বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যেখানে দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ময়দানে অনুপস্থিত। দেড় দশকের শাসনামলে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একচেটিয়া ভোটকেন্দ্র দখল ও প্রহসনের নির্বাচনের যে অভিযোগ ছিল, তার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ সময় পর এ দেশের মানুষ নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় দলটি এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
যদিও আগামীকালকের নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে, তবে কেন্দ্রীয়ভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনকে বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করলেও অতীতেও বিভিন্ন সরকার ভিন্ন ভিন্ন দলকে নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু কোনো দলকেই চূড়ান্তভাবে দমিয়ে রাখা যায়নি।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি (পিবিএসপি) ও পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (পিবিসিপি) নিষিদ্ধ করা হয়। দুটি বামপন্থি মাওবাদী সংগঠন এখনও নিষিদ্ধ। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসন চালু করেন শেখ মুজিব। গঠন করেন বাকশাল। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর বাকশালের কার্যক্রমসহ সব রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করা হয় সামরিক আইনে। রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মো. সায়েম ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। এই সময়ে বাকশাল থেকে বেরিয়ে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করেন জোহরা তাজউদ্দিনসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা। তবে নেতৃত্বের বিরোধে আওয়ামী লীগ (মালেক) এবং আওয়ামী লীগ (মিজান) দুই ধারায় বিভক্ত হয়। শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আসার পর আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভেঙে আবার বাকশাল গঠিত হয়। এর আগে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সময় জামায়াতসহ নিষিদ্ধ সব দল রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়। তবে সে বছরই ভোটের রাজনীতিতে ফিরতে পারেনি। জামায়াত নেতারা ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামের একটি দলের প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন।
২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের শাসনামলে হাইকোর্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেন। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবারও জামায়াত ও ছাত্রশিবিরিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গঠিত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত আগস্টে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এছাড়া ২০০৫ সালে দেশজুড়ে বোমা হামলার পর জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশকে (জেএমবি) সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করা হয়। ২০০৯ সালে হিযবুত তাহ্রীর নিষিদ্ধ হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শিক ভিত্তি থাকা কোনো দলকে প্রশাসনিক আদেশে চিরতরে মুছে ফেলা কঠিন। তবে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। দলটির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন। বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা নেতারা একের পর এক কঠোর কর্মসূচি বা হুকুম দিলেও দেশে থাকা তৃণমূল কর্মীরা সেই নির্দেশ পালন করতে গিয়ে জেল-জুলুম ও সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। গত ১৭ মাসে নেতারা ছাত্র আন্দোলনের আদলে শাটডাউন বা কমপ্লিট শাটডাউনের ডাক দিলেও জনগণের সাড়া মেলেনি, বরং সাধারণ কর্মীরাই রাজপথে বিপদে পড়েছেন।
১৯৯১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে প্রতিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একটি সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী ভোটব্যাংক লক্ষ করা গেছে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন বাদ দিলে অন্য সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সর্বনিম্ন ৩০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেয়েছে। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পেলেও তাদের ভোট ছিল ৩০.১ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে ৩৭.৪ শতাংশ ভোট পেয়ে তারা সরকার গঠন করে। ২০০১ সালের বিপর্যয়ের সময়ও দলটি ৪০.২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। আর ২০০৮ সালের ভূমিধস জয়ে তাদের ভোট ছিল ৪৮.০৪ শতাংশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৫ বছরের শাসন এবং শেষ তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের কারণে দলটির জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়লেও তাদের জনসমর্থন একেবারে শূন্য হয়ে যায়নি। আওয়ামী লীগের সমর্থক যদি সর্বনিম্ন স্তরেও নেমে থাকে, তবুও এই ৩০-৩৫ শতাংশ ভোটার নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। যদি এই ভোটারদের অর্ধেকও কাল ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন, তবে তারা যে প্রার্থীকে সমর্থন দেবেন, তারই জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে। এ কারণেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলগুলো আওয়ামী লীগের এই ‘অনাথ’ ভোটারদের কাছে টানতে নানা কৌশল গ্রহণ করেছে।
