Image description

গ্রাহক পর্যায়ে গত জুনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ দাম বৃদ্ধির পরও মানুষের কষ্ট কাটছে না। বর্ষা মৌসুমের শেষ লগ্নে এমনিতে ভ্যাপসা গরম, তার ওপর দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবনে হাঁসফাঁস অবস্থা। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি শহরে কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও গ্রামের অবস্থা খুবই করুণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাচ্ছে গ্রামের মানুষ।

সাম্প্রতিক এই লোডশেডিংয়ের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি সংকট। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেটর এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে চরম অবনতি হয়। যার প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ খাতে। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন সমপরিমাণ গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বাড়তে থাকে।

তবে গতকাল বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের আশার কথা শুনিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, সামিট টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খালাস করতে না পারা এবং এক্সিলারেট টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে না পারায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলা করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে আমরা একটি কৌশল নিয়েছি। আশা করছি সন্ধ্যা (গতকাল) থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে।

কমে আসছে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন: শুধু আমদানিকৃত গ্যাসই নয়; দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদনও দিন দিন কমে আসছে। দেশে অবস্থিত ২২টি প্রাকৃতিক গ্যাসকূপের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব কূপ থেকে দৈনিক উৎপাদন করা হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। চাহিদার বাকি অংশ পূরণ করতে সমপরিমাণ গ্যাস আমদানিকৃত এলএনজি থেকে মেটানো হয়।

পেট্রোবাংলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত ও সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। মার্কিন কোম্পানি শেভরনের অধীনে থাকা দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসকূপ বিবিয়ানা থেকে গত বছর উৎপাদিত হয়েছিল ৯১৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা এ বছরে নেমে এসেছে ৭৩৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। আরেক বড় গ্যাসকূপ জালালাবাদের উৎপাদনও কমে এসেছে। বছরের ব্যবধানে জালালাবাদের উৎপাদন ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট

থেকে কমে ১২৩ মিলিয়ন ঘনফুটে এসে ঠেকেছে।

লোডশেডিংয়ে অতীতের রেকর্ড ভেঙেছে: সাম্প্রতিক সময়ের লোডশেডিংয়ের তীব্রতা ভেঙে ফেলছে অতীতের রেকর্ড। বর্তমানে গড়ে লোডশেডিং হচ্ছে তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৩ সালের ২৭ জুন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল তিন হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট। গত রোববার বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। রাত ১টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। পরদিন সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগে ৩ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট।

দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। মঙ্গলবার সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ৯৭৫ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ করা হয়েছে ১৫ হাজার ৮৩৩ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ১৪২ মেগাওয়াট। গতকাল বুধবার রাত ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট।

পল্লী বিদ্যুতে লোডশেডিংয়ের চিত্র: লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি নাকাল অবস্থা গ্রামাঞ্চলে। দেশের ৮০ ভাগ গ্রামাঞ্চলের প্রায় ৪ কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ সেবা দিয়ে থাকে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। সংস্থাটির অধীনে সব জেলাতেই বর্তমানে ব্যাপক আকারে বেড়েছে লোডশেডিং, বাদ পড়েনি ঢাকাও।

তথ্য অনুসারে, পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন ঢাকা অঞ্চলে গতকাল বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৩ হাজার ৪ মেগাওয়াট, সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ১৫৯ মেগাওয়াট। লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৮৪৫ মেগাওয়াট।

একইভাবে ৪২১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে চট্টগ্রামে ৩৪৭ মেগাওয়াট; খুলনায় ১ হাজার ১৫৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৮৭৯; রাজশাহীতে ১ হাজার ৩৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৭৫৬; কুমিল্লায় ১ হাজার ৯৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৮৬৬; ময়মনসিংহে ১ হাজার ৭২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৭৩৮; সিলেটে ৪৪১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৩৪; বরিশালে ৩০২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২২৯ এবং রংপুরে ৬৫১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪৭৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।

অর্থাৎ লোডশেডিংয়ের হিসাবে ঢাকায় ২৮ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৮, খুলনায় ২৪, রাজশাহীতে ২৭, কুমিল্লায় ২১, ময়মনসিংহে ৩১, সিলেটে ২৪, বরিশালে ২৪ ও রংপুরে ২৭ শতাংশ লোডশেডিং করা হয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে পল্লীবিদ্যুতে গড় ঘাটতির পরিমাণ ২৫ শতাংশ।

