Image description

কানাডায় টরন্টোস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে দেওয়া ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের দায় স্বীকার করে কানাডা বিএনপি নেতাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ শাহ আলম খোকন। ভবিষ্যতে আর এমন ঘটনা ঘটবে না বলেও তিনি সবাইকে আশ্বস্থ করেন।

বৈঠকে কনস্যুলেটে সেবা গ্রহিতাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, ক্রেডিট কার্ডের ফি’র নামে নির্ধারিত কনস্যুলার ফির চেয়ে সর্বক্ষেত্রে অবৈধভাবে অধিক ফি গ্রহণ, কেনাকাটাসহ আর্থিক বিভিন্ন খাতে অনিয়ম, স্থানীয় নিয়োগ ও কল সেন্টারের নামে সাউথ আফ্রিকা ও বাংলাদেশে নিজ স্বজনদের নিয়োগ দিয়ে দুর্নীতি, কনস্যুলেটে একের পর এক অবৈধভাবে নিয়োগ, জাতীয় অনুষ্ঠান সমুহে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও জুলাই শহীদদের জন্য দোয়া না করা, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক ছবিসম্বলিত সকল ফেস্টুন ফেলে দেয়া, আওয়ামী দোসরসহ বিভিন্ন বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ, সাংবাদিকদের কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না জানানো, সরকার বরাদ্দ দেয়ার পরও স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান অতীতের মতো বড় পরিসরে না করে ছোট পরিসরে ফ্রি হলে আয়োজন, নানা কৌশলে বিএনপি নেতাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টিসহ গুরুতর একাধিক অভিযোগ করেন বিএনপি নেতারা।

গত ৫ আগস্ট কনস্যুলেটে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ফ্যাসিন্ট বিরোধী আন্দোলেনের সংগঠক ও বাংলাদেশি মিডিয়াকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে শুধু কানাডা বিএনপি নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণের পর টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটি ও বিএনপি নেতা-কর্মিদের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।  এ নিয়ে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও প্রবাসীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার মুখেই শেষ পর্যন্ত ২৬ আগস্ট বুধবার দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন শাহ আলম খোকন। 

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তার অশোভন বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশের পর কনস্যাল জেনারেল বিএনপি নেতাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার জন্য সভাপতি আহাদ খন্দকারকে অনুরোধ জানাতে থাকেন। তার অনুরোধের প্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত আহাদ খন্দকার দলীয় নেতাদের নিয়ে বসতে সম্মতি দেন। বুধবার বিকাল ৬টা থেকে রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত কনস্যুলেটে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।  

৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে কনসাল জেনারেলের বিতর্কিত ভূমিকা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণেই পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে কনসাল জেনারেল সঞ্চালককে স্পষ্ট নির্দেশ দেন, আমন্ত্রিত বিএনপি নেতাদের দলীয় পদ-পদবী উচ্চারণ না করে কেবল 'বাংলাদেশি কানাডিয়ান' বলে সম্বোধনের জন্য। কেবল তাই নয়, বক্তব্যের সময় তিনি সরাসরি উপস্থিত নেতাদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তার সঙ্গে আমি নিউইয়র্কে রুম শেয়ার করেছি— বুঝেন সম্পর্কের গভীরতা কোথায়? আমি যা করি তার সঙ্গে পরামর্শ করেই করি।’

কনসাল জেনারেল শাহ আলম খোকন আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘সরকার ও দলকে এক করবেন না। দলের নামে আমার উপর চাপ প্রয়োগ করবেন না। কনস্যুলেটের অনুষ্ঠানে দাওয়াত কাকে দেবো না দেবো, এটা আমার সিদ্ধান্ত।’ সেইসঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় নিয়ে নেতাদের উপদেশ দেওয়ার চেষ্টাও করেন তিনি। 