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে বিভিন্ন গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জরিপ প্রতিবেদনগুলো আওয়ামী ভোটারদের মনোভাবের একটি চিত্র তুলে ধরছে। বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পেপস)-এর তথ্যমতে, আওয়ামী লীগের আগের ভোটারদের ৩২.৯ শতাংশ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন। ১৩.২ শতাংশ ভোটার জামায়াতের দিকে ঝুঁকছেন, আর ৪১.৩ শতাংশ ভোটার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। অন্যদিকে, কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ পরিচালিত জরিপ বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, আওয়ামী ভোটারদের ৪৮.২ শতাংশ বিএনপিকে এবং ২৯.৯ শতাংশ জামায়াতকে ভোট দিতে চান। এই জরিপগুলোতে দেখা গেছে, যারা আগে সিদ্ধান্তহীন ছিলেন, তাদের একটি বড় অংশ জামায়াতের তুলনায় বিএনপিকেই বেশি নিরাপদ মনে করছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও উচ্চপদস্থ কর্মীরা মনে করছেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে তাদের জানমালের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং ভবিষ্যতে রাজনীতিতে ফেরার একটি ন্যূনতম পরিবেশ তারা পেতে পারেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বাংলানিউজকে বলেন, “ডাই হার্ট আওয়ামী লীগাররা হ্যারাসমেন্টের ভয়ে বের হবেন না। অন্যরা ভোট দিতে যাবেন ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশের জায়গা থেকে। এদের অনেককেই বিএনপি এবং জামায়াত দুই দলই শেল্টার দিচ্ছে। ফলে এটা বলা মুশকিল। একেক এলাকায় একেক রকম সিনারিও (দৃশ্য) দেখা যাবে।”
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, আওয়ামী লীগের ভোটারদের চেয়ে বেশি ইমপ্যাক্ট ফেলবে যারা এবার প্রথমবার ভোট দেবেন। যেহেতু এটা তাদের প্রথম ভোট, ফলে তারা সবাই ভোট দিতে যাবেন। যাদের বয়স ৪০-৩৫ এর নিচে, তাদের ভোটই এবার অনেককিছু নির্ধারণ করবে।
মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন বিএনপি-জামাত না, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের পটভূমি তৈরি করবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের পারফরমেন্স। তিনি বলেন, “তারা যদি ভালো না করতে পারে, তাহলে জনমতে এই ধারণা তৈরি হবে- আগেই ভালো ছিলাম। ওইভাবে তখন আওয়ামী লীগের কামব্যাক করার গ্রাউন্ড তৈরি হতে পারে।”
মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মন জিততে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ের এক নির্বাচনী সভায় সরাসরি বলেছেন, “নৌকা পালিয়েছে, কিন্তু আমরা আপনাদের পাশে আছি।” তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, যারা সরাসরি অপরাধ করেনি, তাদের কোনো শাস্তি হতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঘোষণা দিয়েছেন যে, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হয়রানি করা হবে না। এমনকি অনেক জায়গায় জামায়াত নেতারা আওয়ামী লীগের সাবেক এমপিদের ‘ভাই’ সম্বোধন করে তাদের ভোট প্রার্থনা করছেন। এই কৌশলটি মূলত একটি ‘সহমর্মিতার রাজনীতি’, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংককে নিজেদের বাক্সে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জামায়াত কৌশলগতভাবে আওয়ামী ভোটারদের মধ্যে একটি ভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছে যে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রতিহিংসার রাজনীতি আরও বাড়বে। অন্যদিকে বিএনপি দাবি করছে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। এই দুই শক্তির মাঝখানে পড়ে আওয়ামী ভোটাররা এখন নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
খুলনা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরের মতো আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এবারের নির্বাচনের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। গোপালগঞ্জের মতো দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতেও এবার নৌকার বদলে বিএনপি ও জামায়াতের পোস্টার দেখা যাচ্ছে। এই অঞ্চলগুলোতে সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটাররা একটি বড় ফ্যাক্টর। প্রথাগতভাবে এই ভোটগুলো আওয়ামী লীগের বাক্সে পড়তো। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় এই ভোটাররা কোন দিকে যাবেন? বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পাওয়ায় হিন্দু ভোটারদের একটি অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকছে। তবে জামায়াতও এবার কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। খুলনায় জামায়াত একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে এবং সারা দেশে অমুসলিমদের সভায় গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে তারা ক্ষমতায় গেলে শরিয়া আইন চাপিয়ে দেবে না। মাদারীপুরের শিবচরে তো আওয়ামী লীগের ২০ জন প্রভাবশালী নেতা প্রকাশ্যে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তারের পক্ষে মিছিলে অংশ নিয়েছেন। তারা মনে করছেন, স্থানীয়ভাবে যাদের দ্বারা বিপদ কম হবে, তাদের ভোট দেওয়াই এখন বুদ্ধিমানের কাজ।