সভাপতি যায়, সভাপতি আসে। এক পরিচালনা পর্ষদ গিয়ে আসে নতুন পরিচালনা পর্ষদ। বিসিবির নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তবু থেকেই যায়। রাজনৈতিক পরিচয়ে সভাপতি, সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে সভাপতি, সাবেক ক্রিকেটার পরিচয়ে সভাপতি—কেউই পারেন না বিসিবিকে স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন উপহার দিতে।
নির্বাচনকালীন বিসিবির প্রধান যে–ই থাকুন না কেন, সেটা নির্বাচিত সভাপতি কিংবা আহ্বায়ক কমিটির প্রধান পরিচয়েই হোক; নির্বাচন হবে অনিয়ম, বিতর্ক আর ক্ষমতার চাপে বিরোধী পক্ষকে কোণঠাসা করার চর্চা অব্যাহত রেখে—এটাই যেন রীতি!
আলোচিত ৭ জুনের নির্বাচনও সে পথেই এগোচ্ছে। ১৬ মে তফসিল ঘোষণার পর গত কয়েক দিনে একটার পর একটা প্রক্রিয়া পার হয়ে নির্বাচন এখন ব্যালট বাক্সে ঢোকার দ্বারপ্রান্তে। অতীতের মতো এই নির্বাচনও প্রতিটি পদক্ষেপে শরীরে বিদ্ধ করে নিয়েছে সমালোচনার কাঁটা। যেকোনো মূল্যে বিসিবিতে বসার লজ্জাজনক সংস্কৃতি থেকে যেন মুক্তি নেই বাংলাদেশের ক্রিকেটের!
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের আহ্বায়ক কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজনের। সেই আশার গুড়ে বালি পড়েছে। কারণ, সভাপতি তামিমসহ আহ্বায়ক কমিটির ১১ সদস্যের ৭ জন নিজেরাই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এতে গঠণতান্ত্রিক বাধা না থাকলেও নৈতিকতার প্রশ্ন তো আসেই।
আহ্বায়ক কমিটি অবশ্য আশ্বাস দিয়েছে, নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কা নেই। কারণ, নির্বাচন তো পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন। হ্যাঁ, ঠিক তাই। তবে এ ধরনের কথা গত নির্বাচনে সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম এবং তাঁর সঙ্গীদের মুখেও শোনা গিয়েছিল। সেই নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বও ছিল নির্বাচন কমিশনের। তারপর কী হয়েছে, সেটি অস্বচ্ছতার অভিযোগে নির্বাচন বর্জন করা তামিম ও তাঁর সঙ্গীদের চেয়ে কারও ভালো জানার কথা নয়।

নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়া বিসিবির বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি শুরুতেই বিশেষ এক বিশেষণে ভূষিত হয়েছে, যেটি আসন্ন নির্বাচনে আরও ‘উজ্জ্বল’ হতে চলেছে। তামিমের অন্তর্বর্তী বোর্ডের নাম পড়েছে ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড।’ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের একাধিক মন্ত্রীর সন্তানেরা কমিটিতে সুযোগ পাওয়ায় সংসদ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে এক সংসদ সদস্যই দিয়েছেন এমন স্যাটায়ারধর্মী বিশেষণ, যেটি পরে ছড়িয়ে পড়ে দেশের মানুষের মুখে মুখে।
তাঁদের অধীনে ৭ জুনের নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া ‘প্রার্থী’দের জন্য অবশ্য আরও কিছু ‘বাপের দোয়া’সহ ‘ভাইয়ের দোয়া’, ‘চাচার দোয়া’, ‘মন্ত্রীর দোয়া’ও থাকবে। সব মিলিয়ে প্রার্থীদের প্রায় এক–তৃতীয়াংশই ‘দোয়ানির্ভর’। তাঁরা বর্তমান সরকারি দলের সংসদ সদস্য অথবা মন্ত্রীদের আত্মীয়স্বজন, অনেকের আবার নিজেদেরই আছে রাজনৈতিক পরিচয়। প্রার্থী তালিকা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ১৮৪ জনের কাউন্সিলর বা ভোটার তালিকার দিকে তাকালে এমন মুখ ভেসে উঠবে আরও অনেক।
বিসিবির এবারের নির্বাচনও তাই আগের মতোই প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হয়ে পড়েছে। জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে নিয়ে গঠিত ক্যাটাগরি–১ থেকে পরিচালক হবেন ১০ জন। এর মধ্যে ৭ জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। নির্বাচন হবে শুধু খুলনার দুটি ও বরিশালের একটি পদের জন্য, তা–ও হয়তো নামমাত্রই। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন বিভিন্ন সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ক্যাটাগরি–৩ এর একমাত্র পরিচালকও।
