Image description

তীব্র জ্বালানি সংকট, ব্যাংক ঋণের আকাশচুম্বী সুদের হার ও অভ্যন্তরীণ বাজারে মন্দার চাপে দেশের শিল্পখাত গভীর সংকটে পড়েছে। উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের অভাবে বৈশ্বিক বাজারেও প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে বাংলাদেশের পণ্য। নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার পাশাপাশি সচল কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে। একদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে হিস্যা হারানো, অন্যদিকে দেশীয় বাজারে লোকসান— দ্বিমুখী এই চাপে ব্যবসায় লাভের বদলে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে উদ্যোক্তারা।

কর্মসংস্থান সংকোচন এবং শিল্পায়নে স্থবিরতার এই ধারাবাহিকতা সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটের অনেক শেকড় জুলাই বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা সরকারের সময়েই তৈরি হয়েছিল। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং নীতিগত অসঙ্গতির কারণে শিল্পখাত দুর্বল হয়ে পড়ে। এসব কারণে এক সময় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের

বেশি থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং ঋণ বিতরণে অনিয়ম নতুন বিনিয়োগে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি শিল্প উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়ায়।

 

জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে উৎপাদন শিল্প

দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে এখন সবচেয়ে বড় হাহাকার চলছে গ্যাস ও বিদ্যুতের জন্য। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্প এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ (পিএসআই) না থাকায় দিনের বড় অংশ জুড়েই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই থাকার কথা থাকলেও মিলছে মাত্র এক থেকে দুই পিএসআই। এতে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রাংশগুলো চালু করাই সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না, অন্যদিকে রপ্তানির জন্য নির্ধারিত সময়ে (লিড টাইম) পণ্য জাহাজীকরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে চড়ামূল্যে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

 

উৎপাদন কমছে, বাড়ছে লোকসান

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শিল্প উৎপাদন সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওয়েভিং টেক্সটাইল খাতে উৎপাদন কমেছে ২৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। জুট টেক্সটাইলে ৩৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, ওষুধ শিল্পে ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ, সিমেন্ট-লাইম-প্লাস্টার শিল্পে পাঁচ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ১৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

ছোট ও মাঝারি শিল্পেও একই চিত্র দেখা গেছে। ফিনিশড টেক্সটাইল উৎপাদন কমেছে আট দশমিক ৬৭ শতাংশ, হ্যান্ডলুম টেক্সটাইল পাঁচ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং আয়রন ও স্টিল শিল্পে ছয় দশমিক ৫৭ শতাংশ।

শিল্প মালিকদের ভাষ্য, অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে লোকসানের পাল্লা ভারী করছে।

 

শিল্পখাতে বিনিয়োগ খরা

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগে। উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে যাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতি নতুন ঋণ বিতরণকে আরো মন্থর করে দিয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে অলস অর্থের পরিমাণ দ্রুত বাড়লেও, বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগের আস্থা ফেরানো যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৭৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকায়, যা এক বছর আগের তুলনায় ৫৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে অর্থের পাহাড় জমলেও তা শিল্পায়ন ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না।

 

বিপাকে রড-সিমেন্ট শিল্প

দেশের ভারী ও মূলধনী খাতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে ইস্পাত বা রড শিল্প। তবে সাম্প্রতিক অবকাঠামো খাতের মন্দা এবং নীতিগত কিছু সিদ্ধান্তের কারণে এই শিল্পটি এক নজিরবিহীন ও চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

চলতি সময়ে পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম এক লাফে বড় অংকে বাড়ানোর কারণে ইস্পাত মিলগুলোর ওপর ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে উঠেছে। ফলে বিশ্ববাজারে দেশীয় রডের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সম্পূর্ণ নষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার ফলে প্রতিটন রড উৎপাদনে অতিরিক্ত প্রায় তিন হাজার ৫৬০ টাকা ব্যয় যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে ভ্যাট, শুল্ক ও কর বৃদ্ধির প্রভাবে সবকিছু মিলিয়ে টনপ্রতি রডে অতিরিক্ত ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা ব্যয় যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে আধুনিক ও সনাতন মিলিয়ে দুই শতাধিক ইস্পাত কারখানা রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ টন। অথচ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অধিকাংশ কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে প্রায় ৫০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ড অঞ্চলের বেশ কয়েকটি ছোট ও মাঝারি মিল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। ডলার সংকট ও আর্থিক খাতের চাপ কাঁচামাল আমদানিকে আরো ব্যয়বহুল করে তুলেছে।

দেশের অন্যতম বড় খাত নির্মাণ শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা পরিস্থিতির কারণে সিমেন্ট, টাইলস, সিরামিক ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, সিমেন্ট শিল্পে চাহিদা প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। দেশের বেশ কয়েকটি বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সক্ষমতার অনেক নিচে উৎপাদন করছে।

