Image description

ছেলের সঙ্গে শেষ কথা কী হয়েছিল? সে কথা বলতে গিয়ে কখনোই শেষ করতে পারেন না নীলা চৌধুরী। কারণ, কথা বলার শুরু থেকেই তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। কখনো ক্ষণিকের জন্য নীরব হয়ে যান। কখনো কান্না চাপিয়ে রাখেন। ছেলের সঙ্গে সর্বশেষ কী কথা হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর ধীরে ধীরে দেন এই মা।

সালমান শাহ মারা যান ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। তার আগের দিন, ৫ সেপ্টেম্বর ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা বলেছিলেন নীলা চৌধুরী। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ যেন এখনো তাঁর কানে বাজে। শেষবার তিনি ছেলেকে সিলেট যেতে বলেছিলেন। নীল চৌধুরী বলেন, ‘আগের দিন আমি ইমনকে বলেছিলাম, ইমন, তুমিও আমাদের সঙ্গে সিলেট চলো। তাহলে তোমার একটু বিশ্রাম হবে। দুই-তিন দিন সিলেটে কাটিয়ে আসলে তোমার ভালো লাগবে।’ কিন্তু সালমান তখন কাজের ব্যস্ততায় মাকে বলেছিলেন, ‘এত মানুষের লগ্নি আমার কাছে। বিশ্রাম তো দূরে থাক, আমার মরারও সময় নেই আম্মা।’ তারপর কান্নাজড়িত কণ্ঠে সালমানের মা বলেন, ‘যে ছেলে আগের দিন বলে মরারও সময় নেই, সেই ছেলে পরের দিন সকালে আত্মহত্যা করে ফেলে, এটা কেউ বিশ্বাস করবে?’

সালমান শাহ
সালমান শাহফাইল ছবি

সালমানের শেষ কথা
সেদিন ছেলে মায়ের সঙ্গে দাদাবাড়ি যায়নি; বরং মাকে বুঝিয়ে বলেছিল ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবনার কথা, ভবিষতের কথা। ‘ইমন আমাকে বুঝিয়ে বলল, “মা, এত মানুষের লগ্নি আমার কাছে। বিশ্রাম তো দূরে থাক, আমার মরারও সময় নেই আম্মা। তার চেয়ে তুমি সিলেট থেকে ঘুরে আসো। পরে তোমাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক যাব। এক মাসের ভ্রমণে যাব। তখন এক মাস শুধুই বিশ্রাম নেব।”’ সালমানের এই শেষ কথাগুলো বলতে বলতে টেলিফোনের ওপাশে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন নীলা চৌধুরী। কিছুক্ষণ তাঁর মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না। সালমানের মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও তাঁর মা যখন ছেলের কথা বলেন, তখন সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, চোখে পানি জমে। কথার ফাঁকে বারবার উচ্চারিত হয় একটি নাম, ‘আমার ইমন।’

‘ছেলেকে ছাড়া আমার ঘুম আসে না’
ছেলের সঙ্গে সেই এক মাসের ভ্রমণ আর কখনো হয়নি। সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংককের পথে মায়ের হাত ধরে হাঁটেননি ইমন। থেকে গেছে শুধু সেই অসমাপ্ত পরিকল্পনা আর শেষ কথাগুলো। ছেলের মৃত্যুর এত বছর পরও সেই শোক থেকে বের হতে পারেননি নীলা চৌধুরী। বরং সময় যত গেছে, স্মৃতিগুলো যেন আরও গভীর হয়েছে, কখনো লন্ডনের বাসায় তাকে একাকী করেছে, মানসিক ভাবে ভেঙে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ছেলের শেষ ইচ্ছা পূরণ হলো না। এত কিছু বলার পর কি আমি ঘুমাইতে পারি? আমার ঘুম সেদিনই শেষ। ছেলেকে ছাড়া আমার ঘুম আসে না।’ একজন মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যুর শোক হয়তো কখনো পুরোনো হওয়ার নয়।

