আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ‘নাশকতাকারী’ হিসেবে উপস্থাপন, সরকার পতনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এবং বিরোধী দলগুলোর সম্পৃক্ততার দাবি নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালবেলা। কয়েকটি প্রতিবেদনে ছিল অজ্ঞাত সূত্রের বরাত, কিন্তু অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের প্রতিফলন ছিল অস্পষ্ট।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দৈনিক কালবেলার ভূমিকা ‘স্মরণীয় হয়ে থাকবে’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। পত্রিকাটির চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দেওয়া তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত কালবেলার সংবাদগুলো মিলিয়ে দেখলে সামনে আসে ভিন্ন এক চিত্র। আন্দোলন যখন প্রাণহানি, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের অভিযোগে উত্তাল, তখন পত্রিকাটির প্রতিবেদনে আন্দোলনকারীদের নাশকতাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা, সরকার পতনের পরিকল্পনার অভিযোগ এবং বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততাকে প্রধান করে তুলে ধরা হয়েছিল।
আন্দোলন সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোর শিরোনাম, বক্তব্যের উৎস ও তথ্য উপস্থাপনের ধরন পর্যালোচনায় দেখা যায়, আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, পরিকল্পিত নাশকতা ও সরকার পতনের উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ কালবেলার সংবাদে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এসব অভিযোগ এসেছে অজ্ঞাত সূত্র, গোয়েন্দা তথ্য কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যের ভিত্তিতে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই, অভিযুক্তদের বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে বহু প্রতিবেদনে ঘাটতি লক্ষ করা যায়। মোটাদাগে পত্রিকাটির অবস্থান ছিলো সরাসরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে।
আন্দোলনে ‘অছাত্র’ ও বিরোধী দলের সম্পৃক্ততার বয়ান
২০ জুলাই দৈনিক কালবেলা ‘রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় সহিংসতায় অছাত্ররা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। উপশিরোনাম ছিল, ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগানে মিছিল। প্রতিবেদনে জুমার নামাজের পর মুসল্লিদের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো এক যুবককে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর বরাতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। একইভাবে, প্রগতি সরণিতে ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগানে মিছিল করা একটি দলের অগ্রভাগে থাকা একজনকে স্থানীয় এক ব্যক্তির বরাতে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তবে এসব পরিচয়ের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়নি।
পলাতক শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিরোধী আন্দোলনকে রাজনৈতিক দাবি ও জনঅসন্তোষের জায়গা থেকে সরিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ কিংবা বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বারবার আলোচনায় এসেছে। কালবেলার ওই প্রতিবেদনের ভাষ্য ও উপস্থাপনাও সেই বয়ানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ।
১৬ থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের গুলিতে অন্তত ১২২ জন নিহত হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাণহানির এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ২১ জুলাই দৈনিক কালবেলার প্রথম পাতার নিচের অংশে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘নজিরবিহীন হামলা রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অজানা’। প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও আন্দোলন ঘিরে প্রাণহানির ব্যাপকতা একইভাবে গুরুত্ব পায়নি। এর আগের দিন, ২০ জুলাই, দেশজুড়ে প্রায় ২১ জন নিহত হওয়ার খবরের বিপরীতে কালবেলার প্রথম পাতায় দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর খবরটি ফলাও করে প্রকাশ করা হয়। ফলে একদিকে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ভয়াবহতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি ও পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে পত্রিকাটির সংবাদ নির্বাচনের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
আন্দলনকারীদের ‘নাশকতাকারী’ হিসেবে উপস্থাপন
২৩ জুলাই কালবেলার দ্বিতীয় লিড শিরোনাম ছিল ‘আসামি কয়েক হাজার, নাশকতাকারীদের ধরতে চিরুনি অভিযান’। প্রতিবেদনে আন্দোলন ঘিরে গ্রেপ্তার ও মামলার তথ্যের সঙ্গে ‘নাশকতাকারী’ পরিচয়টি যুক্ত করে উপস্থাপন করা হয়। এই শিরোনামের মাধ্যমে গ্রেফতার হওয়া অজস্র শিক্ষার্থীকে নাশকতাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে পত্রিকাটি।