দুজন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় ঢাকার ক্লাবগুলোকে নিয়ে ‘ক্যাটাগরি–২’ এ প্রার্থী সংখ্যা ১৮ থেকে কমে ১৬ জন হয়েছে। এখানে পরিচালক হবেন ১২ জন, ‘ইলেকশন মেকানিজম’ এ ‘সাফল্য’ পেয়ে ৭–৮ জন এরই মধ্যে নিশ্চিন্ত। বাকি পদগুলোতে কাদের নির্বাচিত করতে হবে, কাদের বাদ দিতে হবে; তা নিয়েও ওপর মহলের চাপ আছে বলে অভিযোগ। এ নিয়ে ক্লাব ক্যাটাগরির প্রভাবশালী প্রার্থীদের সঙ্গে সরকারপক্ষের একাধিক সভা হয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু এসব কথা আবার কোণঠাসা প্রার্থীরা প্রকাশ্যে বলেন না। হতে পারে তা ভয় কিংবা বিসিবির পরিচালক পদ ‘বিসর্জন’ দিয়ে ভবিষ্যতে অন্য কোনো লাভের আশায়।
৭ জুনের নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা তুললেই বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক পরিচয়ে তো ক্রিকেট বোর্ডে আগেও অনেকে এসেছেন। এবার তাহলে সমস্যা কী! হ্যাঁ, অবশ্যই এসেছেন এবং সেটাও ঠিক হয়নি। অতীতের সেই অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতেই তো তামিমের আহ্বায়ক কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করার। সেই তাঁরাই যখন বিসিবির নির্বাচনটাকে রাজনীতির পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন, কথা তো হবেই। শুধু কথা কেন, পরিচালক পদপ্রার্থীদের ‘প্রোফাইলে’র কারণে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবেও রেকর্ড গড়ে ফেলতে পারে এটি।
আর রাজনৈতিক পরিচয়ে বিসিবিতে আগে অনেকে এলেও এবারের সঙ্গে সেসবের পার্থক্য আছে। আগে যাঁরা এভাবে পরিচালক হয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে পরিচিতি ও অভিজ্ঞতা ছিল। বাংলাদেশের প্রায় সব ক্লাবেরই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে। জেলা এবং বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাতে তো আছেই। কাজেই এসব জায়গা থেকে আসা সংগঠকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আগে এমন পরিচালকদের সেই পরিচয় ঢাকা পড়ে যেত সংগঠক পরিচয়ের আড়ালে। বিএনপিপন্থী ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যে সে রকম যোগ্য মানুষের অভাব নেই। কিন্তু কেন যেন এবারের নির্বাচনে তাঁরা ব্রাত্য। হয়তো তাঁদের জন্য কারও ‘দোয়া’ নেই বলেই।

যেকোনো ক্রীড়া ফেডারেশনের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর নাম বললে আগে তাঁর ক্রীড়া সংগঠক পরিচয়টাই সামনে আসা উচিত, রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে সেটি আসবে পরে। এবার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। কারও না কারও ‘দোয়া’ বা ‘আশীর্বাদ’ না থাকলে পরিচালক পদে নির্বাচন করা দূরে থাক, এই প্রার্থীদের অনেকে হয়তো বিসিবির কাউন্সিলরই হতে পারতেন না।
জেলা ও বিভাগের কাউন্সিলর মনোনয়ন থেকে শুরু করে বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা; এমনকি ক্লাব থেকে কারা পরিচালক হবেন—সবই যেন আগেই ছক কষে ঠিক করা। অনেক জেলার অ্যাডহক কমিটি জানতও না, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি (পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক) কার নাম বিসিবিতে কাউন্সিলর (ভোটার) হিসেবে পাঠিয়েছেন। সঙ্গে আগের মতোই যোগ হয়েছে সন্দেহজনক ই-ভোট।
তাহলে আর পরিবর্তনটা কী হলো! অ্যাডহক কমিটি করেও নির্বাচনে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা কোথায়? পরিস্থিতি যা, তাতে ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার স্লোগানটাকে বায়বীয় প্রমাণ করতে হয়তো বিসিবির ৭ জুনের একপেশে নির্বাচনই যথেষ্ট হবে।