সালমান শাহ ও সামিরা
সালমান শাহ ও সামিরাকোলাজ

‘কিরে ইমন, এগুলো কিসের দাগ?’
সালমান শাহ ও তাঁর মায়ের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নীলা চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান তাঁর জীবনের প্রায় সবকিছুই মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন। মাকে কিছু না বলে থাকতে পারতেন না, ‘আমি সালমানের মাধ্যমেই সংসারের সবকিছু জানতাম। কী করছে, কোনো বন্ধুরা আসছে, কোনো সিনেমা করছে। ও সবই আমাকে বলত। মায়ের কাছে কিছু গোপন করত না। আর না বললে বুঝতে পারতাম সে মানসিকভাবে অস্থির আছে, ভালো নাই।’ একবার সালমানের হাতে ও পিঠে বেশ কিছু কামড়ের দাগ দেখে মা জানতে চেয়েছিলেন। মায়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যাননি সালমান। শিশুর মতো সরলভাবে মাকে সবকিছু বলেছিলেন। নীলা চৌধুরীর কথায়, ‘ইমন শুটিং করে বাসায় এসে মানসিক অশান্তিতে থাকত। সামিরা তাকে নানাভাবে হয়রানি করত। বাসায় সে কখনোই শান্তি পেত না।’

শুটিংয়ে কেমন ছিলেন সালমান শাহ
নীলা চৌধুরীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম শুটিংয়ের তারকা ছেলে সালমান শাহ সম্পর্কে। প্রশ্ন শুনেই তিনি বললেন, ‘আমার ছেলেকে ভদ্রতা শিখিয়েছি। সে কোন পরিবারের জানত। যে কারণে কখনোই কাউকে অসম্মান করত না। মায়ের স্মৃতিতে সালমান শুধু জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না, ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন মানুষ। নীলা চৌধুরী বলেন, ‘সাদামনের মানুষ বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা–ই ছিল ইমন। কারও কষ্ট সে দেখতে পারত না। ইমন মিডিয়ার পরিচিত মানুষদেরও নিয়মিত খোঁজ নিত। কে কেমন আছেন, কার কী সমস্যা—এসব খবরও জানত। যারা অসচ্ছল, তাদের সাহায্য করত। তাদেরও কাজের সুযোগ করে দিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইমন কারও কষ্ট দেখতে পারত না। আর শুটিংয়ে কে তারকা, কে এক্সট্রা, ইমন কোনো দিন ভেদাভেদ করত না। কাউকে ছোট করে দেখেনি। অনেক গরিব মেয়ে ছিল, যারা অভিনয় করতে না পারলে খেতে পারে না। তাদেরও ইমন কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। যাকে দরকার, তাকে দিয়েই ইমন কাস্টিং করিয়ে নিত।’

ব্যক্তিজীবনে মা-ছেলে
ক্যারিয়ারের ব্যস্ত সময়ে সালমানের হাতে একের পর এক চলচ্চিত্রের কাজ। শুটিং, প্রচারণা, নানা দায়িত্ব—সব মিলিয়ে নিজের জন্য সময় বের করাই কঠিন হয়ে উঠেছিল। নীলা চৌধুরী জানান, এমন সময় শপিং করার সময়ও পেত না ছেলে। এমনকি সময়মতো খাবার খাওয়ার সুযোগও থাকত না। ‘এই নিয়ে আমার খুব চিন্তা হতো। বলতাম, ইমন শরীরের যত্ন ঠিক মতো নিয়ো। শরীরকে অবহেলা কোরো না। আর ও সব সময় নতুন দামি সব জামাকাপড় ব্যবহার করত। একসময় দেখি সে ব্যস্ততায় শপিংয়েই যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। আমিই শপিং দিতাম। আমার সঙ্গে ইমনের পছন্দের খুবই মিল ছিল।’