এছাড়া, আপ্যায়ন প্রসঙ্গে অন্তত ১০ বার ব্যক্তিগত অর্থ থেকে চা-মিষ্টি দেওয়ার বিষয়টি অশালীনভাবে তুলে ধরে তিনি দাবি করেন সরকার তাকে কোনো বাজেট দেয়নি।

জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন সেই অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত, কোরআন তেলাওয়াত কিংবা জুলাই আন্দোলনের শহীদদের মাগফিরাত কামনায় দোয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এমনকি পূর্বে প্রস্তুতকৃত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক ফেস্টুনগুলো সংরক্ষণাগার থেকে ফেলে দেওয়ারও মারাত্মক অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

অনুষ্ঠানের পর কানাডা পশ্চিম বিএনপির নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানস্থলে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ওন্টারিও স্টেট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইমন চৌধুরী ও টরন্টো সিটি বিএনপির সভাপতি মঈন চৌধুরীসহ প্রবাসীরা কনসাল জেনারেলের এমন অসংলগ্ন অঙ্গভঙ্গি, অহংকার ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারহীনতাকে অরাজনৈতিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কেউ কেউ তাকে আওয়ামী লীগ আমলের পররাষ্ট্র ও অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর ভাগ্নি জামাই পরিচয়ে ব্যাপক সুবিধাভোগী হিসাবেও চিহ্নিত করেন। কনস্যুলেটের ক্রমাগত অদক্ষতা, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রবাসীদের মাঝে বিরাজমান দীর্ঘদিনের ক্ষোভের সাথে এই ঘটনা যুক্ত হওয়ায় চরম কোণঠাসা হয়ে পড়েন কনসাল জেনারেল।

পরবর্তীতে নিজের অবস্থান রক্ষা করতে এবং কূটনৈতিক পরিবেশ ও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার তাগিদে বিএনপি নেতাদের কাছে নিজ বক্তব্যের ভুল স্বীকার করে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান তিনি। ভবিষ্যতে তিনি যে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনে বিএনপি নেতাদের পরামর্শক্রমে আমন্ত্রিতদের তালিকা তৈরীসহ সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন বলে সবাইকে আশ্বস্ত করেন। অতি শিগগিরিই তিনি কানাডায় বাংলাদেশের হাই কমিশনারের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবেন বলেও জানান। 

অনুষ্ঠান শেষে কনস্যাল জেনারেল বিএনপি নেতাদের একটি করে ‘ইকবাল ফুডসে’র গিফট প্যাকেট প্রদান করেন। ১৮ জন বিএনপি নেতা থাকলেও গিফট প্যাকেট ছিলো ১০টি। ফলে সিনিয়র নেতারা গিফট প্যাকেট নেননি। 

প্রবাসী নেতারা বলছেন, একজন কূটনীতিকের এভাবে প্রকাশ্য দম্ভোক্তি দেখানো এবং পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে ক্ষমা চাওয়া— পুরো কনস্যুলেট ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য এক চরম অস্বস্তিকর নজির।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ইঞ্জিনিয়ার রেজাউর রহমান, কানাডা বিএনপি পশ্চিমের সভাপতি খন্দকার আব্দুল আহাদ, সিনিয়র সহ-সভাপতি মাহবুবুর রব চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তপন মাহমুদ, সিনিয়র বিএনপি নেতা ফারুক খান, সহ-সভাপতি এজাজ আহমেদ, কানাডা বিএনপি নেতা জাকির খান, শেখ আব্দুল মুতালেব, সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি নেতা মাহবুব চৌধুরী রনি, অন্টারিও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইমন চৌধুরী, সহ-সভাপতি আবু জাহিদ আলম, কানাডা বিএনপি নেতা শহিদুর রহমান, কানাডা মহিলা দলের সভানেত্রী নাজমা হক, টরন্টো সিটি বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আহমদ, কানাডা যুবদলের সিনিয়র নেতা এস কে সুহেলুজ্জামান খান সুহেল, জালাল হাওলাদার, সাকিব আল করিমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।