ফেসবুক আর ইউটিউবে প্রায়ই ইউরোপের নানা দেশের ভিডিও দেখতেন আব্দুল গণি। ইউরোপের সুন্দর রাস্তাঘাট আর সেখানকার প্রবাসীদের জীবন দেখে নিজের ভাতিজাকে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
২০২৪ সালে ফেসবুকে মাজহারুল ইসলাম অপু নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে গণির পরিচয় হয়। শুরুতে শুধু ভাতিজাকে পাঠানোর কথা হলেও ধীরে ধীরে আরও ছয়জন পরিচিত মানুষের দায়িত্ব নেন গণি। ভাতিজাসহ মোট সাতজনের কাজের ফাইল আর নগদ সাড়ে ১২ লাখ টাকা তিনি অপুর হাতে তুলে দেন।
প্রথম দিকে সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। পর্যায়ক্রমে পাসপোর্ট, দরকারি কাগজপত্র আর টাকা নেওয়া হয়। অপুর পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি ফাইলের কাজ নাকি প্রসেসিংয়ে আছে।
কিন্তু এভাবে দেখতে দেখতে মাসের পর পর মাস কেটে গেলেও কেউ আর বিদেশে যেতে পারেননি। গণি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘অপুর পরনে ধর্মীয় পোশাক আর চেহারা দেখে আমার কখনো কোনো সন্দেহ হয়নি। তার মিষ্টি কথা বিশ্বাস করেই আমি এতগুলো টাকা দিয়েছিলাম।’
প্রতারণার শিকার কেবল গণি একা হননি। টাইমসের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অপু এবং তার প্রতিষ্ঠান ‘গেটওয়ে ট্যুরস অ্যান্ড মাল্টি কনসালটেন্সি’র চক্রে পড়ে ৯০ জনেরও বেশি মানুষ তাদের কষ্টার্জিত টাকা হারিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের সরকার অনুমোদিত দাবি করলেও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তালিকায় এদের কোনো নিবন্ধন বা লাইসেন্স পাওয়া যায়নি।
এমনকি তাদের দেওয়া ঢাকা ও চাঁদপুরের অফিসে গিয়েও কোনো কাজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ভিসা, চাকরি বা টাকা ফেরতের বিষয়ে কোনো সন্দেহ তৈরি হওয়ার আগেই অপু অত্যন্ত কৌশলে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে ফেলতেন।
ফেসবুকে ‘বাবা ভুইয়াপুরী’ নামের একটি পেজের সাথে যুক্ত ছিলেন চাঁদপুরের বাসিন্দা অপু। এই পেজের কাজ ছিল ভণ্ড পীরদের ফাঁদ ফাঁস করা। এর পাশাপাশি তিনি চালাতেন গেটওয়ে ট্যুরস অ্যান্ড মাল্টি কনসালটেন্সি। তিনি দাবি করতেন, মানুষকে ভিসা দেওয়া আর বিদেশে ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়াই তার কাজ।
ফেসবুকে বিভিন্ন সচেতনতামূলক পোস্ট লিখে সাধারণ মানুষের কাছে নিজের একটা ভালো ভাবমূর্তি তৈরি করেছিলেন অপু। ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন, তার লম্বা দাড়ি, টুপি-পাঞ্জাবি আর ধার্মিক রূপ দেখে মানুষ খুব সহজেই তাকে বিশ্বাস করে ফেলত।
নিজের এই ধার্মিক ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি ইউরোপে যেতে ইচ্ছুক মানুষদের ফাঁদে ফেলতেন। কেউ ইউরোপে থাকা বন্ধুর মাধ্যমে অপুর খোঁজ পেয়েছিলেন, কেউ পরিচিতদের কথায় বিশ্বাস করে এসেছিলেন, আবার কেউবা তার ফেসবুক পোস্ট দেখে তার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।
অপু ফোন ধরা বন্ধ করে দিলে গণি শেষমেষ চাঁদপুরে অপুর বাড়িতে গিয়ে হাজির হন। সেখানে অনেক চেষ্টা করে তিনি কয়েকটি পাসপোর্ট ফেরত পান। তখন তাকে আশ্বাস দেওয়া হয় যে, বাকিদের তুরস্কে পাঠানো হবে।
তবে গণি জানান, এরপর থেকে অপুর সাথে আর কোনোভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
পরিচিতদের সুবাদেই ছড়ায় বিশ্বাস
পোল্যান্ডে থাকা এক বন্ধুর কাছ থেকে অপুর খোঁজ পান মতিন মাহমুদ। এরপর তিনি চাঁদপুরে অপুর অফিসে যান। প্রথমবারে তিনি একটি পাসপোর্ট আর নগদ ৬৫ হাজার টাকা জমা দেন।
এরপর সার্বিয়া যেতে চাওয়া নিজের এক পরিচিত ছোট ভাইকেও অপুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন মতিন। এবার তিনি নিজে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেন।
কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। মতিন যখনই যোগাযোগের চেষ্টা করতেন, অপু নানা অজুহাত দেখাতেন। শেষমেষ কোনো উপায় না দেখে মতিন সরাসরি অপুর বাড়িতে যান।
মতিন জানান, অপু তাকে ১ লাখ টাকা ফেরত দিলেও বাকি টাকা ‘ফি’ হিসেবে কেটে রেখে দেন।
এই মতিনের মাধ্যমেই অপুর সন্ধান পেয়েছিলেন সজীব চন্দ্র সূত্রধর। অপুর হাতে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা তুলে দিয়েছিলেন তিনি। সজীব জানান, তিনিও একইভাবে প্রতারিত হয়েছেন।