 
১৯৯৪ সাল। তখন সালমান শাহর বয়স মাত্র ২৩।

যে প্রশ্নে শুধুই হাহাকার
সালমানের মৃত্যুর দিনের প্রসঙ্গ উঠতেই নীলা চৌধুরীর কণ্ঠে ফিরে আসে দীর্ঘদিনের বেদনা ও প্রশ্ন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘অল্প বয়সে আমার ছেলেকে কেন যেতে হবে। কেন কিছু মানুষ তাকে হত্যা করল। কারও তো কোনো ক্ষতি করে নাই সালমান।’ এই প্রশ্নগুলো তাঁর মনে আজও ঘুরে বেড়ায়। সালমানের মায়ের কথায়, ‘আমার ছেলে কারও ক্ষতি চাইত না। সালমানের মধ্যে এতটুকু বেয়াদবি ছিল না। সে পরিশ্রমী ছিল। সে নিজের কাজের প্রতি ভীষণ যত্নশীল ছিলেন। কেন আমার ছেলেকে হত্যা করল ওরা। আমি এর ন্যায়বিচার দেখেই মরতে চাই। যারা আমাকে হুমকি দিয়েছি, তাদেরও সবার বিচার হবে। আমার ইমনকে ওরা কেন খুন করল। ছেলেটা আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমার ইমন।’ কথাটি বলতে গিয়ে আবারও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তবে তিনি ছেলের হত্যার বিচার চান।

৪ ভরির সোনার চেইন
সালমান শাহর সঙ্গে মায়ের শেষ স্মৃতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আবেগঘন একটি স্মৃতি তাঁর গলার চার ভরি ওজনের সোনার চেইন। সালমানের গলা থেকে সেই চেইনটি নিয়েছিলেন নীলা চৌধুরী। এত বছর পরও সেটি তাঁর কাছে কেবল একটি অলংকার নয়। সেটি তাঁর সন্তানের স্মৃতি, তাঁর ইমনের স্পর্শের শেষ চিহ্নগুলোর একটি। নীলা চৌধুরী বলেন, ‘ইমনের গলা থেকে চার ভরি স্বর্ণের চেইনটা আমি নিয়েছিলাম। সেই চেইন আমি সঙ্গে রাখি। এটাই আমার কাছে আমার ইমন।’ একটি চেইন, কিছু পুরোনো স্মৃতি আর অসংখ্য না–বলা কথা—এই নিয়েই যেন একজন মা আজও তাঁর ছেলেকে কাছে রাখেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেমে গিয়েছিল সালমান শাহর জীবন। কিন্তু তাঁর মায়ের কাছে ইমন থামেননি। তিনি রয়ে গেছেন সেই ৫ সেপ্টেম্বরের কথোপকথনে, মায়ের অসমাপ্ত ভ্রমণের পরিকল্পনায়, পুরোনো ছবিতে, প্রিয় জিনিসপত্রে—আর সবচেয়ে বেশি রয়ে গেছেন একটি নামের মধ্যে—‘আমার ইমন।’

নতুন করে আলোচনায় সালমান হত্যাকাণ্ড
গত রোববার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক হন খল অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন হক। সালমান শাহ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান। তাঁর মৃত্যুর ‘প্রকৃত কারণ’ নিয়ে নানা আলোচনা-জল্পনা আছে। তাঁর মৃত্যুর ২৯ বছর পর গত বছর আদালত হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন। সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে গত বছরের অক্টোবরে রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, খলচরিত্রের অভিনেতা ডন হকসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ। মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৩০ আগস্ট তারিখ ধার্য আছে।

সবশেষে নীলা চৌধুরী বললেন,‘প্রধান আসামীসহ আরও যাঁরা রয়ে গেছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হোক। কেউ যেন পালিয়ে যেতে না পারে। আমি মা হয়ে ছেলে হত্যার বিচার দেখতে চাই। সেই কারণেই আজও বেঁচে আছি।’