Image description

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি তামিম ইকবাল জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত তিন মাস সময়ের আগেই পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন আয়োজন করবেন। সে অনুযায়ী কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মধ্যেই দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থাটির নির্বাচন হচ্ছে। ঘোষিত তফশিল অনুযায়ী, আগামী ৭ জুন হবে বিসিবির নির্বাচন। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) নির্বাচন ঘিরে আবারও সামনে এসেছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।

কাউন্সিলর মনোনয়ন থেকে শুরু করে পরিচালক পদে সমীকরণ—সবকিছুতেই ক্ষমতার পালাবদলের ছাপ দেখা যাচ্ছে। ফলে এও প্রশ্ন উঠেছে, ক্রিকেট প্রশাসন কি সত্যিই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চলছে, নাকি রাজনৈতিক সমর্থনই নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। বিসিবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগের আমলের মতো এবারও বিসিবিতে রাজনৈতিক নির্বাচন হতে চলেছে। বিসিবি সূত্রে পাওয়া কাউন্সিলরশিপ তালিকা থেকেও এর আংশিক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

সবমিলিয়ে ক্রিকেট অঙ্গনে আলোচনা এখন মাঠের খেলার চেয়ে বোর্ড রাজনীতিতেই বেশি। যদিও তামিম ইকবাল এসব বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। তিনি মাঠের খেলা এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেই ব্যস্ত থাকছেন।

এবার জেলার ক্যাটাগরিতে খুলনা বিভাগ থেকে শফিকুল আলম তুহিন কাউন্সিলর মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। খুলনা-২ আসন থেকে বিএনপির অন্যতম প্রধান মনোনয়ন প্রত্যাশীও ছিলেন।

অন্যদিকে যশোর জেলা থেকে কাউন্সিলরশিপ পাওয়া শান্তনু ইসলাম সুমিত বিএনপির সাবেক স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী মরহুম তরিকুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ ছেলে। বিএনপির বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতা ও সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত তার ছোট ভাই।

সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা থেকে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী কাউন্সিলর হয়েছেন। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীও ছিলেন। দলের প্রতি তার নিষ্ঠা ও একাগ্রতা বিবেচনায় অনেকই মনে করেছিলেন, আসনটিতে মনোনয়ন পাবেন জেলার বিএনপির এই সভাপতি। কিন্তু নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার সুফল হিসেবে তাকে এই পদে বসিয়েছিল বিএনপি সরকার। এবার বিসিবিতেও আসতে চলেছেন বিএনপির এই প্রভাবশালী নেতা।

কাউন্সিলর মনোনয়ন থেকে শুরু করে পরিচালক পদে সমীকরণ—সবকিছুতেই ক্ষমতার পালাবদলের ছাপ দেখা যাচ্ছে। ফলে এও প্রশ্ন উঠেছে, ক্রিকেট প্রশাসন কি সত্যিই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চলছে, নাকি রাজনৈতিক সমর্থনই নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। বিসিবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগের আমলের মতো এবারও বিসিবিতে রাজনৈতিক নির্বাচন হতে চলেছে। বিসিবি সূত্রে পাওয়া কাউন্সিলরশিপ তালিকা থেকেও এর আংশিক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

জামালপুর জেলা থেকে আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদওয়ান কাউন্সিলর হয়েছেন। বিসিবির সাবেক পরিচালক তিনি। বিএনপিপন্থী এই ক্রীড়া সংগঠক জামালপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছেন। এর আগে, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি প্রার্থী ছিলেন। তবে, শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হওয়া বিসিবি নির্বাচনেও পরিচালক পদপ্রার্থী ছিলেন। কিন্তু তামিম ইকবালপন্থী প্যানেল নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার পর তিনিও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। যদিও নির্বাচনের আগদিনও আইনি লড়াই চালিয়ে যান।

বরিশাল থেকে কাউন্সিলর হয়েছেন বিপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি ফরচুন বরিশালের মালিক মিজানুর রহমান। তামিম ইকবালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তিনি। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবেও পরিচিত তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, এই জেলার কোটা থেকে তিনিই পরিচালকও হতে যাচ্ছেন। 

এদিকে বরিশাল বিভাগীয় কাউন্সিলর হিসেবে মিজানুরের আবেদনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক ও সাধারণ খেলোয়াড়রা। বরিশাল স্টেডিয়ামের সামনে গত ১৬ মে মানববন্ধনে এই প্রতিবাদ জানানো হয়। এতে শতাধিক সাধারণ খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠকরা অংশ নেন।

অন্যদিকে ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাব থেকে ইয়াসির ফয়সাল আশিক কাউন্সিলর হয়েছেন। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ডে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) কোটায় বিসিবি পরিচালক হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। বিসিবিতে লজিস্টিকস ও প্রটোকল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে গত ২ এপ্রিল বিসিবি পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।

বুলবুলের কমিটির ফায়াজুর রহমান মিতুও উত্তরা ক্রিকেট ক্লাব থেকে কাউন্সিলর হয়েছেন। বুলবুলের কমিটিতে ডিসিপ্লিনারি কমিটির চেয়ারম্যান ও ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিসের (সিসিডিএম) ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। কিন্তু গত ৪ এপ্রিল ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে এবং বোর্ডের কার্যক্রমে অস্বচ্ছতা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।

ট্রাই স্টেট ক্রিকেটার্স ক্লাব থেকে কাউন্সিলরশিপ নেওয়া আমজাদ হোসেন বিলুপ্ত বুলবুলের কমিটিতে মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু মিডিয়া কমিটি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর পরিচালক পদ থেকেও পদত্যাগ করেন। বুলবুলের বোর্ডের পদত্যাগী আরেক পরিচালক শানিয়ান তানিম ঢাকা মেরিনার্স ইয়াংস ক্লাব থেকে কাউন্সিলরশিপ জমা দিয়েছেন। 