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বর্তমানে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে নিরাপদ জীবন যাপন করছেন এবং সেখান থেকেই নানা উসকানিমূলক বিবৃতি ও হুকুম জারি করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব নেতার নির্দেশগুলো দেশে অবস্থানরত সাধারণ নেতা-কর্মীদের জন্য উপকারের চেয়ে বিপদই বেশি ডেকে আনছে। গত বছর ছাত্র আন্দোলনের আদলে শাটডাউন ও কমপ্লিট শাটডাউনের ডাক দিয়েও জনগণের ন্যূনতম সাড়া পাওয়া যায়নি, বরং মিছিল করতে গিয়ে তৃণমূলের কর্মীরা জেল-জুলুম ও কঠোর আইনি ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন। গত ১৭ মাস ধরে দেশের ভেতরে থাকা কর্মীরা এক দুঃসহ বাস্তবের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছেন। অনেক নেতা-কর্মী একসময়ের রাজনৈতিক ‘শত্রুদের’ কৃপা নিয়ে বেঁচে আছেন কিংবা আত্মগোপনে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয়ভাবে ভোট বর্জনের ডাক দিলেও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাব বজায় রাখতে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের এই অংশগ্রহণ রাজনৈতিক বা আদর্শিক হওয়ার চেয়েও বেশি ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ পুনরায় রাজনীতিতে ফিরতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে এক ধরনের নমনীয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আওইয়ামী লীগের যারা অপরাধে জড়িত, তাদের বিচার হবে। তবে জনগণ স্বাগত জানালে, যে কেউ রাজনীতি করার সুযোগ পেতে পারে। এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, আওয়ামী লীগ হয়তো ভবিষ্যতে ভিন্ন কোনো নেতৃত্বে বা নতুন নামে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পেতে পারে, যদি তারা বিএনপির সাথে এক ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে জামায়াত ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের জন্য ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কারণ একাত্তর ও যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে দুই দলের বৈরিতা অত্যন্ত গভীর। এই ভীতি থেকেই আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ জামায়াতকে রুখতে এবং নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের বিমা হিসেবে বিএনপিকেই তুলনামূলক ‘ভালো বিকল্প’ হিসেবে দেখছে। আওয়ামী সমর্থকরা মনে করছেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে তারা অন্তত দেশে থাকার ও ব্যবসা-বাণিজ্য করার ন্যূনতম সুযোগ পাবে, যা জামায়াতের শাসনামলে অনিশ্চিত হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেছেন, “আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ বা দলের আনুগত্যে নয়, বরং ‘টিকে থাকার সমীকরণ’ বা ‘সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি’র ওপর ভিত্তি করে কাজ করবে। দলটির তৃণমূল কর্মী ও সমর্থকরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা এমন একজন প্রার্থীকে খুঁজছেন যিনি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এবং ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে তাদের ওপর চরম নির্যাতন চালাননি।”
তিনি আরও বলেন, “ব্যালটে নৌকা না থাকায় এই ভোটাররা এখন আর আবেগ দিয়ে ভোট দেবেন না, বরং তারা তাদের ব্যবসা, জানমাল এবং সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি যেখানে পাবেন, সেখানেই ভোট দেবেন। এটি এক ধরনের ‘কৌশলী ভোট’ বা ‘ট্যাকটিক্যাল ভোটিং’। প্রার্থীরা যদি আওয়ামী ভোটারদের আশ্বস্ত করতে পারেন যে জয়ী হওয়ার পর তাদের ওপর কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হবে না, তবে সেই ভোট অনায়াসেই তাদের বাক্সে চলে যাবে।”
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু জয়-পরাজয়ের নয়, বরং এটি আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংকের ভবিষ্যৎ ঠিকানা নির্ধারণের পরীক্ষাও। নৌকাবিহীন ব্যালটে এই ভোটাররা যেদিকে ঝুঁকে পড়বেন, সেদিকেই পাল্লা ভারী হবে। দীর্ঘদিনের প্রতিহিংসার রাজনীতি ভুলে তারা কি বিএনপির ‘নতুন দৃষ্টিভঙ্গি’কে গ্রহণ করবেন, নাকি জামায়াতের ‘ক্ষমার রাজনীতি’র ওপর আস্থা রাখবেন, তা আগামীকালের ফলাফলই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে সশরীরে না থাকলেও তাদের বিশাল কর্মী-সমর্থক গোষ্ঠীই হয়ে উঠতে পারে এই নির্বাচনের ‘কিংমেকার’। বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান বহুলাংশে নির্ভর করছে এই ভোটারদের কালকের নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর। জনমানুষের আশা, কোনো ভয়ভীতি বা জবরদস্তি নয়, বরং মানুষ যেন দীর্ঘ সময় পর স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নিতে পারে এবং একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা হয়।