ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউর নাম বদলে গোপাল মুখোপাধ্যায় রোড করার সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিজেপি সমর্থকরা এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক সংশোধন’ বলে দাবি করলেও, বিরোধীদের অভিযোগ, উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যার বদলে ইতিহাসের নামফলক পাল্টানোই বিজেপির অন্যতম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।
কলকাতা পৌরনিগমের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের সোহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউ এখন থেকে সরকারি নথিতে গোপাল মুখোপাধ্যায় রোড নামে পরিচিত হবে।
সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সমাজমাধ্যমে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দাবি করেন, প্রকৃত নায়কদের সম্মান জানানোর সময় এসেছে। পাশাপাশি ইতিহাসের ভুল সংশোধনের সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এই নাম পরিবর্তন ঘিরে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রাস্তার নামকরণ হয়েছিল স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দির নামে, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন এবং শিক্ষা জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাদের বক্তব্য, কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তার অবদান ও সময়কালকে বিবেচনা করা উচিত, পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলির সঙ্গে সবকিছুকে এক করে দেখা ইতিহাসচর্চার পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।
পার্ক সার্কাসের প্রবীণ বাসিন্দা অসিত রঞ্জন বলেছেন, রাস্তার নাম পাল্টালেই এলাকার সমস্যা মিটবে না। জলনিকাশি, যানজট, রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ এসব নিয়ে প্রশাসনের বেশি ভাবা উচিত। আবার এক স্থানীয় ব্যবসায়ীর বক্তব্য, নাম পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় ব্যবসায়িক নথি, ঠিকানা ও বিভিন্ন কাগজপত্র সংশোধন করতে হয়। সাধারণ মানুষের কিছু বাড়তি ঝামেলাও তৈরি হয়।
অন্যদিকে বিজেপি সমর্থকদের দাবি, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে গোপাল মুখোপাধ্যায় তথা গোপাল পাঁঠা যেভাবে আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই তার নামে রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে।
বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, বাংলার ইতিহাসে যাদের অবদান উপেক্ষিত হয়েছে, তাদের সামনে আনার চেষ্টা চলছে।
কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের অভিযোগ, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নানা শহর ও প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের যে প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, তা মূলত রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার কৌশল। তাদের মতে, ইতিহাসকে নতুন করে ব্যাখ্যা করার নামে নির্বাচিত কিছু নামকে তুলে ধরা হচ্ছে এবং অন্য অংশকে আড়ালে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
১৯৩৩ সালে কলকাতা পৌরনিগমের সিদ্ধান্তে পার্ক সার্কাস থেকে কাশিপাড়া লেন সংলগ্ন নতুন রাস্তার নাম রাখা হয়েছিল সোহরাওয়ার্দি অ্যাভিনিউ। সরকারি নথি অনুযায়ী, ওই এলাকায় স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দির বাসভবনও ছিল। প্রায় এক শতাব্দী পর সেই নামই বদলে দেওয়া হলো।