Image description
  • পোস্টাল ব্যালটের মক ট্রায়াল, আপিল শুনানি শুরু, প্রতীক বরাদ্দ ও পুনঃভোট নীতিমালা স্পষ্ট
  •  প্রার্থিতা ফেরাতে আপিলের শেষ দিনে উপচে পড়া ভিড়

একাধিক নতুন ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার প্রথম বড় পরিসরের মক ট্রায়াল, প্রার্থিতা সংক্রান্ত আপিল শুনানি, প্রতীক বরাদ্দের বিকেন্দ্রীকরণ এবং ব্যালট বক্স নষ্ট বা হারালে পুনঃভোটের বাধ্যতামূলক নীতিমালা- সব মিলিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন কাঠামো দাঁড়াচ্ছে।

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরে আস্থা সঙ্কট, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভোটব্যবস্থার ঝুঁকি- এই তিনটি চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই কমিশন আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে দায়েরকৃত সংশ্লিষ্টদের আপিলের শুনানি আজ থেকে শুরু হচ্ছে ইসিতেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে পুরো কমিশন এই শুনানি গ্রহণ করবেন। প্রতিদিন ৭০টি করে আপিলের শুনানি হবে বলে ইসি থেকে জানা গেছে। শুনানি কক্ষে আপিলকারীসহ তিনজনের বেশি প্রবেশ করা যাবে না। গতকাল আপিলের শেষ দিনে ছিল উপচে পড়া ভিড়। বিকেল ৫টার মধ্যে যারা বুথে লাইনে ছিলেন তাদের আপিল গ্রহণ করা হয়েছে। পাঁচ দিনে মোট আপিল হয়েছে ৬৪০ জনের বলে ইসি থেকে জানা গেছে।

ইসির তথ্য বলছে, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন শুরু হয়েছে সোমবার থেকে। প্রথম দিন ৪২টি, দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার ১২২টি, তৃতীয় দিন বুধবার ১৩১টি, বৃহস্পতিবার চতুর্থ দিনে ১৭৪টি এবং শেষদিনে অন্তত ১৭১টি আপিল জমা পড়েছে। ডজনখানেক আবেদন হয়েছে বৈধ প্রার্থীর মনোনয়নত্র বাতিল চেয়ে।

এরপর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। সেদিনই জানা যাবে এবার ভোটে কতজন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকছেন। রিটার্নিং অফিসার চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। আর ভোট হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। সে দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।

৩ জনের বেশি প্রবেশ নয় : এদিকে, আপিল শুনানিকালে আপিল শুনানি কক্ষে আপিলকারীসহ সর্বেচ্চ মোট তিনজনের অতিরিক্ত লোক প্রবেশ করা যাবে না বলে গতকাল নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (আইন-২) মো: আরিফুর রহমান স্বাক্ষরিত এক ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসি বলছে, উপর্যুক্ত বিষয়ের প্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচন কমিশনে দায়েরকৃত আপিলগুলোর ওপর ১০ হতে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৯ দিন আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ওই আপিল শুনানি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে শুনানি কক্ষে প্রতিটি আপিলের প্রসঙ্গে আপিলকারীসহ সর্বোচ্চ তিনজনের অতিরিক্ত লোকজন শুনানি কক্ষে প্রবেশ না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব আপিলকারীকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

উল্লেখ্য, গত ৪ জানুয়ারি বাছাইয়ের শেষ দিনে তিন শ’টি নির্বাচনী এলাকায় রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা মোট দুই হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র যাচাই করেন। এর মধ্যে এক হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।

পোস্টাল ব্যালটের মক ট্রায়াল আজ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একযোগে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এবার পোস্টাল ব্যালটের বড় পরীক্ষা আজ। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে আজ সকাল থেকে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার মক ট্রায়াল শুরু হয়েছে। এই ট্রায়ালের মাধ্যমে ব্যালট গ্রহণ, যাচাই, গণনা, নিরাপত্তা যাচাই ও জনবল ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ইসি সূত্র জানায়, বিশ্বের ১২১টি দেশে বসবাসরত প্রবাসী ভোটারদের কাছে সাত লাখ ৬৭ হাজার ২৮টি পোস্টাল ব্যালট ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। মোট নিবন্ধিত পোস্টাল ভোটার সংখ্যা ১৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। দেশের অভ্যন্তরে ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোট’ ক্যাটাগরিতে নিবন্ধিত ভোটার রয়েছে সাত লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন।

