Image description

নাগরিকদের হাতে উন্নতমানের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০১১ সালে শুরু হয়েছিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্প। তবে ১৫ বছর পেরিয়েও প্রকল্পটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩০শে নভেম্বর। কিন্তু এখনো ২ কোটির বেশি ভোটার স্মার্ট এনআইডি কার্ড পাননি। নির্ধারিত সময়ে কার্ড দেয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বরং প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় আরও দুই বছর বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। একইসঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার করার উদ্যোগে দৃশ্যমান সাফল্য না থাকলেও বিদেশ সফরের ব্যয় নিয়ে বাড়ছে সমালোচনা।

ইসি ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, আইডিইএ প্রকল্পটি শুরু থেকেই ছিল ধীরগতির। প্রকল্পের মেয়াদ ৬ দফা বাড়ানো হয়। ২০১১ সালে এনআইডি উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়। তবে বিভিন্ন শর্তের কারণে প্রকল্পের মূল কার্যক্রম শুরু করতে দুই বছর বিলম্ব হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অবার্থুর টেকনোলজিস-এর সঙ্গে ৮১৬ কোটি টাকায় স্মার্টকার্ড উৎপাদন ও বিতরণের চুক্তি করা হয়। যার মেয়াদ নির্ধারিত ছিল ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। পরে বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর করা হয়। তবে কাজের ধীরগতি ও অপেশাদারিত্বের অভিযোগে ২০১৭ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ইসি।

এরপর বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে অর্থায়নে অনাগ্রহ দেখায়। পরবর্তীতে সরকারি অর্থায়নে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ভোটারকে স্মার্ট এনআইডি দেয়া হয়। পরবর্তীতে এ প্রকল্পের সময় না বাড়িয়ে ২০২০ সালের পহেলা ডিসেম্বর ‘আইডিইএ ফেজ-২’ নামে নতুন একটি ৫ বছর মেয়াদি প্রকল্প হাতে নেয় ইসি। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে ৩ কোটি নাগরিককে স্মার্ট এনআইডি প্রদান। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এজন্য প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০শে নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়। এ সময়েও কাজ শেষ না হওয়ার শঙ্কায় প্রকল্পের মেয়াদ ফের দুই বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ইসি।

এদিকে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পূর্বনির্ধারিত দামে ৩ কোটি স্মার্ট এনআইডি কার্ড সরবরাহে অপারগতার কথা জানায় বিএমটিএফ। পরে আলোচনার মাধ্যমে প্রতিটি কার্ড ১৭২ টাকা দরে ৪০৬ কোটি টাকায় ২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার কার্ড সরবরাহের প্রস্তাব দেয় ইসি। এই প্রস্তাবে রাজি হয় প্রতিষ্ঠানটি। ফলে দীর্ঘসূত্রতা ও বাস্তবায়নে ঢিলেমির কারণে নির্ধারিত অর্থে প্রায় ৬৪ লাখ কার্ড কম পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, প্রকল্পের মেয়াদ ৫ বছর পেরিয়েছে। এখন পর্যন্ত এর আওতায় মাত্র ১৭ লাখ স্মার্টকার্ড বিভিন্ন উপজেলা নির্বাচন অফিসে বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ব্ল্যাংক স্মার্টকার্ড যাচাইয়ের জন্য ফ্রান্স সফর করেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং আইডিইএ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তবে সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ২ কোটি ১৯ লাখ কার্ড দেশে আসেনি। এখন প্রকল্পের মেয়াদ বাকি আছে মাত্র ৬ মাস। এ সময়ে বিপুল সংখ্যক কার্ড সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ে সংশয় রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। তবে প্রকল্প পরিচালক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বিএমটিএফের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে। আমরাও সরজমিন দেখেছি। নির্ধারিত সময়ে কার্ড পাওয়ার বিষয়ে আমরা আশাবাদী।

স্মার্ট এনআইডি প্রকল্পে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, জনবল ও ব্ল্যাংক কার্ড-সবই নির্বাচন কমিশনের সরবরাহ করা। তবুও কার্ডে তথ্য সংযোজন বাবদ অর্থ গ্রহণ করছে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)। সংস্থাটি প্রতি কার্ডে ৩২ টাকা হারে ১ কোটি ২১ লাখ কার্ড পার্সোনালাইজেশনের জন্য মোট প্রায় ৭৪ কোটি টাকা নিয়েছে। এ ছাড়া, যন্ত্র মেরামতের নামে ২৩ কোটি টাকা দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি বাস্তবে কোনো যন্ত্র মেরামতের প্রমাণ পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সূত্র জানায়, প্রথম তদন্ত কমিটি কোনো প্রমাণ পায়নি। এরপর বিএমটিএফের আবেদনের প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় দফায় আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি মাত্র একটি যন্ত্রে খুচরা যন্ত্রাংশ সংযোজনের তথ্য পেয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত ১০টি মেশিনের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ২টি। বাকি মেশিনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অচল। সমপ্রতি আবার এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালককে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আইডিইএ ফেজ-২ প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজুর রহমান সিদ্দিকী মানবজমিনকে বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা ১৭ লাখ এনআইডি কার্ড পেয়েছি। কয়েকদিনের মধ্যে আরও ৩ লাখ কার্ড চলে আসবে। আশা করছি, বাকি কার্ড নভেম্বরের ৩০ তারিখের মধ্যে পেয়ে যাবো। মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ৩ বছর মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজন। তবে আলোচনার মাধ্যমে মেয়াদ বৃদ্ধি ও অর্থায়ন কৌশল চূড়ান্ত করা হবে। এক বছরের নো-কস্ট এক্সটেনশন ইতিমধ্যে প্রদান করা হয়েছে। যার মেয়াদ চলতি বছরের ৩০শে নভেম্বর শেষ হবে। চুক্তি অনুযায়ী ২ বছর উইথ কস্ট এক্সটেনশন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো যাবে। তবে, আমরা আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে প্রজেক্ট শেষ করার পরিকল্পনা করছি।

বিকল্প সংরক্ষণব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, এনআইডি’র তথ্যভাণ্ডার সুরক্ষা অতি জরুরি। বর্তমানে আউটসোর্সিং টিমের সঙ্গে আমাদের লোকজন সিস্টেম চালাচ্ছে। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে ৬ কোটি টাকারও বেশি খরচ। এজন্য বাড়তি টাকা লাগছে। প্রশিক্ষিত হলে আমাদের লোকজন পুরো সিস্টেম মেইনটেইন করবে। এতে অতিরিক্ত খরচ লাগবে না। নিজের অভিমত ব্যক্ত করে প্রকল্প পরিচালক বলেন, স্মার্টকার্ড মেট্রোরেল, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এমনকি জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মতো বিভিন্ন খাতে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্মার্টকার্ডের সম্ভাব্য ব্যবহার নির্ধারণে বুয়েটসহ নয়জন অধ্যাপক ও একটি পরামর্শক দলকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিদেশ সফরের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বাজেটের মধ্যেই আমাদের কার্যক্রম শেষ হবে।

তবে, এত অল্প সময়ে এতসংখ্যক কার্ড পাওয়ার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি মুঠোফোনে মানবজমিনকে বলেন, চুক্তিটি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।