Image description

ইরানের বিপক্ষে নিউজিল্যান্ডের ম্যাচ তখন প্রায় শেষের দিকে। ২-২ গোলে ড্র চলছে। ৯১তম মিনিটে অর্থাৎ যোগ করা সময়ে খেলোয়াড় বদলের সিদ্ধান্ত নেন নিউজিল্যান্ড দলের কোচ। মিডফিল্ডার মার্কো স্টামেনিকের জায়গায় মাঠে নামানো হয় ডিফেন্ডার টাইলার বিন্ডনকে।

আপাতদৃষ্টিতে এটি খুবই সাধারণ একটি সিদ্ধান্ত, যা নিয়ে আলাদা করে রোমাঞ্চিত হওয়ার কিছু নেই।

তবে খুব ভালো করে তখন গ্যালারির দিকে তাকালে দেখা যেত— হাজারো মানুষের ভিড়ে একজন মধ্যবয়সী নারী কাঁদছেন।

তিনি আর কেউ নন, টাইলারের মা জেনি বিন্ডন। তিনি নিজেও এক সময় নারী বিশ্বকাপে খেলেছেন।

বদলি খেলোয়াড় হিসেবে গত মঙ্গলবার টাইলার মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই আসলে ফুটবল বিশ্বকাপে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি হয়।

প্রথমবারের মতো কোনো মা ও ছেলে ফিফা বিশ্বকাপে খেলার এক অবিস্মরণীয় নজির গড়েন।

রোববার দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, টাইলারের মা জেনি ছিলেন নিউজিল্যান্ডের নারী ফুটবল দলের গোলরক্ষক। ২০০৭ সালে চীনে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপে তিনটি ম্যাচ খেলেন তিনি।

জেনির জন্ম ও বেড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে। তবে লুইস ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় নিউজিল্যান্ডের ভলিবল খেলোয়াড় গ্র্যান্ট বিন্ডনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেখান থেকে প্রেম ও বিয়ে।

এরপর তিনি চলে যান নিউজিল্যান্ড। দেশটির জাতীয় দলের হয়ে ৭৭টি ম্যাচ খেলেন।

 

এবার বিশ্বকাপ শুরুর আগেই এমন কিছু যে হবে তা আন্দাজ করছিলেন জেনি।

দ্য অ্যাথলেটিককে বলেন, ‘ব্যাপারটা বেশ মজার। আমি হিসাব করার চেষ্টা করছিলাম যে, ২০০৭ বা তার আশপাশের সময়ে আর কার কার সন্তান হয়েছিল। কিন্তু কারও কথা মনে করতে পারছিলাম না। তখনই বুঝলাম, আমরা হয়তো সত্যিই এক অনন্য ইতিহাস গড়তে যাচ্ছি।’

ফুটবল ঘিরেই বেড়ে ওঠা

টাইলারের জন্ম ২০০৫ সালে, অকল্যান্ডে। মা-বাবার ক্রীড়াবিদ হওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই খেলার মধ্যে বড় হয়েছেন।

জেনির হিসাব মতে, টাইলার ছোটবেলায় প্রায় ১৭টি ভিন্ন ভিন্ন খেলা খেলেছেন। তবে ফুটবলের প্রতি বরাবরই আলাদা টান ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, টাইলারের বয়স যখন ১২, তখন মা জেনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেস (ইউসিএলএ) ফুটবল দলের কোচের দায়িত্ব নেন। সেই সুবাদে লস অ্যাঞ্জেলেস ফুটবল ক্লাব অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন টাইলার এবং পরবর্তী ছয় বছর সেখানেই কাটান।

আর ঠিক এই কারণেই লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে টাইলারের বিশ্বকাপ অভিষেক হওয়াটা ছিল ভীষণ অর্থবহ।

ওই ম্যাচে তাকে সমর্থন জানাতে সে দিন গ্যালারিতে হাজির ছিলেন বন্ধু, পরিবার, প্রতিবেশী ও প্রাক্তন কোচসহ অর্ধশতাধিক পরিচিত মানুষ।

মা জেনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘ওই বিশাল সুন্দর স্টেডিয়ামে এত চেনা মানুষের সামনে যখন ও মাঠে নামল, আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি।’

২০০৭ সালে জেনি যখন বিশ্বকাপ খেলেন, টাইলারের বয়স তখন মাত্র তিন বছর। মায়ের সঙ্গে তিনিও ওইবার চীনে গিয়েছিলেন।

এত ছোট বয়সের স্মৃতি মনে না থাকলেও ফুটবল যে তার রক্তে মিশে গিয়েছিল সেটা বোঝা যায় পরে।

জেনি বলেন, ‘মাত্র তিন মাস বয়স থেকে ও ফুটবল মাঠে যাচ্ছে। নিউজিল্যান্ড নারী দলের তৎকালীন কোচ জন হার্ডম্যানের নির্দেশনা শুনে বড় হয়েছে ও। সিমন জ্যাকসন, অ্যাশলে সানচেজ বা হেইলি মেসের মতো তারকাদের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই খেলেছে। তাই ওর কাছে ফুটবল খেলাটাই সব।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র কয়েক বছরে দ্রুত উত্থান ঘটেছে টাইলারের ক্যারিয়ারে। ২০২৩ সালে ইংলিশ ফুটবল ক্লাব রিডিংয়ের অনূর্ধ্ব-২১ দলে যোগ দেন। ওই বছরই আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক ঘটে তার। ২০২৪ সালে অলিম্পিক দলে খেলেন। এই বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডকে কোয়ালিফাই করতেও বড় ভূমিকা রেখেছেন টাইলার।

যেভাবে ছেলেকে সমর্থন দিয়েছেন মা-বাবা

প্রতিবেদনে বলা হয়, ছেলেকে কিছুটা আড়ালে থেকেই সমর্থন দিয়েছেন মা জেনি ও বাবা গ্র্যান্ট।

টাইলার যাতে খেলায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে, সেজন্য একটু দূরেই থেকেছেন মা-বাবা।

খেলোয়াড় হিসেবে ছেলেকে কী পরামর্শ দিয়েছিলেন— এমন প্রশ্নের উত্তরে জেনি বলেন, ‘আমরা ওকে শুধু একটা কথাই বলেছি— মুহূর্তগুলো হাতছাড়া করো না, খেলাটা মন থেকে উপভোগ করো।’

মায়ের অনুভূতি

বিশ্বকাপের মঞ্চে ছেলেকে দেখে কেমন লাগছিল— এমন প্রশ্নের জবাবে জেনি বলেন, ‘আমরা যখন টাইলারকে মাঠে নামতে দেখলাম, মনে হচ্ছিল, কোনো বাবা-মা থিয়েটারে বসে সন্তানের প্রথম অভিনয় দেখছে।’

খেলোয়াড় হিসেবে নিজে বিশ্বকাপের মাঠে নামা, নাকি দর্শক হিসেবে ছেলের বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখা— কোনটি বেশি চাপের ছিল— অ্যাথলেটিকের এমন প্রশ্নে হাসিমুখে জেনি বলেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ— ছেলের খেলা দেখা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যখন নিজে মাঠে নামবেন, তখন আসলে খেলার মধ্যে ডুবে যাবেন, নার্ভাসনেসও থাকে না। কিন্তু গ্যালারিতে বসে যখন ছেলের নাম শুনলাম, তাকে দেখলাম হেঁটে হেঁটে মাঠে যেতে, তখন বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতি হচ্ছিল। আমি সত্যিই চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি।’