Image description

সোনারহাট সীমান্ত। একপাশে বিছনাকান্দি। অন্যপাশে আলোচিত পাদুয়া। মধ্যরাতে বিজিবি’র তৎপরতা শুরু। দলে দলে মানুষের উপস্থিতি। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় লাগানো মাইকিং। একটু পরপর ঘোষণা- ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ দেখলে বিজিবিকে জানান।’ এমন ঘটনায় সতর্ক হন স্থানীয়রা। অনেকেই রাতে ঘর ছেড়ে বের হন রাস্তায়। বিজিবি’র সঙ্গে দেন টহলও। এমন ঘটনা গত শুক্রবার রাতের। এ দৃশ্য শুধু সোনারহাট সীমান্তেরই নয়। সিলেটের ৪৮ বিজিবি’র নিয়ন্ত্রিত ৮১ কিলোমিটার সীমান্ত জুড়ে। এই ব্যাটেলিয়নের অধিভুক্ত এলাকাগুলো বেশ স্পর্শকাতর। গেল কয়েক মাসে কয়েক দফা পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। এখন আসছে ক্ষণে ক্ষণে উড়ো খবর। সীমান্তে লোক জড়ো করা হচ্ছে। পুশইন করার চেষ্টা চলছে। আর এই খবর দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে।

এতে করে বিজিবি’র তৎপরতা আরও বেড়েছে। সোনারহাট সীমান্ত দুর্গম জনপদ। নদী ও জঙল বেষ্টিত এলাকা। রাতে বিজিবি’র মাইকিং শুনে জড়ো হন অনেকেই। তারাও হাতে টর্চলাইন নিয়ে হাজির হন বিজিবি’র সঙ্গে। এ সময় টহলের ভলান্টিয়ার হিসেবে তাদের সঙ্গে থাকেন বিজিবি’র জওয়ানরা। করেন ব্রিফিংও। জানান- জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও ছাতক দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এমন খবরও আসছে। এজন্য সীমান্ত এলাকার সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। যদি এ সংক্রান্ত কোনো খবর আসে তাহলে তাৎক্ষণিক বিজিবিকে অবগত করার অনুরোধ করেন ওই কর্মকর্তা। স্থানীয়রা জানান, হাতে টর্চলাইট নিয়ে বিজিবি’র জওয়ানরা রাতভর পাহারা দিচ্ছেন সীমান্তে। একইসঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দিয়ে মাইকিং করা হচ্ছে।

মাইকিং শুনে সীমান্তের মানুষও সচেতন হয়েছেন। তারা বলেন- সোনারহাট, প্রতাপপুর, পান্তুমাই, সোনাটিলা, আলু বাগানসহ কয়েকটি এলাকা দিয়ে নানা সময় পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি মানব পাচারও হয়ে থাকে। বর্তমানে পুশইনের পরিবর্তে স্থানীয় সোর্সের মাধ্যমে চোরাই পথে মানুষকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশে। এরই মধ্যে বিজিবি ও পুলিশ সীমান্ত এলাকায় কয়েকটি অভিযান চালিয়েছে। আর এসব অভিযানে সীমান্তের মানব পাচার সিন্ডিকেট সদস্যসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুর্গম সীমান্ত হওয়ায় ওই সীমান্ত দিয়ে এসব পাচার করা হয় বলে জানান তারা। এদিকে সোনারহাট সীমান্ত ছাড়াও আরেক রুট জাফলংয়ের সোনাটিলা এলাকায় রাতভর পাহারা দিয়েছেন বিজিবি’র জওয়ানরা। এ সময় পুশইন ঠেকাতে হ্যান্ডমাইক দিয়ে স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়।

বিজিবি’র পক্ষ থেকে রাতভর হুইসেল বাজিয়েও সতর্ক করা হয় বলে জানান স্থানীয়রা। একইভাবে জৈন্তাপুর সদর, আলুবাগান, মিনাটিলা, গোয়াবাড়ি, ডিবির হাওরসহ কয়েকটি এলাকায় জোরদার ছিল। জৈন্তাপুর পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, জৈন্তাপুর সদরে ঈদের আগে মানব পাচারের ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় একটি বাসা থেকে ভারত থেকে ফেরত আসা কয়েকজনকে আটক করা হয়। এ ঘটনার পর ওই সীমান্ত এলাকায় বিজিবি সতর্ক রয়েছে। বিজিবি’র পাশাপাশি পুলিশও টহল বাড়িয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক কমেছে। তবে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে জৈন্তাপুর পুলিশ প্রশাসক সতর্ক রয়েছেন। মিনাটিলা, আলু বাগান এলাকায়ও একইভাবে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি’র এই তৎপরতাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছে সীমান্ত এলাকার লোকজনও। পশ্চিম জাফলং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মামুন পারভেজ মানবজমিনকে জানান, সীমান্তের ওপারে বিএসএফের পুশইন তৎপরতার বিষয়ে বিজিবি’র কাছে খবর আসার পর সাধারণ মানুষ মুহূর্তে সাড়া দেন। বিজিবিকে সহায়তায় পাশে দাঁড়ান পান্তুমাই, বাবুরকোনা, সোনারহাট, ইসলামাবাদ, লংলাখাল, বিছনাকান্দিসহ আশপাশের মানুষজন। বিজিবি’র মাইকিংয়ের পাশাপাশি সবধরনের সহযোগিতায় জনপ্রতিনিধিরাও সমবেত হন।

যেকোনো প্রয়োজনে বিজিবি’র পাশে থাকতে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তারা। এদিকে পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, খবর পেয়ে আশপাশের সবক’টি সামাজিক সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে আমরা ডাকে সাড়া দেই। সীমান্তে বিএসএফের অবৈধ পুশইন ঠেকাতে ও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা সারা রাত জেগে বিজিবি’র টহলরতদের সহযোগিতায় ছিলাম। দেশ মাটির স্বার্থে যেকোনো প্রয়োজনে নিয়োজিত বিজিবি’র সঙ্গে আমরা আছি। ভবিষ্যতেও থাকবেন বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে কথা হলে ৪৮ বিজিবি সিলেট ব্যাটালিয়নে কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মো. নাজমুল হক জানান, বিএসএফের অবৈধ পুশইনসহ সবধরনের অপতৎপরতা রোধে বিজিবি’র তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বিজিবি। সীমান্ত এলাকায় পুশইনসহ সবধরনের অবৈধ অপতৎপরতা রোধে চলমান কার্যক্রম আরও বেগবান করা হবে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিজিবি চলমান দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনে কঠোরতা দেখাবে বলে জানান তিনি।