প্রতিটি সংসদীয় আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতরে একটি করে পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহ ও গণনা কেন্দ্র থাকবে। মক ট্রায়ালের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে, একটি কেন্দ্রে কতজন কর্মকর্তা প্রয়োজন হবে, কত সময় লাগবে এবং কিভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।

তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। ‘ওসিভি-এনআইডি’ প্রকল্পের টিম লিডার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সেলিম আহমেদ খান জানান, প্রায় তিন হাজারের বেশি প্রবাসী ভোটার সঠিক ঠিকানা না দেয়ায় ব্যালট পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এটি ভবিষ্যতে পোস্টাল ভোট ব্যবস্থার অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরো সতর্ক করেন- পোস্টাল ব্যালটের গোপনীয়তা রক্ষা করা ভোটারের ব্যক্তিগত দায়িত্ব। গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হলে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লক করার বিধান রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রথমবার বড় আকারে পোস্টাল ব্যালট চালু হওয়ায় লজিস্টিক, ডাক বিভাগের সক্ষমতা, সময়মতো ব্যালট ফেরত আসা এবং নিরাপত্তা- সবই পরীক্ষার মুখে পড়বে।

প্রার্থিতা ফেরত বিষয়ে আপিল শুনানি শুরু আজ

রিটার্নিং কর্মকর্তার দেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রার্থীদের করা আপিলের শুনানি আজ থেকে নির্বাচন কমিশনে শুরু হয়েছে। ইসি সূত্র অনুযায়ী- প্রতিদিন গড়ে ৬০-৭০টি আপিল শুনানি হবে। একাধিক বেঞ্চে একযোগে শুনানি চলছে। চার দিনের মধ্যেই সব আপিল নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই ধাপে মূলত মনোনয়ন বাতিল, ঋণখেলাপি, আয়কর জটিলতা, বয়স ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আপিল শুনানির স্বচ্ছতা নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতার একটি বড় পরীক্ষাক্ষেত্র। অতীতে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠলেও এবার কমিশন দ্রুত ও প্রকাশ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে চাচ্ছে।

ব্যালট বক্স নষ্ট বা হারালে ভোট বন্ধ, হবে পুনঃভোট

ইসি ৮ জানুয়ারি জারি করা এক পরিপত্রে ব্যালট বক্স সংক্রান্ত কঠোর নীতিমালা স্পষ্ট করেছে। পরিপত্র অনুযায়ী- কোনো কেন্দ্রে ব্যালটবক্স নষ্ট, হারানো, জোরপূর্বক অপসারণ বা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ভোটগ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করতে হবে। ওই কেন্দ্রের ভোট গণনায় অন্তর্ভুক্ত হবে না। কমিশনের অনুমোদন নিয়ে নতুন তারিখে পুনঃভোট অনুষ্ঠিত হবে। যদি কোনো কেন্দ্রের ভোট বাদ পড়ায় পুরো আসনের ফল নির্ধারণ সম্ভব না হয়, তাহলে কমিশন পুরো কেন্দ্র বা অংশবিশেষে পুনঃভোটের নির্দেশ দিতে পারবে।

এ ছাড়া বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি, দুর্যোগ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে কমিশন যেকোনো পর্যায়ে পুরো নির্বাচন কার্যক্রম স্থগিত করতে পারবে। ভোটগ্রহণের সময়সূচি : সকাল ৭:৩০টা থেকে বিকাল ৪:৩০টা পর্যন্ত বিরতিহীন ভোটগ্রহণ।

পরিপত্রে আরো বলা হয়েছে- গণভোট উপলক্ষে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আলাদা ব্যানার টানাতে হবে। সেখানে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। ভোট শেষে প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের ভোট গণনার কপি ডাকযোগে সরাসরি ইসিতে পাঠাতে হবে। পোস্ট অফিসগুলোকে ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

এবারের প্রস্তুতি থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট- প্রযুক্তি ও লজিস্টিক নির্ভরতা বাড়ছে, পোস্টাল ব্যালট একটি বড় প্রশাসনিক পরীক্ষা। সময়মতো ব্যালট পৌঁছানো ও ফেরত আনা যদি ব্যাহত হয়, তাহলে ভোটের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি ব্যালট বক্স নষ্ট হলে সরাসরি পুনঃভোটের সিদ্ধান্ত কমিশনের আগের তুলনায় আরো কঠোর অবস্থান নির্দেশ করে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রতীক বরাদ্দ বিভাগীয় কমিশনারকে দেয়ায় কেন্দ্রীয় চাপ কমলেও স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক আস্থা সঙ্কট আপিল শুনানি ও পোস্টাল ভোট-দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়; এটি বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক আস্থার বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।