 

পোশাক রপ্তানিতে ধস

তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। চলতি অর্থবছরে এসে পোশাক রপ্তানিতে ধারাবাহিক ধস চলছেই। জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। বর্তমানে অধিকাংশ কারখানায় প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন কর্মঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে নষ্ট হচ্ছে, যা উৎপাদন ও সময়মতো রপ্তানি কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।

গ্যাসের স্বল্পচাপ এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় কারখানাগুলোকে ক্যাপটিভ জেনারেটর ও বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এজন্য ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও এলপিজির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে জ্বালানি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা থাকায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্যমতে, অঞ্চলভেদে পরিস্থিতির তারতম্য থাকলেও সামগ্রিকভাবে পোশাক খাতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।

জানা গেছে, তৈরি পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ (বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন) মিলিয়ে মোট সক্রিয় কারখানার সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব কারখানা থেকে বিশ্ববাজারে ৩৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি পোশাক রপ্তানি হয়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রধান বাজারগুলোর চাহিদা হ্রাসে পোশাক রপ্তানি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি বিদ্যমান জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে রপ্তানি আরো কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে দেশের রপ্তানি কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। রপ্তানি আদেশে ব্যাপকভাবে ভাটা পড়েছে। সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আদেশ ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে আমাদের উৎপাদন কার্যক্রমে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি।

 

পথহারা সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্প

বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়লেও সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা, সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) অকার্যকারিতা, অর্থায়ন সংকট ও নীতিগত দুর্বলতায় শিল্পটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল ৯৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। যদিও প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে, বিশ্লেষকদের মতে সম্ভাবনার তুলনায় তা অত্যন্ত কম। বিশ্বে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি ডলারের চামড়ার বাজার রয়েছে। সে হিসাবে বাংলাদেশ মাত্র এক শতাংশ বাজার ধরতে পারলেও বছরে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি আয় সম্ভব ছিল।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, একযুগেও কার্যকর হয়নি সিইটিপি। ২০০৩ সালে হাজারীবাগের ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরের প্রকল্প নেওয়া হলেও এটি শেষ হতে প্রায় দুই দশক সময় লাগে। এতে ব্যয় বেড়ে ১৭৫ কোটি টাকা থেকে এক হাজার ১৫ কোটি টাকায় পৌঁছে। তবে এখনো সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর সিইটিপি কার্যকর হয়নি। এতে করে বিপুল সম্ভাবনার আন্তর্জাতিক বাজার হারাচ্ছে চামড়াশিল্প।

 

রপ্তানি আয়ে ভাটা

ইপিবির প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ৪৪০ কোটি ২৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের বছরের একই মাসে এ পরিমাণ ছিল ৪৭৩ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ। এ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শীর্ষ পাঁচ খাতের তিনটিতে রপ্তানি কমেছে।

তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য খাতে গত বছরের মে মাসের তুলনায় রপ্তানি কমেছে। মে মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে ১০ কোটি ৯৩ লাখ ডলার আয় এসেছে। গত বছরের মে মাসে এ খাত থেকে সাড়ে ১২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল, অর্থাৎ রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ।

ইপিবির হিসাব মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৩৭৯ কোটি ৯২ লাখ ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম। ওই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল চার হাজার ৪৯৪ কোটি ডলারের পণ্য।

সম্প্রতি বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম (পারভেজ) চৌধুরী বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে জ্বালানি শূন্য হবে বাংলাদেশ—এমন আশঙ্কায় ক্রয়াদেশ ভারতসহ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস রপ্তানি আয় গভীর সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ যখন অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত, তখন ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়া নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সুবিধা এবং সরকারি প্রণোদনার জোরে বিশ্ববাজারের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকার মতো বড় বাজারগুলোতে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া শক্ত অবস্থা তৈরি করছে।

বাজারবিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির শীর্ষদশ দেশের মধ্যে ৯টি—যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কে রপ্তানি কমেছে। রপ্তানি পণ্য প্রস্তুত করতে অন্তত ৪০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী চীন আর ভিয়েতনামে এ প্রতিবন্ধকতা নেই। আর এ কারণে ক্রেতাদের প্রথম দুটি পছন্দের তালিকায় এখন চীন আর ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের অবস্থান তিন নম্বরে।

বিবিএসের অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী, অর্থনীতিতে দেশের উৎপাদন খাতের অবদান ২০১৩ সালের ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়নের বিস্তার ঘটছে না। এতে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং রপ্তানি সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, সংকট কাটাতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, সুদের হার কমানো, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা আনা, করব্যবস্থা সহজ করা এবং বন্দর ও লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নত করা। সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্পখাতের এ স্থবিরতা শুধু উৎপাদন বা রপ্তানির সংকট নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং প্রবৃদ্ধির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।