আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মিত্রদের জন্য আসন ছেড়ে দিলেও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি বিএনপি। শরিকদের জন্য ছাড়া ১৪টি আসনের মধ্যে মাত্র দুটি বাদে বাকি ১২টিতেই দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। দলের পক্ষ থেকে বারবার সাংগঠনিক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও বিদ্রোহীরা তা তোয়াক্কা করছেন না। ফলে প্রচারণা শুরুর আগেই নির্বাচনি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন মিত্ররা।
শরিক দলের নেতারা বলছেন, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি তাঁদের জন্য বিব্রতকর ও অস্তিত্বের সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে বিএনপি দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে আসন সমঝোতার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। এতে শরিকদের সঙ্গে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আস্থার সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনি মাঠে উভয় পক্ষকেই রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের অধিকাংশই তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে সুপরিচিত। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাজনীতি করছেন। অন্যদিকে, আসন সমঝোতায় থাকা প্রার্থীরা জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে নতুন মুখ। এছাড়া নির্বাচন সামনে রেখে অন্য দলের বেশ কয়েকজন নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না। ফলে একই ভোটব্যাংকের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় প্রতিপক্ষ জোট সুবিধা পেয়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন নিজ দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি ঝিনাইদহ-৪ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজ।
রাশেদ খাঁন স্ট্রিমকে বলেন, ‘এখানে যারা বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, তাদের মধ্যে অভিমান থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যক্তির ঊর্ধ্বে উঠে দলের পক্ষে কাজ করাই বিএনপির আদর্শ। আশা করি, শেষ পর্যন্ত এখানে কেউ দলের বিদ্রোহী হয়ে থাকবেন না।’
রাজনীতি বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আনিসুর রহমান মনে করেন, বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি থাকলে আসন সমঝোতা কোনো কাজে আসবে না। তাঁর মতে, তৃণমূলের কর্মীরা সাধারণত স্থানীয় ইউনিটের শীর্ষ নেতাদের অনুসরণ করেন। ধানের শীষ যদি মিত্র বা নতুন দলের নেতার হাতে থাকে, তবে কর্মীরা বিদ্রোহী প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা বেশি।
ভিন্ন চিত্র সেলিম ও ববির আসনে
শাহাদাত হোসেন সেলিম নিজ দল ‘বাংলাদেশ এলডিপি’ বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এই আসনে বিএনপির অন্য প্রার্থীরা সেলিমের সমর্থনে সরে দাঁড়ানোয় তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। একই চিত্র ঢাকা-১৩ আসনে। এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। এখানেও বিএনপির কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই।
শাহাদাত সেলিম বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে আমি তৃণমূল বিএনপির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এখানে একাধিক প্রার্থী থাকলেও সবাই আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছে। তারা আমার নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। আশা করছি ধানের শীষের বড় জয় হবে।’
ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘ঢাকা-১৩ আসন থেকে আমার নির্বাচন নিয়ে আলোচনার শুরু থেকেই স্থানীয় নেতাদের সহযোগিতা পাচ্ছি। কয়েকজন নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও আমি চূড়ান্ত হওয়ার পর তারা সবাই পাশে দাঁড়িয়েছেন। ফলে কোনো বড় প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়নি।’
আন্তরিক বিএনপি তবুও অনিশ্চয়তায় মিত্ররা
আসন সমঝোতায় থাকা শীর্ষ নেতারা সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাঁরা জানান, বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে তারেক রহমানের মনোভাব ইতিবাচক। তিনি দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
গণতন্ত্র মঞ্চের এক নেতা বলেন, তারেক রহমান আগামী সপ্তাহে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে বসবেন এবং একটি সমাধান বের করার আশ্বাস দিয়েছেন। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা-১২ আসনের কোদাল মার্কা প্রার্থী সাইফুল হক বলেন, ‘বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি আমাদের জন্য বিব্রতকর ও অস্তিত্বের হুমকিস্বরূপ। আমি আশা করি অচিরেই অনেকে সরে দাঁড়াবেন। বিএনপি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে।’
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের প্রর্থী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘আমরা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। জাতীয় পুনর্গঠনের এই সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য জরুরি।’
বেকায়দায় জমিয়ত
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সঙ্গে চারটি আসনে সমঝোতা করেছে বিএনপি। তাঁরা খেজুর গাছ প্রতীকে লড়বেন। তবে চারটি আসনেই জমিয়তের প্রার্থীরা বিএনপির বিদ্রোহীদের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।
নীলফামারী-১ আসনে জমিয়ত প্রার্থী মো. মঞ্জুরুল ইসলামের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন রফিকুল ইসলাম। তিনি খালেদা জিয়ার ভাগনে শাহরিন ইসলাম তুহিনের বাবা। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জমিয়তের মনির হোসেন কাসেমীর বিপরীতে লড়ছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম ও সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন।
সিলেট-৫ আসনে জমিয়ত সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের বিপরীতে লড়ছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা মামুনুর রশিদ। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জমিয়ত নেতা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের বিপরীতে লড়ছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানা।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচন করছি। ভোটাররা আমার সঙ্গেই আছেন।’ জমিয়ত মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থীরা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বিএনপি বিদ্রোহ প্রশমনে কঠোর অবস্থানের আশ্বাস দিয়েছে।’
কঠোর অবস্থানে বিএনপি
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় বিএনপি গত ৩০ ডিসেম্বর রুমিন ফারহানা ও সাইফুল আলম নিরবসহ ৯ জনকে বহিষ্কার করেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বৃহত্তর স্বার্থে অনেক যোগ্য প্রার্থীকেও বঞ্চিত করতে হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছি, কিছু ক্ষেত্রে বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছি। দ্রুতই মীমাংসা হবে।’
এনপিপি চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন। তিনি জানান, বিদ্রোহী প্রার্থী সরে না দাঁড়ালে এবং যারা তাঁর পক্ষে কাজ করবেন, তাদের সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি।