Image description

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সঙ্গে নেই দুটি দল। এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের অভিযোগ, দলছুট নেতাদের ভিড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ জোট প্রমাণে জামায়াত ‘চালাকির’ আশ্রয় নিয়েছে। অবৈধভাবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিবন্ধিত অংশের ব্যানার ব্যবহার করছে।

খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দীন স্ট্রিমকে বলেন, আমাদের বহিষ্কৃত কয়েক নেতাকে ১১-দলীয় জোটে টেনে খেলাফত আন্দোলনের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ তাদের নিবন্ধন নেই, এমনকি এসব নেতার মূল খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক পর্যন্ত নেই। তাঁরা অবৈধভাবে খেলাফত আন্দোলনের ব্যানার ব্যবহার করছে। জামায়াতের মতো দল তাদের দিয়ে এসব না করালেও পারতো।

জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী যে কেউ সঙ্গী হতে চাইলে তাঁর জন্য আমাদের জোটের দরজা খোলা। খেলাফত আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘খেলাফত আন্দোলনের দুই অংশ আগে থেকেই আমাদের সঙ্গে। এখন তাদের দলের ভেতরে কী ঘটেছে, তা তাদের বিষয়।’

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ১১-দলীয় ঐক্যের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় কওমিধারার চার রাজনৈতিক দল। এগুলো হলো– মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, আবদুল বাছিত আজাদের খেলাফত মজলিস, সারওয়ার কামাল আজিজির (গত ৮ মে প্রয়াত) নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলাম পার্টি ও হাবিবুল্লাহ মিয়াজীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।

১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক। সংগৃহীত ছবি১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক। সংগৃহীত ছবি

শুরুতে থাকলেও, নির্বাচনের আগে ঐক্য থেকে বেরিয়ে যায় চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। আর নির্বাচনে আসনে ছাড় না পাওয়া, উচ্চকক্ষ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও আদর্শিক বিরোধ দেখিয়ে ভোটের পর থেকে ১১-দলীয় ঐক্যের মাঠের কর্মসূচিতে অনুপস্থিত রয়েছে খেলাফত আন্দোলন। অন্যদিকে বাছিত আজাদের খেলাফত মজলিস ঐক্যের কর্মসূচিতে আর না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে গত ২৫ জুলাই। এতে ১১-দলীয় ঐক্যে এখন সক্রিয় ৯টি রাজনৈতিক দল।

জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া দলের নেতারা বলছেন, ৯-দলীয় জোট যাতে প্রমাণ না হয়, সে জন্য জামায়াত নেতারা দলছুটদের ভিড়িয়েছেন। তাদের পাশে রেখে নিবন্ধিত দুটি দলই জোটে আছে–এমন বার্তা মাঠের কর্মীদের দিচ্ছেন। এটি এক ধরনের প্রতারণা।

তবে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আমাদের দরজা খোলা। যে দাবিতে আমরা আন্দোলনের মাঠে আছি, তা নিয়ে যারা আসবে তাদের সঙ্গে নেব। এখন সে কার অংশ বা কোন দল, তা আমাদের দেখার বিষয় না।’

জোটের নতুন শরিক অনিবন্ধিত অংশ

১৯৮১ সালে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর। ‘তওবার রাজনীতির’ প্রবর্তক হাফেজ্জি হুজুরের পরে দলটির নেতৃত্বে এসেছেন তাঁর সন্তান ও নাতিরা। বর্তমান আমির হাবিবুল্লাহ মিয়াজী হাফেজ্জি হুজুরের নাতি।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বটগাছ প্রতীকে আট আসনে প্রার্থী দেয় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। একই নামে দলের আরেক অংশ সক্রিয়। এই অংশের আমির আবু জাফর কাসেমী; মহাসচিব ফখরুল ইসলাম। এই অংশটি অনিবন্ধিত, কোনো প্রতীক নেই। গত সংসদ নির্বাচনেও অংশ নেয়নি তারা।

অনিবন্ধিত অংশের নেতাকর্মীদের কখনো ১১-দলীয় ঐক্যের সভা-সমাবেশে দেখা যায়নি। তবে সম্প্রতি তারা ১১-দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। গত ৯ আগস্ট রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হয়। সেখানে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে জোটের মনোনয়ন দেওয়া হয়।

বৈঠকে ১১ দলের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের অনিবন্ধিত অংশের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এবং পরদিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহে জোটের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও নির্বাচন কমিশনে যান ফখরুল।

জানতে চাইলে ফখরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘৬ আগস্ট থেকে আমরা ১১-দলীয় ঐক্যে যুক্ত হয়েছি। আমাদের সঙ্গে জোটের যোগাযোগ আগেও ছিল। তবে নির্বাচনে আমরা ১১-দলীয় ঐক্যে ছিলাম না।’

তিনি বলেন, নিবন্ধন ও প্রতীক না থাকায় সংসদ নির্বাচনে আমরা অংশ নিতে পারিনি। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আমরা ১১-দলীয় ঐক্যের সমঝোতায় যোগ দিয়েছি।

দলের সিনিয়র নায়েবে আমির আবুল কাসেম কাসেমী, যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর আমির মোহম্মদ হোসাইন আকন্দ ১১ দলের সাম্প্রতিক দুটি কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বলেও জানান ফখরুল ইসলাম।

চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ স্ট্রিমকে জানান, তাদের জানামতে, ১১-দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নিবন্ধিত অংশ ছিল। অন্য অংশ ছিল না।

এ ব্যাপারে ১১-দলীয় ঐক্যের গুরুত্বপূর্ণ শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ স্ট্রিমকে বলেন, খেলাফত আন্দোলনের নিবন্ধিত অংশ নির্বাচন পর্যন্ত জোটে ছিল। নির্বাচনের পরে তারা আমাদের কিছু জানাননি। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠি দিয়ে বা ফোন করে জোটে থাকছেন না– এমন কিছুই বলেননি। তবে গণমাধ্যমের কাছে জোট ছাড়ার কথা বলেছেন। এটি সত্য, ১১ দলের কোনো কর্মসূচিতে তারা আর আসেন না।

১১ দলীয় ঐক্যের সাম্প্রতিক ব্রিফিং। সংগৃহীত ছবি১১ দলীয় ঐক্যের সাম্প্রতিক ব্রিফিং। সংগৃহীত ছবি

তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে খেলাফত আন্দোলনের অনিবন্ধিত অংশের বিষয়টা আমাদের শীর্ষ মিটিংয়ে আলোচনা হয়। আমরা মোটামুটি ইতিবাচক। এই অংশের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম ইতোমধ্যে আমাদের দু-একটা কর্মসূচিতে এসেছেন।’

জামায়াতের নয়া কৌশল বলছে খেলাফত আন্দোলন

গত ১০ জুন কেন্দ্রীয় মজলিসে আমেলার বৈঠক শেষে খেলাফত আন্দোলন নিবন্ধিত অংশ গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। এতে দলের আমির হাবিবুল্লাহ মিয়াজী বলেন, খেলাফত আন্দোলন কোনো জোটে নেই। দলের নাম ১১-দলীয় জোটে ব্যবহার না করারও আহ্বান জানান তিনি।

পরে খেলাফত আন্দোলনের (নিবন্ধিত) নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান হামিদি স্ট্রিমকে বলেন, সংসদ নির্বাচনের আগে ইস্যুভিত্তিক কিছু কর্মসূচিতে আমরা ১১ দলের সঙ্গে ছিলাম। আসন সমঝোতা না হওয়ায় এককভাবে নির্বাচন করেছি।

এ ব্যাপারে ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ স্ট্রিমকে বলেন, খেলাফত আন্দোলন গণমাধ্যমে যাই বলুক, তারা ১১-দলীয় ঐক্যে রয়েছে। তারা ঐক্যে নেই– এমন কথা দলটির পক্ষ থেকে আমাদের বলেনি।

গত ১১ আগস্ট খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দীন স্ট্রিমকে বলেন, নির্বাচন কমিশনে আমাদের নিবন্ধন নম্বর ২০, প্রতীক বটগাছ। প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছি– আমরা ১১-দলীয় জোটে নেই। এরপরও তারা আমাদের নাম ব্যবহার করছেন। আমরা এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছি। এরপরই জামায়াত নতুন কৌশল নিয়েছে। খেলাফত আন্দোলনের বহিষ্কৃত কতিপয় নেতাকে জোটে ভিড়িয়ে তারা খেলাফত আন্দোলনের নাম ব্যবহারের খেলা খেলছেন।

এ ব্যাপারে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ১১-দলীয় ঐক্য থেকে কোনো দল বেরিয়ে যায়নি। আবু জাফর কাসেমী ও ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন আগে থেকেই জোটে আছে। আগেও তারা ঐক্যের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।

আগে থেকে তারা ঐক্যে থাকলে দলের সংখ্যা এগারোর বেশি হয়। তারপরেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জোটের নাম ১১-দলীয় ঐক্য কেন– প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জোটে কোনো সংখ্যা দিয়ে নাম হয় না। যখন ২০ দলের জোট ছিল, সেখানে ২৬টি রাজনৈতিক দল ছিল। ১৮ দলের জোট যখন ছিল, মোট দল ছিল ২২টি।’

অনিবন্ধিত অংশের নেতাদের জোটে টেনে চাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে খেলাফত আন্দোলনের এমন দাবির বিষয়ে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘এতে প্রতারণার কোনো বিষয় নেই। আমাদের দরজা খোলা। দাবির সঙ্গে মেলে যারাই আসবে, আমরা তাদের সঙ্গে নেব। এখন সে কার অংশ বা কোন দল, তা দেখার বিষয় না।’