আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সামনে রেখে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে এবং নিজেদের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে একক প্রার্থী বাছাইয়ে মনোযোগ দিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। দলগুলোর নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে এলাকায় তার সততা, ব্যক্তিগত ইমেজ ও জনসমর্থনকে এবার সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামী তাদের ৯৫ শতাংশ চেয়ারম্যানপ্রার্থীর নামের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত করেছে। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ধাপে ধাপে ইউপি চেয়ারম্যানপ্রার্থীদের নাম ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে এনসিপি। অন্যদিকে, স্থানীয় সংসদ-সদস্য এবং উপজেলা-জেলা কমিটির মতামতের ভিত্তিতে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ এগিয়ে রাখছে ক্ষমতাসীন বিএনপি।
একক প্রার্থী বাছাইয়ে কাজ করছে বিএনপি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর মধ্যে প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে, এটি ধরে নিয়েই একক প্রার্থী বাছাইয়ে মনোযোগ দিয়েছে বিএনপি। এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। ফলে সম্ভাব্য রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে দলটি। স্থানীয় সংসদ-সদস্যদের আগ্রহ কিংবা তৃণমূলের পছন্দ বিবেচনায় থাকলেও দলীয় হাইকমান্ডের মূল নজর প্রার্থীর প্রকৃত জনসমর্থনের দিকে। স্বজনপ্রীতি বা ব্যক্তি পছন্দকে দূরে ঠেলে কেন্দ্র ও স্থানীয় সমন্বয়ে ‘একক প্রার্থী’র পেছনে পুরো দলকে ঐক্যবদ্ধ করাই এখন বিএনপির প্রধান নির্বাচনি কৌশল।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে দলীয় একক প্রার্থী ঠিক করার মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলটির উপজেলা কমিটিগুলোকে। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করবে সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটি। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ-সদস্যের মতামতেরও গুরুত্ব থাকবে। ইউনিয়নে চেয়ারম্যান বা মেম্বার প্রার্থী হিসাবে কার ভাবমূর্তি বা জনপ্রিয়তা কেমন, এ বিষয়ে উপজেলা কমিটিরই ভালো ধারণা আছে বলে মনে করা হয়। তবে কোনো ইউনিয়নে একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকলে একক প্রার্থী বাছাইয়ে প্রথমে জেলা, পরে সংশ্লিষ্ট সংসদ-সদস্য এবং প্রয়োজনে কেন্দ্রও এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি আছে। তৃণমূলে নেতাকর্মীরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ-সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃত্বের কথাও শোনা হবে। সবকিছু বিবেচনা করে স্থানীয় ইউনিটগুলোর নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসে প্রার্থী ঠিক করা হবে। এখানে ব্যক্তি পছন্দ দেখলে হবে না; দেখতে হবে এলাকায় কে বেশি জনপ্রিয়।’
রিজভী বলেন, ‘সম্প্রতি বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, যারা প্রার্থী হবেন, তাদের জনগণের মধ্যে কাজ করে উঠে আসতে হবে। এখানে রাষ্ট্র কারও পক্ষপাতিত্ব করবে না, এমনকি পৃষ্ঠপোষকও হবে না।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। দলীয় সমর্থন পেতে কেন্দ্রের পাশাপাশি স্থানীয় নেতাদের মনোযোগ আদায়েরও চেষ্টা করছেন তারা। কোথাও কোথাও স্থানীয় বিএনপির নেতারা প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক কাজও এগিয়ে রাখছেন। কয়েকটি এলাকায় সংসদ-সদস্যরা প্রার্থী ঠিক করতে স্থানীয় নেতাদের নিয়ে একাধিক বৈঠকও করছেন। উদ্দেশ্য হলো, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী যেন একজনই থাকেন।
যদিও প্রার্থী ঠিক করতে কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে দলীয় সূত্র বলছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে একক প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটি তারা আগেভাগেই করে রাখতে চাইছে। শিগ্গিরই সংসদ-সদস্যসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে প্রার্থীর মানদণ্ড যাচাই-বাছাই ইস্যুতে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
রোববার চট্টগ্রামে দলীয় এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের একক প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে।’ পাশাপাশি নির্বাচনে দলের একক প্রার্থীর জন্য সবাইকে কাজ করতে বলেছেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, এবার স্থানীয় নির্বাচন হবে নির্দলীয়ভাবে। ফলে দলের একাধিক প্রার্থী নির্বাচন করতে চাইতে পারেন। তবে ত্যাগী, যোগ্য এবং এলাকার জনপ্রিয়তার মানদণ্ডের ভিত্তিতে যে কোনো একজন প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হবে। তাদের নিজস্ব যোগ্যতায় মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। সে লক্ষ্যে আগেভাগেই যোগ্য প্রার্থী ঠিক করবে বিএনপি।
জানা যায়, ইউপি নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ-সদস্যদের কাছে লবিং-তদবির শুরু করছেন। অনেকে ইতোমধ্যে সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে দিয়েছেন। তারা এলাকায় বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজেদের কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। যেসব এলাকায় জনপ্রিয় সংসদ-সদস্য এবং তার একক নিয়ন্ত্রণে সবকিছু রয়েছে, তিনিই সবাইকে সমন্বয় করে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীদের ‘সবুজ সংকেত’ দিচ্ছেন।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলছেন, ইউপিসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলে একাধিক প্রার্থী মাঠে নামলে অভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়তে পারে। এমন বিরোধ তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে দলীয় রাজনীতিতে। এ কারণে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা, দলের প্রতি ত্যাগ, সাংগঠনিক ভূমিকা ও ব্যক্তিগত ইমেজ বিবেচনায় নিয়ে কিছু এলাকায় আগেভাগেই প্রার্থী ঠিক করে রাখার চেষ্টা চলছে। তবে এ প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, আগে থেকেই প্রার্থী নির্ধারণ করা হলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে। অন্যদিকে অনেকের আশঙ্কা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী ঠিক করে দিলে দলের অন্য নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির দুজন নেতা বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের অনেক যোগ্য প্রার্থী থাকতে পারেন। কিন্তু দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পাশেই সবাইকে থাকার ওয়াদা আমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।’
বিএনপির জেলা পর্যায়ের অন্তত ১৩ জন নেতার সঙ্গে যুগান্তরের আলোচনা হলে তারা জানান, দলীয় প্রতীক না থাকলেও নির্বাচনটি দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকবে না। ভোটের মাঠে বিএনপির সমর্থক ও নেতাকর্মীদের বড় ভূমিকা থাকবে। ফলে প্রার্থী বাছাইয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোট ভাগাভাগির আশঙ্কা রয়েছে। এতে দলের সাংগঠনিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আগে থেকেই সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নোয়াখালীর এক সংসদ-সদস্য যুগান্তরকে বলেন, কেন্দ্র থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনা নেই। তবে এলাকায় দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল যাতে তৈরি না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। যাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ রয়েছে এবং এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা আছে, তাদের নিয়ে আগেভাগে আলোচনা করা হচ্ছে। স্বজনপ্রীতির সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই কেন্দ্র ও স্থানীয় দলীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হবে। স্থানীয়ভাবে কারও নাম আলোচনায় থাকা মানেই তিনিই চূড়ান্ত প্রার্থী নন।’
বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন যুগান্তরকে বলেন, ‘সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি আছে। এলাকাভিত্তিক নেতাকর্মীরা কাজ করছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অনেকে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ কেউ প্রার্থী হওয়ার কথা বলছেন। তবে আমার এলাকায় প্রার্থী চূড়ান্ত কিংবা কাউকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়নি।’
কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কেন্দ্র থেকে কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি। তবে এবার নির্দলীয় নির্বাচন হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের নেতাকর্মীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।’
জামায়াতের ৯৫ শতাংশ প্রার্থী বাছাই সম্পন্ন
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক দলের মনোনয়নই মুখ্য হয়ে উঠবে। কারণ, ইউনিয়ন পরিষদসহ সব নির্বাচনেই প্রার্থী বাছাই করবে তারাই। সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও এর ব্যতিক্রম নয়। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটির প্রতি আনুগত্যের পাশাপাশি প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে সততা এবং এলাকায় গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রার্থী বাছাইয়ের মানদণ্ড হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্রগুলোর পাশাপাশি তৃণমূল থেকেও একই ধরনের বার্তা পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার যুগান্তরকে জানান, ইউনিয়ন পরিষদসহ সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই সততা বা নৈতিক মান এবং এলাকায় তার পরিচিতি বা গ্রহণযোগ্যতাকে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। তিনি বলেন, এবার দলীয় প্রতীক থাকবে না। ফলে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের কাছে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ভোটারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আমরা তাই প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায় থেকে জরিপের ভিত্তিকে গুরুত্ব দিয়েছি। স্থানীয় নেতৃত্বের পরামর্শ অনুসারেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থী ঠিক করা হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদে জামায়াত তাদের অধিকাংশ প্রার্থীই ঠিক করে ফেলেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রায় ৯৫ শতাংশই ঠিক হয়ে গেছে। এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর গ্রাম বা অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে কিছু কিছু জায়গায় শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে। মেম্বার প্রার্থী অধিকাংশ চূড়ান্ত হলেও অপেক্ষাকৃত দুর্বল সাংগঠনিক এলাকায় কিছু কিছু প্রার্থী বাছাই বাকি আছে। সময়মতো সেটা ঠিক হয়ে যাবে বলে জামায়াতের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মাওলানা আব্দুল হালিম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, আমি কোনো শতাংশ বলছি না। এতটুকু বলতে পারি, জামায়াত অধিকাংশ ইউপিতেই মেম্বার, চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাই সম্পন্ন করেছে। যেসব জায়গায় একটু দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা স্থানীয় পলিসির সঙ্গে জড়িত বিষয় আছে, সেখানে আরও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। শেষ মুহূর্তেও কোনো কোনো জায়গায় প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে।
জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমাদের কোনো জোট থাকবে না। যার যার মতো প্রার্থী দেবে। এখন পর্যন্ত ১১ দলে এ সিদ্ধান্ত বহাল আছে।
জামায়াত সূত্রগুলো বলছে, তৃণমূল পর্যায়েও কেন্দ্র থেকে বেশকিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের নির্দেশনা মেনেই সততা, যোগ্যতা এবং এলাকায় গ্রহণযোগ্যতাকে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মাওলানা ফখরুদ্দিন মিজান যুগান্তরকে বলেন, আমার উপজেলায় ৮টি ইউনিয়নের ৬টির চেয়ারম্যান প্রার্থী জামায়াতের রুকন। একটি ইউনিয়নে একজন কর্মী এবং অন্যটিতে একজন সমর্থককে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। যিনি কর্মী, তার বাবা ওই ইউনিয়নের কয়েকবারের চেয়ারম্যান ছিলেন; তার যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা আছে। এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে।
মিজান আরও জানান, সব্দালপুর নামে একটি ইউনিয়নে রুকন থাকা সত্ত্বেও আমরা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান প্রার্থী দিয়েছি। তিনি একটি স্বনামধন্য কলেজের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন। তার হাতে গড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থী রয়েছে প্রচুর। ওই চেয়ারম্যানপ্রার্থী অধ্যক্ষ মুন্সী মোখলেসুর রহমান যুগান্তরকে জানান, আমি আশাবাদী, দলীয় পরিচয় ছাড়াও আমার শিক্ষার্থী, আত্মীয়স্বজন এবং এলাকার সর্বস্তরের মানুষ আমাকে যে উঁচু চোখে দেখে, তারা নির্বাচনেও আমাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে।
সেপ্টেম্বর থেকে তালিকা প্রকাশ করবে এনসিপি
১১ দলীয় জোটে থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এককভাবে প্রার্থী দেবে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। দলটির সদস্য সচিব সংসদ-সদস্য আখতার হোসেন যুগান্তরকে জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর থেকে তারা ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করবেন। সূত্র বলছে, এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারা সাংগঠনিক শক্তিও বৃদ্ধি করতে চায়। এজন্য সারা দেশে জনসংযোগ কর্মসূচি জোরদার করা হবে। আখতার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা সেপ্টেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা ও মনোনয়ন দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছি।’ তার মতে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন একটি রাজনৈতিক দলের জন্য তৃণমূল পর্যায়ের শক্তির উৎস। এ নির্বাচন সামনে রেখে তার দল সারা দেশে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছে এবং নেতকর্মীরা নির্বাচনকে ঘিরে আরও সংগঠিত হচ্ছে। আখতার হোসেন বলেন, ‘এনসিপি সেপ্টেম্বর থেকে ধাপে ধাপে দেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোর চেয়ারম্যান পদের জন্য দলীয় প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা শুরু করবে। তাছাড়া দুই মাসের মধ্যে দেশের সর্বস্তরের ইউনিট কমিটি পুনর্গঠন সম্পন্ন করার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সারা দেশে এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কৌশলগত অবস্থান ঠিক করছি।’
উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে প্রথম ধাপে ৫টি সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং মেয়র পদে ১০০ জন প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে এনসিপি। প্রথম ধাপের পর চলতি মাসেই আরও ১০০টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে। একই সঙ্গে আগামী দুই মাসের মধ্যে দেশের সব ইউনিটে এনসিপির সাংগঠনিক কমিটি পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
কয়েক মাস ধরে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পৃথকভাবে অংশ নেওয়ার খবরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল। তবে মঙ্গলবারও এনসিপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এককভাবেই অংশগ্রহণ করবে। ৮ আগস্ট দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের জেলা ও মহানগর পর্যায়ের ৭৬টি ইউনিটের একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার ওই বৈঠকে মাঠ পর্যায়ে কোন কোন পদ্ধতিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে স্থানীয় এনসিপি নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আড়াইহাজার উপজেলার এক এনসিপি নেতা যুগান্তরকে জানান, স্থানীয়ভাবে জামায়াতও এককভাবে স্থানীয় নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এনসিপির পক্ষে তিনি নির্বাচন করবেন। দলের হয়ে তিনি কেন্দ্রীয় সভা-মিছিলেও কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন। এনসিপি এককভাবে নির্বাচন করলে ভালো করবে-এমন আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন স্থানীয় ওই নেতা।
দলটির আরেক নেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এনসিপি আরও শক্তিশালী হবে। জাতীয় নির্বাচনে এনসিপি ৩০টি আসনে নির্বাচন করেছে। বাকি আসনগুলোয় নিজ দলের প্রার্থীদের সক্ষমতা যাচাই করার সুযোগ হয়নি। সাম্প্রতিক জুলাই পদযাত্রায় স্থানীয়ভাবে এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে শক্তি সঞ্চার হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী প্রায় এক বছর আগেই বিভিন্ন আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। সেই ক্ষেত্রে এনসিপি পিছিয়ে ছিল। এবার বিষয়টি মাথায় রেখে এনসিপিও আগেভাগেই প্রার্থী ঘোষণা করবে।’
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদসহ সার্বিক নির্বাচনিব্যবস্থা মানে তৃণমূলের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। আমরা মনে করি, স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো ইউনিয়ন পরিষদ। এখানে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচন নিশ্চিত করতে হয়। আমরা দলীয়ভাবে এ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভালো করতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বা কেবল দলীয় বিবেচনায় প্রার্থী নির্বাচন করছি না। মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।’ অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতকর্মীরা হিংস্র হয়ে উঠছে। এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর নানা সময় হামলা-নির্যাতন করা হচ্ছে। ভয়ভীতি তো আছেই।’
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও সুস্থ পরিবেশের দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের আগে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ সব রাজনৈতিক দল যেন সমান সুযোগ নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।’ পুরোনো স্বৈরাচারী বা একদলীয় নির্বাচনি মডেল থেকে বের হয়ে একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে মনিরা শারমিন জানান, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) পদেও এনসিপি প্রার্থী দিচ্ছে।