আর মাত্র চারদিন পরই পর্দা উঠতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞের। এবারই প্রথম ৩২ দলের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে লড়বে ৪৮ দল। ম্যাচ সংখ্যা ৬৪ থেকে এক লাফে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১০৪-এ। শুধু দলের সংখ্যাই বাড়ছে না, যুক্ত হচ্ছে ‘রাউন্ড অব ৩২’-এর মতো নতুন নকআউট পর্বও। ম্যাচের এই বিশাল আধিক্য খেলোয়াড় ও কোচদের সামনে এনে দিয়েছে নতুন নতুন কীর্তি গড়ার সোনালি সুযোগ। ফুটবল বিশ্বকাপের বহু বছরের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী বেশকিছু রেকর্ড এবার নতুন করে লেখা হতে পারে। এবারের আসরে যে পাঁচটি বড় রেকর্ড তীব্র হুমকির মুখে, আসুন দেখে নেওয়া যাক সেগুলোর বর্তমান সমীকরণ।
হেলমুট শনের সিংহাসন
বিশ্বকাপের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে সর্বোচ্চ ১৬টি ম্যাচ জেতার কীর্তি রয়েছে জার্মানির কিংবদন্তি কোচ হেলমুট শনের। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে টানা চারটি বিশ্বকাপে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিকে নিয়ে এ রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। এবার এ রেকর্ড ভাঙার খুব কাছে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সের মাস্টারমাইন্ড কোচ দিদিয়ের দেশম। ফরাসিদের হয়ে ১৯ ম্যাচে ইতোমধ্যে ১৪টি জয় তুলে নিয়েছেন তিনি। ফ্রান্স যদি গ্রুপপর্বে দুটি ম্যাচ জেতে, তবেই দেশম হেলমুট শনের রেকর্ডে ভাগ বসাবেন। আর নকআউট পর্বে একটি ম্যাচ জিতলেই তিনি এককভাবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সফলতম কোচ হয়ে যাবেন।
সর্বোচ্চ গোলের মাইলফলক
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৬৪ ম্যাচে ফুটবলপ্রেমীরা রেকর্ড ১৭২টি গোল দেখেছিলেন, যেখানে ম্যাচপ্রতি গড় গোল ছিল ২.৬৯। এবার যেহেতু ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে ১০৪ হচ্ছে, তাই মোট গোলের রেকর্ড ভাঙা কেবল সময়ের ব্যাপার। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ম্যাড়মেড়ে আসর হিসেবে পরিচিত ১৯৯০ বিশ্বকাপের ম্যাচপ্রতি সর্বনিম্ন গড় গোল (২.২১) হিসাব করলেও এবার গোল হওয়ার কথা অন্তত ২৩০টি। ফলে ফুটবলপ্রেমীরা যে এবার একটি বিশাল গোলবন্যা দেখতে যাচ্ছেন, তা বলাই বাহুল্য।
চল্লিশোর্ধ্ব ফুটবলারদের রেকর্ড
বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে (গত ২২ আসরে) ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সি খেলোয়াড় দেখা গেছে মাত্র সাতজন। কিন্তু এবার আধুনিক ফুটবলারদের ফিটনেসের এক অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী দেখতে যাচ্ছে বিশ্ব। এই এক আসরেই মাঠ কাঁপাতে প্রস্তুত মোট আটজন চল্লিশোর্ধ্ব ফুটবলার! এ তালিকায় আছেন পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (৪১), জার্মানির মানুয়েল নয়ার (৪০), বসনিয়ার এদিন জেকো (৪০), স্কটল্যান্ডের ক্রেইগ গর্ডন (৪৩), ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ (৪০), উরুগুয়ের ফার্নান্দো মুসলেরা (৪০) এবং মেক্সিকোর গুইলের্মো ওচোয়া (৪০)। এ রেকর্ড ভাঙার অর্থ হলো ফুটবলে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারের দীর্ঘায়ু এক নতুন যুগে পদার্পণ করেছে।
মিরোস্লাভ ক্লোসার মুকুট
বিশ্বকাপের মূল পর্বে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার করা ১৬ গোলের মহাকীর্তিটি এবার তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে। এ রেকর্ড ভাঙার প্রধান দুই দাবিদার লিওনেল মেসি (১৩ গোল) ও কিলিয়ান এমবাপ্পে (১২ গোল)। ফুটবলের খুদে জাদুকর মেসির প্রয়োজন আর মাত্র চারটি গোল। অন্যদিকে এমবাপ্পের বর্তমান বয়স ও ফর্ম বিবেচনা করলে ক্লোসাকে ছাড়িয়ে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, হ্যারি কেইন ও নেইমার আটটি করে গোল নিয়ে তালিকায় থাকলেও ক্লোসার থেকে তাদের ব্যবধানটা বেশকিছুটা দূরে।
সর্বকনিষ্ঠ গোল্ডেন বুটজয়ী
২০১০ বিশ্বকাপে মাত্র ২০ বছর বয়সে পাঁচ গোল করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন জার্মানির টমাস মুলার। ১৬ বছর পর এবার এ রেকর্ড কেড়ে নেওয়ার সবচেয়ে বড় দাবিদার স্পেনের বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল। মাত্র ১৮ বছর বয়সি এই উইঙ্গার ইতোমধ্যেই স্পেনের ২০২৪ ইউরো জয়ে প্রধান ভূমিকা রেখে নিজের জাত চিনিয়েছেন। বর্ধিত ম্যাচের এ বিশ্বকাপে ইয়ামাল বা অন্য কোনো তরুণ তুর্কি মুলারের এ রেকর্ড ভেঙে দিতে পারেন সহজেই।
বর্ধিত দল আর ম্যাচের সংখ্যা বাড়ায় ফুটবল রোমাঞ্চ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে পুরোনো ইতিহাস মুছে নতুন ইতিহাস লেখার সম্ভাবনা। আর মাত্র ছয়দিন পর শুরু হতে যাওয়া এই মেগা আসর আসলেই রূপ নিতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং রেকর্ড ভাঙা-গড়ার টুর্নামেন্টে।