সূত্র বলছে, রাজনৈতিক সমীকরণ ও তামিম ইকবালপন্থীদের সমর্থন জানিয়ে বুলবুলের কমিটিতে পদত্যাগ করার পুরস্কার হিসেবেই আগামী বোর্ডে তাদের রাখা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ না মেলায় বুলবুলের বোর্ডের অনেকেই এবার জায়গা পাচ্ছেন না, তবে বিভিন্ন কমিটিতেও ভবিষ্যতে জায়গা পেতে যাচ্ছেন তারা।

এদিকে বিসিবিতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পাঁচ জন কাউন্সিলর মনোনয়ন করেন। এই পাঁচ জনের মধ্যে সাবেক জাতীয় ফুটবলার জাহেদ পারভেজ চৌধুরী রয়েছেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোটায় বিসিবির মনোনয়ন ছাড়াও ক্রীড়াঙ্গনে সমস্যা নিরসন, ক্রীড়া ভাতার জন্য খেলোয়াড়দের যাচাই-বাছাই কমিটিতেও আছেন তিনি। সাবেক জাতীয় ফুটবলার জাহেদ পারভেজ যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রীর আরেক ঘনিষ্ঠ সাব্বির আহমেদও প্রগতি সেবা সংঘ ক্লাব থেকে কাউন্সিলরশিপ নিয়েছেন।

অন্যদিকে ক্লাব ক্যাটাগরিতে বিসিবির বর্তমান পরিচালক ফাহিম সিনহা আবাহনী লিমিটেডের কাউন্সিলর হয়েছেন। এ ছাড়া ব্রাদার্স ইউনিয়ন থেকে ইশরাক হোসেন কাউন্সিলর মনোনীত হয়েছেন এবং জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল ওল্ড ডিওএইচএসের কাউন্সিলরশিপ পেয়েছেন। পাশাপাশি, ইন্দিরা রোড ক্রীড়া চক্র থেকে রফিকুল ইসলাম বাবু ও প্রাইম ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে তানজিল চৌধুরী কাউন্সিলর হয়েছেন।

এর মধ্যে ফাহিম সিনহা, রফিকুল ইসলাম বাবু, তানজিল চৌধুরী বিএনপিপন্থী ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেই পরিচিত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হওয়া বিসিবি নির্বাচনে তামিম ইকবালপন্থী প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে বনিবনা না হওয়ায় সরে দাঁড়ান তারা। এ ছাড়া ইশরাক হোসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য।

এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরাও কাউন্সিলরশিপ জমা দিয়েছেন। ঢাকা-৮ এর সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের সন্তান মির্জা ইয়াসির আব্বাস আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব থেকে; বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা, কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সন্তান সৈয়দ ইব্রাহীম আহমেদ ফায়ার ফাইটার্স স্পোর্টিং ক্লাব থেকে এবং অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরু এক্সিউম ক্রিকেটার্স ক্রিকেট ক্লাব থেকে কাউন্সিলরশিপ নিয়েছেন।

নিরাপত্তার ইস্যু তুলে ধরে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ মাসুদুজ্জামান মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব থেকে; সাবেক ফুটবলার ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্রীড়া দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মইনুল হক মইন সিটি ক্লাব থেকে কাউন্সিলরশিপ নিয়েছেন। এ ছাড়া পারটেক্স স্পোর্টিং ক্লাব ক্রিকেট ক্লাব থেকে আজিজ আল কায়সার, লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ থেকে লুৎফর রহমান বাদল এবং বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্স থেকে তাসবির উল ইসলামের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীরা কাউন্সিলরশিপ জমা দিয়েছেন।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিরাজউদ্দিন আলমগীর কাউন্সিলরশিপ জমা দিয়েছেন। সাবেক অধিনায়ক ক্যাটাগরিতে হাবিবুল বাশার সুমন ও খালেদ মাহমুদ সুজন কাউন্সিলর হয়েছেন। এ ছাড়া সাবেক ক্রিকেটারদের মধ্যে তালহা জুবায়ের, সৈয়দ রাসেল, নাজমুল ইসলাম, নাফিস ইকবাল ও নাঈম ইসলাম কাউন্সিলরশিপ পেয়েছেন। তাদের অনেকেই আবার বর্তমানে বিসিবিতে কর্মরত আছেন।

ঢাকার ক্লাব ক্যাটাগরিতে সম্ভাব্য কয়েকজন আলোচিত প্রার্থীর নাম কাউন্সিলর তালিকায় দেখা যায়নি। গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত ফারুক আহমেদ, ইফতেখার রহমান মিঠু, মাহবুব আনাম, ইসতিয়াক সাদেক ও লোকমান হোসেন কাউন্সিলরশিপ জমা দেননি।

জানা গেছে, মোট ১৯২ জন কাউন্সিলরের মধ্যে এবার ১৮৪টি কাউন্সিলরশিপ জমা পড়েছে। অর্থাৎ ৮টি কাউন্সিলরশিপ জমা পড়েনি। এর মধ্যে কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে কোনো কাউন্সিলরশিপ জমা হয়নি। পাশাপাশি, কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া এবং বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপিও কাউন্সিলর পাঠায়নি।

এর আগে, ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের জেরে গত ৭ এপ্রিলে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন পর্ষদ ভেঙে দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। একইদিন সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটিও গঠন করে এনএসসি।

এ সিদ্ধান্তকে বেআইনি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেন বুলবুল। পাশাপাশি, বিসিবির সাবেক ১২ জন পরিচালককে সঙ্গে নিয়ে এই অ্যাডহক কমিটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন এবং নিজেকে একমাত্র বৈধ সভাপতি হিসেবে দাবি করেন তিনি।