পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে ব্যতিক্রমী এক নাম মোহাম্মদ আমির। অল্প বয়সেই বিশ্ব ক্রিকেটে যেমন খ্যাতি পেয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই নিষেধাজ্ঞার কালো অন্ধকারে হারিয়েও গিয়েছিলেন। ফিটনেস, ফর্ম ও নির্বাচক কমিটির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে মাত্র ২৮ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা দেন তারকা এই পেসার। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ালেও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নিয়মিত মুখ তিনি। পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল), বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল), দ্য হান্ড্রেডসহ বিভিন্ন টুর্নামেন্ট মাতাছেন আমির।
মূলত ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক অভিষেকেই আলোচনায় এসেছিলেন আমির। সে বছরই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে দুর্দান্ত বোলিংয়ে নজর কাড়েন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুইং আর নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেন্থে পাকিস্তানের প্রধান অস্ত্রও হয়ে ওঠেছিলেন। পরের বছরে ইংল্যান্ড সফরে লর্ডসে তার দুর্দান্ত স্পেল বিশ্ব ক্রিকেটকে মুগ্ধ করেছিল। সময়ের পরিক্রমায় তাকেই ওয়াসিম আকরাম-ওয়াকার ইউনিসের যোগ্য উত্তরসূরি বলা হচ্ছিল। কিন্তু সে বছরই স্পট ফিক্সিং কাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এ ঘটনায় আমিরকে পাঁচ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল আইসিসি। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার প্রায় এক বছর পর ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে ভারতের টপ-অর্ডার ধ্বংস করে দিয়ে পাকিস্তানকে ঐতিহাসিক শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন আমির।
সিলেটে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের ক্রীড়া প্রতিবেদক মোহাম্মদ রনি খাঁ’র সঙ্গে আলাপ করেছেন এই তারকা পেসার। যেখানে নিজের ক্যারিয়ার, ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তনের গল্পসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলাপ করেছেন আমির। সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশই নিচে তুলে ধরা হলো...
বিপিএলে নিয়মিত মুখ আপনি, এই টুর্নামেন্ট নিয়ে বেশ জানাশোনা আপনার, সুযোগ পেলে বিপিএলে কী পরিবর্তন করতে চাইবেন?
মোহাম্মদ আমির : একটি জিনিস পরিবর্তন... সত্যি বলতে অনেক কিছুই আছে। উইকেট আরও ভালো হতে পারে। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতার তুলনায় এখনকারটা ভালো। ক্রিকেটের মান উন্নত হচ্ছে। তাই কেবল কিছু পরিবর্তনের কথা বলতে পারি না। যদি তারা (বিসিবি) আরও বেশি তরুণ খেলোয়াড়কে সুযোগ দেয়, সেটা ভালো হবে। আমি দুই-তিনজন তরুণ খেলোয়াড় দেখেছি, তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। কিন্তু যত্ন নিয়ে গড়ে তুলতে হবে।
গতকাল (১ জানুয়ারি) শামীম পাটোয়ারি ৪৩ বলে ৮১ রানের মহাকাব্যিক এক ইনিংস খেলেছে, শেষ ওভারে আপনিই বোলিংয়ে ছিলেন। কি মনে হচ্ছিল?
মোহাম্মদ আমির : সত্যি বলতে, বিপিএলে দেখা সেরা ইনিংসগুলোর একটি এটি। সে (শামীম) দারুণ কিছু শট খেলেছে। একজন বোলার হিসেবে বললে, তার কাছে এমন সব শট আছে যেগুলো দিয়ে সে বোলারদের সামলাতে পারে। তার বাংলাদেশের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে।
স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে পাঁচ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন। বিপিএলের মাধ্যমেই ক্রিকেটে আপনার প্রত্যাবর্তন ঘটেছিল...
মোহাম্মদ আমির : হ্যাঁ, বিপিএলই ছিল ফেরার পথ। তার আগে পাকিস্তানে মাত্র পাঁচটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছিলাম। পরে এখানে চিটাগং ভাইকিংসের হয়ে খেলি, ভালো পারফর্ম করি। তামিম (ভাই) অধিনায়ক ছিলেন। সেটাই ছিল আমার ফেরার পথ। বিপিএল আমার হৃদয়ের খুব কাছের; এই টুর্নামেন্টই আমাকে ফের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরিয়ে এনেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে অন্যতম তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমান। আইপিএলেও রেকর্ড মূল্যে তাকে দলে টেনেছে কেকেআর। দ্য ফিজকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মোহাম্মদ আমির : সে (দ্য ফিজ) বাংলাদেশ ও বিশ্বের সেরাদের একজন। সে দিন দিন আরও ভালো হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার ফিটনেস। সে ফিট, শিখতেও চায়, প্রতিদিন শিখছে এবং দিন দিন আরও ভালো করছে।
বাংলাদেশে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা থেকে তামিম-সাকিবসহ অনেকের সঙ্গেই ড্রেসিংরুম শেয়ার করেছেন, আপনার প্রিয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার কে?
মোহাম্মদ আমির : আমার প্রিয়... আমার ভালো বন্ধু শান্ত। শান্ত আমার ভালো বন্ধু এবং আমি তাকে একজন খেলোয়াড় হিসেবে খুব পছন্দ করি। সে দারুণ খেলোয়াড়।
সাকিব আল হাসান সম্পর্কে যদি বলতেন
মোহাম্মদ আমির : সাকিবকে (ভাই) ২০১৫-১৬ সাল থেকে চিনি। সে আমার মতই একটু আগ্রাসী, কিন্তু খুব ভালো মানুষ। সম্প্রতি টি-টেনে তার সঙ্গে দেখা হয়েছে, সে ভালো করছে। সে বাংলাদেশের একজন বড় অ্যাম্বাসেডর। সে অনেক কিছু দিয়েছে, অনেক পারফর্ম করেছে এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটে তার ভূমিকাও বেশ।
মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার সঙ্গে অনেক ক্রিকেট খেলেছেন। তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মোহাম্মদ আমির: তার সঙ্গে অনেক খেলেছি, তিনি সিলেট স্ট্রাইকার্সের অধিনায়ক ছিলেন। তাকে খুবই বিনয়ী মানুষ হিসেবে পেয়েছি এবং সে আমার ভালো বন্ধু। আমি দুদিন আগেই তার সঙ্গে কথা বলেছি। অনেক মানুষ তাকে অনেক সম্মান করে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অবদান রেখেছেন তিনি। তাকে শুধুই শুভকামনা জানাতে চাই।
২০২০ সালে খুলনা টাইটান্সের হয়ে খেলতে এসে ৫ উইকেট নেওয়ার পর নাফিস ইকবালকে পাঁচ আঙুল দেখিয়েছিলেন, বিষয়টি নিয়ে অনেকেই এখনো জানেন না। মূল কারণ কী ছিল?
মোহাম্মদ আমির : নাফিস (ভাই) খুব ভালো মানুষ। সম্প্রতি তার সঙ্গে আবার দেখা হয়েছে। আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো, প্রায়ই ফোনে কথা হয়। যখন আমি খুলনার হয়ে খেলছিলাম, তখন সে (নাফিস) ম্যানেজার ছিল। বিপিএলে আমার প্রথম ফাইফার ছিল ওটা। তাই তাকে পাঁচ আঙুল দেখিয়েছিলাম—‘এটা তোমার জন্য’।
২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনাল আপনার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত বোধ-হয়। ভারতের টপ-অর্ডার গুঁড়িয়ে পাকিস্তানকে ঐতিহাসিক শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই ম্যাচে রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি ও শিখর ধাওয়ানকে প্যাভিলিয়নের পথ দেখান। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আপনার বলে কোহলির ক্যাচ মিস হয়েছিল, তখন মাথায় কী চলছিল...
মোহাম্মদ আমির: সে সময়টা খুব বেশি ছিল না ভাবার। তখনও ফখরের নো-বলের কথা ভাবছিলাম, যেটার পর সে (বিরাট) সেঞ্চুরি করেছিল। কোহলি একজন বড় খেলোয়াড়। আমি ভাবছিলাম, এটা আবার হতে দেওয়া যাবে না। সে যদি সেঞ্চুরি করে, ভারত ট্রফি জিতে যাবে। সত্যি বলতে, ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল খেলে জেতাটাই আমার ক্যারিয়ারের সেরা স্মৃতি। ওই স্পেলটা আমার হৃদয়ের খুব কাছের।
মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম, এটা নিয়ে কথা বলবে-
মোহাম্মদ আমির : যেমন আমরা ওয়াসিম ভাইয়ের ১৯৯২ সালের স্পেল নিয়ে কথা বলি, তেমনি এই প্রজন্ম আমার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালের সেই স্পেল নিয়ে কথা বলছে। এটা আমার জীবনের সেরা স্পেল।
২০০৯ সালে শচীন টেন্ডুলকারকে একবার স্লোয়ারে আউট করেছিলেন, মনে আছে নিশ্চয়ই...
মোহাম্মদ আমির : ওটার অনুভূতি আলাদা। শচীনের বিরুদ্ধে বোলিং আমার স্বপ্ন ছিল। ওই উইকেটের পর ভারতে আমার অনেক ভক্ত তৈরি হয়।
বিসিবি যদি আপনাকে পেস বোলিং কোচ বা মেন্টর হওয়ার প্রস্তাব দেয়, ভেবে দেখবেন কি না?
মোহাম্মদ আমির : খুব খুশি হবো এবং অবশ্যই করতে চাই।