Image description
ইসির বারবার সিদ্ধান্ত বদলে জটিলতা বাড়ছে

জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বারবার সিদ্ধান্ত বদল করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংসদীয় আসনের সীমানা নিয়ে আইনি লড়াই ও প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও একেক সময়ে একেক সিদ্ধান্ত দিয়েছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের আনঅফিশিয়াল সিদ্ধান্ত দিয়ে সেটি আবার পরিবর্তন করার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে।

সীমানা নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলের কারণে আইনি জটিলতায় পড়ে পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের নির্বাচন ‘আপাতত’ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। এ দুটি আসনের সীমানা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করেও তা প্রত্যাহার করে নেয় কমিশন। এছাড়া ইসির আনঅফিশিয়াল সিদ্ধান্তে এমপিওভুক্ত কয়েকজন শিক্ষকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। ওইসব শিক্ষক আপিল করলে তাদের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। ইতোমধ্যে এ নির্দেশনার কারণে কয়েক প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পাবনা-১ ও ২ আসনের নির্বাচন স্থগিতের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বৃহস্পতিবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, ওই দুই আসনের নির্বাচন পুরোপুরি স্থগিত করা হয়েছে, তা বলা যাবে না। আমরা আপাতত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সুপ্রিমকোর্টের পরবর্তী আদেশ না আসা পর্যন্ত এ দুটি আসনের নির্বাচন স্থগিত থাকবে।

জানতে চাইলে পাবনা-১ ও ২ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক শাহেদ মোস্তফা বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন স্থগিত সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের কোনো নির্দেশনা এখনো পাইনি।

জানা যায়, এর আগেও বেশকিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত বদল করেছে কমিশন। ইসির একাধিক পরিপত্র ও চিঠিতে সংশোধনী আনা হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভোটগ্রহণে নিয়োগ দেওয়া হবে না ঘোষণা দেওয়ার পর সেই সিদ্ধান্তও বদল করেছে। এভাবে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করায় সমস্যায় পড়েছেন রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রিটার্নিং কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, একেক সময়ে একেক ধরনের নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত আসায় তারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সেটিতেও পরিবর্তন আনে ইসি, যা সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয় কখনোই হয়নি। ওই তফসিলে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সাতদিন সময় দেওয়া হয়। যদিও নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালায় ওই সময় ৫ দিন উল্লেখ রয়েছে। এক্ষেত্রে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা অনুসরণ করেনি ইসি। জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের ভুল আছে। কিছু ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে স্পষ্টীকরণ করতে গিয়ে সংশোধনী দিতে হয়েছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার প্রজ্ঞাপনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও আপিলের তারিখ নির্ধারণের বিষয়টি ভুল ছিল। পরবর্তী সময়ে আমরা সংশোধন করেছি। আবার মহান বিজয় দিবস, ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের মতো কিছু বিষয়ে স্পষ্টীকরণ করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো কর্মযজ্ঞ আয়োজনের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আব্দুল আলীম। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফাইল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি বা দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। তারা সঠিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ফাইল উপস্থাপন করতে পারছেন কি না, তা দেখার বিষয়। অপরদিকে নির্বাচন কমিশন ওইসব ফাইল সঠিকভাবে মনিটরিং করতে পারা এবং সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত দিতে পারছে কি না, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন ভালো বা খারাপ যাই হোক না কেন, সব দায় নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তাবে।

স্থগিত হচ্ছে দুটি আসনের নির্বাচন : সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আপিল বিভাগের একটি রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে পাবনা-১ ও ২ আসনের নির্বাচন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ইসি। গত ৫ জানুয়ারি আপিল বিভাগের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ওই দুটি আসনে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন আপিল আবেদন করলেও হঠাৎ তা প্রত্যাহার করে নেয়। এবং হাইকোর্টের রায়ের আলোকে ২৪ ডিসেম্বর পাবনা-১ ও ২ এবং ফরিদপুর-২ আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে সাথিয়া উপজেলার পাশাপাশি বেড়া উপজেলার একটি পৌরসভা ও চারটি ইউনিয়ন নিয়ে পাবনা-১ আসন গঠন করা হয়। একইভাবে পাবনা-২ আসনে সুজানগর উপজেলা ও বেড়া উপজেলার ওই পৌরসভা ও চারটি ইউনিয়ন বাদ দেওয়া হয়।

ইসির ২৪ ডিসেম্বরের সংশোধিত বিজ্ঞপ্তির অংশটুকু স্থগিত করেন আপিল বিভাগ। এই স্থগিতাদেশ থাকবে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) দায়ের করা পর্যন্ত বলে রায় দেন। এর ফলে নির্বাচন কমিশন ওই দুটি আসনের সীমানায় যে পরিবর্তন এনেছিল, তা বহাল হয়। ওই রায়ের অনুলিপি নির্বাচন কমিশনে পৌঁছানোর পরিপ্রেক্ষিতে এ দুটি আসনের নির্বাচন আপাতত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাগেরহাট ও গাজীপুরের সীমানা নিয়ে মামলায় ইসি আপিল নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় শেষ হওয়ার আগে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী পাবনা-১ ও ২ আসনের সীমানায় ফের পরিবর্তন আনে। এক্ষেত্রে আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত কমিশন অপেক্ষা করেনি।

আনঅফিশিয়াল সিদ্ধান্তে প্রার্থিতা বাতিল : জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হয় ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অনলাইন মিটিংয়ের একপর্যায়ে এ নির্বাচনে যেসব এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক প্রার্থী হয়েছেন, তাদের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বাতিল করার নির্দেশনা দেয় ইসি। এর একদিন পরই শুক্রবার আরেক নির্দেশনায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতা বাতিল না করার কথা বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে বেশকিছু শিক্ষকের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। আবার কিছু শিক্ষকের প্রার্থিতা বাতিলের পর তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এ কারণে কতজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। এই পরিস্থিতিতে আপিল শুনানিতে বাতিল হওয়া শিক্ষকদের প্রার্থিতা ফেরত দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। যদিও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, তারা কর্মকর্তাদের মৌখিক নির্দেশনা দেবেন না।

জানতে চাইলে দুইজন নির্বাচন কমিশনার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দুজন নির্বাচন কমিশনার যুগান্তরকে বলেন, মাঠ পর্যায়ে ওই সিদ্ধান্ত দেওয়া ভুল ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রথমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলার রেফারেন্স ও আইন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে যোগ্য। এ কারণে তারা আপিল করলে নির্বাচন কমিশন প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেবে বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১০ জানুয়ারি থেকে আপিল আবেদনের ওপর শুনানি করবে ইসি। জানা যায়, আপিলে ১ শতাংশ ভোটার স্বাক্ষর জটিলতার কারণে যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তা উদারভাবে বিবেচনা করবে কমিশন। তবে দ্বৈত নাগরিকদের বিষয়টি কঠোরভাবে দেখা হবে।