প্রতারণার শিকার এজেন্টরাও
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অপুর হয়ে মাঠপর্যায়ে অন্তত চারজন এজেন্ট কাজ করতেন। কিন্তু এই প্রতারণার ধাক্কা শুধু বিদেশগামী কর্মীদের ওপর দিয়েই যায়নি। যারা অপুর কথা বিশ্বাস করে মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলে দিয়েছিলেন, সেই এজেন্টরাও এখন বিপদে পড়েছেন। অপুর দেখা না পেয়ে পাওনাদারেরা এখন সব চাপ দিচ্ছে এই এজেন্টদের ওপর।
কাউকে কাউকে এর জন্য চরম মূল্যও দিতে হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক এজেন্ট মানুষের টাকা মেটাতে নিজের বাবার ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। আর বেশ কয়েকজন এজেন্ট টাকা ফেরত দিতে না পেরে ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
সিলেটের এক মাদ্রাসা শিক্ষক জামাল হোসেন অপুর ফেসবুকের লেখালেখি দেখে তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে ফেসবুকেই অপুর সঙ্গে তার কথা হয়।
জামাল প্রথমে নিজের ছোট ভাইকে সার্বিয়া পাঠানোর জন্য ফাইল জমা দেন। পরে বন্ধুদের আরও কয়েকটি ফাইল দেন। পরপর ছয়টি ফাইল দেওয়ার পর অপু তাকে তাদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেয়।
এরপর জামাল সার্বিয়া যেতে ইচ্ছুক তার পরিচিত মানুষের ফাইল অপুর কাছে পাঠাতে শুরু করেন। কিন্তু একপর্যায়ে জামালের ভুল ভাঙে। তিনি বুঝতে পারেন তিনি নিজেও বড় একটা ফাঁদে পড়েছেন।
অপু যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে জামাল নিজের ও পরিচিতদের সব টাকা ফেরত চান। তবে টাকা ফেরত না দিয়ে অপু কেবল সময় নষ্ট করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত সেই টাকা আর কখনোই ফেরত পাওয়া যায়নি।
কাগজে অফিস থাকলেও বাস্তবে কিছুই নেই
গেটওয়ে ট্যুরস অ্যান্ড মাল্টি কনসালটেন্সির ওয়েবসাইটে দাবি করা আছে, তারা গ্রাহকদের ভিসা সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ করে দেয়। ওয়েবসাইটে তাদের দুটি অফিসের কথা বলা আছে–একটি ঢাকায়, অন্যটি চাঁদপুরে।
কিন্তু সরেজমিনে ওই দুই জায়গায় গিয়ে তাদের কোনো কাজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
মতিন মাহমুদ জানান, তিনি চাঁদপুরের ঠিকানায় গিয়ে দেখেন সেখানে কোম্পানির কোনো অফিস নেই। আর ঢাকার পল্টনে যে ঠিকানা দেওয়া ছিল, সেখানে গিয়ে তিনি ওই নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই পাননি।
একই সাথে তাদের লাইসেন্স নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি দপ্তর বিএমইটিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গেটওয়ে নিজেদের সরকার অনুমোদিত বললেও সরকারি খাতায় তাদের কোনো নাম বা নিবন্ধন নেই।
এ বিষয়ে বিএমইটির মনিটরিং শাখার পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতারণার বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তিনি জানান, এসব বিষয়ে শুধু মহাপরিচালক কথা বলবেন।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএমইটির এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, তাদের তদারকিতে কিছু ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘জনশক্তি রপ্তানিতে অনিয়ম বন্ধে আমরা মাঝেমধ্যে অভিযান চালাই। কিন্তু পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি অভিযান চালাতে পারি না।’
আইনে জেল-জরিমানা
মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১৬ অনুযায়ী, ভুয়া কথা বলে বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে কারও সাথে প্রতারণা করা একটি বড় অপরাধ।
আইনের ২৫ ধারায় বলা আছে–বিদেশে চাকরি বা যাওয়া নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়া, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দেওয়া, বিদেশে চাকরি বা বসবাসের ভুয়া আশ্বাস দেওয়া কিংবা ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে মানুষকে বিদেশে পাঠাতে প্ররোচিত করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল হতে পারে। এর সঙ্গে কম করে হলেও ১ লাখ টাকা জরিমানার নিয়ম রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে টাইমসের পক্ষ থেকে অপুর মোবাইলে ফোন করা হলে, তিনি সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পরপরই কোনো কথা না বলে ফোন কেটে দেন।