একই দিন ‘বিএনপি জামায়াত নেতাদের ‘পরিকল্পনায়’ বিটিভিতে হামলা’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে পত্রিকাটি। এর সূত্র হিসেবে মামলার এজাহার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু শিরোনামে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের পরিকল্পনার বিষয়টি এমনভাবে তুলে ধরা হয়, যাতে পাঠকের কাছে অভিযোগটি প্রতিষ্ঠিত তথ্য বলে প্রতীয়মান হতে পারে। এজাহারে থাকা অভিযোগের ভিত্তি, তার স্বতন্ত্র যাচাই এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য প্রতিবেদনে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, তা স্পষ্ট ছিল না।
এদিন নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের সময় এক নারী সাংবাদিকের শ্লীলতাহানির ঘটনা নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালবেলা। শিরোনাম ছিল ‘নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনে শ্লীলতাহানির শিকার নারী সাংবাদিক’। প্রতিবেদনে ঘটনার জন্য সরাসরি বিএনপি নেতাদের দায়ী করা হয়।
আন্দোলনের পেছনে সরকার পতনের পরিকল্পনার অভিযোগ
২৪ জুলাই দৈনিক কালবেলার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘চোরাগোপ্তা হামলার শঙ্কা, পুলিশ সদস্যদের প্রতি সতর্কবার্তা’। একই দিনে প্রকাশিত একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, কিছু ছাত্রসংগঠন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সরকার পতন। অর্থাৎ, আন্দোলনকে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের বদলে সরকার উৎখাতের পরিকল্পিত তৎপরতা হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা এদিনের সংবাদেও স্পষ্ট ছিল।
ওই দিনের আরেকটি প্রতিবেদনে র্যাবের অভিযোগের বরাতে গণঅধিকার পরিষদের যুগ্ম সদস্যসচিব মো. তারেক রহমানসহ চারজনকে বিটিভি ভবন, মেট্রো স্টেশনসহ সরকারি স্থাপনায় হামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তিন স্তরের ক্যাডার নিয়োগ করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও নাশকতা চালানো হয়েছিল। সাতক্ষীরা, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁদের ঢাকায় আনা হয় বলেও উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে আন্দোলনে অছাত্রদের অনুপ্রবেশ এবং এক স্তরের কর্মীরা গ্রেপ্তার হলে অন্য স্তরের কর্মীদের মাঠে নামানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়। তবে এসব গুরুতর অভিযোগের পক্ষে কোন শক্ত প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।
একই দিনে ‘মেট্রো স্টেশনজুড়ে তাণ্ডবের নমুনা’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালবেলা। রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও আন্দোলন ঘিরে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির বিষয়টি সংবাদ উপস্থাপনায় তুলনামূলকভাবে আড়ালে ছিল। এদিন পত্রিকাটির আরেকটি শিরোনাম ছিল, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রাজধানীবাসী’। দেশজুড়ে যখন নিহতদের পরিবার শোকাহত, আহতদের চিকিৎসা চলছিল এবং আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল, তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়।
‘উগ্রবাদী’, ‘ভাড়া করা লোক’ এবং অজ্ঞাত সূত্রের অভিযোগ
২৫ জুলাই কালবেলার দ্বিতীয় প্রধান প্রতিবেদন ছিল ‘নাশকতায় উগ্রবাদীরা’। এতে অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়, বিএনপি ও জামায়াতের বাইরেও উগ্রপন্থী এবং আগে জঙ্গিবাদের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা সহিংসতায় জড়িত ছিলেন। তবে প্রতিবেদনে তাঁদের পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতার পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।
একই দিন ‘নাশকতার জন্য ভাড়া করা হয় বস্তিবাসী’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। উপশিরোনামে দাবি করা হয়, সহিংসতার জন্য বস্তিবাসী, টোকাই ও বিহারীদের ভাড়া করেছিলেন বিএনপি ও জামায়াত নেতারা। প্রতিবেদনে অর্থের বিনিময়ে লোক নিয়োগের অভিযোগ বিএনপি জামায়াতের সামনে আনা হলেও কারা অর্থ দিয়েছিলেন, কাদের নিয়োগ করা হয়েছিল এবং অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ ছিল, তা স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়নি।
প্রাণহানির খবরকে ‘গুজব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা
২৬ জুলাই কালবেলার প্রতিবেদক রাজসান জনি ‘খাদেমদের জিম্মি করে মসজিদের মাইকে নাশকতার ঘোষণা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এতে অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়, মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছিল। একই দিন ‘গুজব রুখতে হবে’ শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে পত্রিকাটি। এতে দেশজুড়ে সহিংসতার সময় সরকার শত শত মানুষ হত্যা করেছে বলে গুজব ছড়ানোর কথা বলা হয়। অথচ ওই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রাণহানির খবর প্রকাশিত হচ্ছিল। ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসাবে দেশজুড়ে নিহতের সংখ্যা ১৬২ জনে পৌঁছেছিল। এদিন প্রকাশিত ‘যাত্রাবাড়ীর সহিংসতায় সেই নয়ন গুলিবিদ্ধ’ শিরোনামের প্রতিবেদনেও অজ্ঞাত গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে নয়নকে ঢাকায় বিএনপি ও জামায়াতের নাশকতার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এমন গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে সূত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা, অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরবরাহ করা তথ্যে এসব বিষয়ে বিস্তারিত পাওয়া যায়নি।
সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে সরকার উৎখাতের অভিযোগ
২৭ জুলাই ‘তারেক-মাসুদের নেতৃত্বে যাত্রাবাড়ীতে নাশকতা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালবেলা। এতে ডিবির সূত্রের বরাতে ডেমরা থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রানাকে পুলিশ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়। একই দিন ‘নাহিদ-সারজিসের সঙ্গে সরকার উৎখাতের আলোচনা নুরের!’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
দুটি প্রতিবেদনেই রাজনৈতিক নেতা ও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। তবে অভিযোগের সূত্র হিসাবে পুলিশ ও নামহীন গোয়েন্দা তথ্য কে দেখানো হয়। ২৮ জুলাই পত্রিকাটিতে ‘টার্গেট ছিল ঢাকা দখল’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের চার দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় প্রায় এক লাখ নতুন সিমের উপস্থিতি বেড়েছিল। পুলিশ ও তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার ১০ থেকে ১৫টি সহিংসতাপ্রবণ এলাকায় বাইরে থেকে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ নতুন সিম প্রবেশ করে। প্রতিবেদনে বিএনপি, ছাত্রদল, জামায়াত ও শিবিরের নেতা কর্মীদের ঢাকায় এসে নাশকতায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ তুলে সহিংসতার উদ্দেশ্য হিসেবে ঢাকা দখলের কথা বলা হয়। তবে সিমের উপস্থিতি ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে এসব অভিযোগ করা হলেও সেগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করার মতো প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি। একই দিন পত্রিকাটিতে ‘তিন সমন্বয়কের টার্গেট ছিল সরকার পতন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে দীর্ঘায়িত করে সরকার পতনের লক্ষ্যে সহিংসতার দিকে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়। অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে গোপন বৈঠক এবং আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাবের দাবি তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভক্তি তুলে ধরে একাংশকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে এবং অভিযুক্ত তিন সমন্বয়ককে সরকার পতনের পরিকল্পনাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদনে যেসব সূত্রের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর পরিচয় ও দাবির স্বতন্ত্র প্রমাণ স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
২৯ জুলাই পত্রিকাটিতে ‘নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তারে এলাকাভিত্তিক অভিযান চলছে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আন্দোলনকারীদের নাশকতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
কালবেলার জুলাইয়ের সংবাদকভারেজে যে প্রশ্নগুলো সামনে আসে
জুলাইয়ের সংবাদ কাভারেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্দোলনকারীদের ওপর দমনপীড়ন, প্রাণহানি ও শিক্ষার্থীদের দাবির চেয়ে কালবেলার একাধিক প্রতিবেদনে নাশকতা, রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি এবং সরকার পতনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। আন্দোলনকারীদের পরিচয় ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও যাচাইহীন বা অজ্ঞাত সূত্রনির্ভর বক্তব্য সংবাদে স্থান পেয়েছে। এসব প্রতিবেদন জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে কালবেলার অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। বরং পত্রিকাটির সংবাদ নির্বাচন ও উপস্থাপনায় এমন একটি বয়ান উঠে আসে, যা আন্দোলনের দাবির চেয়ে আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দিকেই বেশি মনোযোগী ছিল।