, তা ভুল ছিল এবং এর দায় আমাকে নিতে হবে।’

ভেরা জানান, তিনি ফিফার কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘ফিফা কর্তৃপক্ষ এবং আমার বক্তব্যে যারা কষ্ট পেয়েছেন, তাদের সবার কাছে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।’

একই সঙ্গে নিজের পরিবার, সহকর্মী, দর্শক এবং এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমি বহু বছর ধরে আবেগ, দায়বদ্ধতা এবং খেলাটির প্রতি ভালোবাসা নিয়ে এই পেশায় কাজ করছি। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে ভুল করা থেকে বিরত রাখে না, তবে ভুল হলে তা স্বীকার করার দায়িত্ব দেয়।’

এদিকে ভেরার কর্মস্থল প্যারাগুয়ের সম্প্রচারমাধ্যম এবিসি কার্ডিনাল ফিফার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। ফিফার সিদ্ধান্তকে অতিরিক্ত কঠোর বলে দাবি করেছে এবিসি কার্ডিনাল। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘পুরো টুর্নামেন্টের জন্য একটি অ্যাক্রেডিটেশন স্থায়ীভাবে বাতিল করা প্রথম অপরাধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর শাস্তি।’

তারা মনে করে, ভেরা ভুল স্বীকার করেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন এবং সংশোধনের চেষ্টা করেছেন। তাই শাস্তির ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন।

এবিসি কার্ডিনাল আরও জানিয়েছে, একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে একজন পেশাজীবীর দীর্ঘ কর্মজীবন ও অবদানকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। তারা আশা করছে, ফিফা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে এবং সংলাপের মাধ্যমে আরও গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করবে।