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র: দেশে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশ তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক আটটি, গ্যাসভিত্তিক ৫৯টি এবং তেলভিত্তিক ৫৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে (৫৩টি ফার্নেস তেল ও তিনটি ডিজেলচালিত)। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে গ্যাস না থাকলে ১০টি কেন্দ্রে ডিজেল এবং একটি কেন্দ্রে ফার্নেস তেল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ২১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র রয়েছে ১৬টি ও তেলভিত্তিক পাঁচটি। এ ছাড়া ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে উৎপাদন কমে গেছে ৩৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক আটটি, তেলভিত্তিক ২৬টি ও কয়লাচালিত কেন্দ্র রয়েছে একটি।

দেশের আটটি কয়লাভিত্তিক বিদুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৭ হাজার ৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে একমাত্র ৫২৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র বাদে বাকি সাতটি কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

বর্তমানে কয়লা সংকটে পটুয়াখালী ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটে। কয়লা ফিডিংয়ের (সরবরাহ) কারণে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটভিত্তিক আদানি কেন্দ্র বর্তমানে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।

তবে আদানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজকালের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। এতে ফের পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে কেন্দ্রটি।

গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি সবচেয়ে করুণ: তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের ঘাটতি বাড়ায় রংপুর, সিলেট ও বরিশাল বিভাগজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে, আবার কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তা এবং বিদ্যুৎনির্ভর সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

রংপুরে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৭০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। প্রায় ৪৫০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে নগর ও গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। কয়েক দিন ধরে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বাসাবাড়িতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রায় এক ঘণ্টা পর ফিরছে, আবার কিছুক্ষণ পরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

রংপুর নগরীর সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দা মেজবাহুল হিমেল বলেন, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। শিশুদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরের কাজও ঠিকমতো করা যাচ্ছে না।

নগরীর ধাপ এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোও চাপে পড়েছে। সিটি ল্যাব কনসালটেশন সেন্টারের পরিচালক আল আমিন হাসান বলেন, নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়লেও রোগীদের ভোগান্তি পুরোপুরি এড়ানো যাচ্ছে না।

একই ধরনের সংকট বিরাজ করছে সিলেট বিভাগেও। নগর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত দিনরাত দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ মানুষ। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রতি সিলেট সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ও নগরীর টুকেরবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পিডিবির সিলেট অঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগটিতে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ২৫২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২০৭ মেগাওয়াট। ৪৫ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। পিডিবির সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে গেছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে কেন্দ্রীয়ভাবে কাজ চলছে।

সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে।

বরিশাল অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন সেখানকার গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বরিশালে দৈনিক ১১০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০ মেগাওয়াট। ফলে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের পর আরেক ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় দিনে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় লোডশেডিং হচ্ছে।

বরিশাল নগরীর কম্পিউটার ও ফটোকপি ব্যবসায়ী ইমরান বলেন, কাজের মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে যায়, আবার অনেক সময় এক ঘণ্টারও বেশি সময় আসে না। এতে গ্রাহকদের কাজ সময়মতো দেওয়া যাচ্ছে না, ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বরিশাল বিসিক শিল্প এলাকার একটি বিস্কুট কারখানার ব্যবস্থাপক আব্দুর রহমান বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। এতে ঘণ্টায় প্রায় ১৩০ লিটার জ্বালানি তেল খরচ হচ্ছে। তার পরও উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকায় দিনে-রাতে দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর অনেক এলাকায় দিনে ৬ থেকে ৮ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ফিরতে সময় লাগছে আধা ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা। কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।

পিডিবির বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, গত সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৯৫০ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ সংকটের কারণে গ্রাহক পর্যায়ে এর সুফল মিলছে না। কক্সবাজারে কোথাও কোথাও দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে পর্যটন, মৎস্য খাত ও বরফকলগুলো ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা—ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনায়ও লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।

পিডিবির ময়মনসিংহ গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুর হক জানান, সন্ধ্যার সময় ময়মনসিংহ জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ৯১ থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট।

নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন জানান, জেলার ১০টি উপজেলায় চাহিদা ১৫৯ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬৬ মেগাওয়াট। ফলে অনেক এলাকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

জামালপুরের বিভিন্ন গ্রামে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। শেরপুরেও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতির কারণে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনদুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

রাজশাহী বিভাগেও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। নেসকোর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুরে বিভাগের মোট চাহিদা ছিল ৫১৬ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৪৩২ দশমিক ৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ৭ মেগাওয়াট, যা মোট চাহিদার প্রায় ১৬ শতাংশ।

রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরের বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাবনায় দিনে ৬ থেকে ৭ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ যাচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিছু এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নাটোরের গুরুদাসপুরের কয়েকটি এলাকায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার কথা জানিয়েছেন গ্রাহকরা।

কী বলেছেন সংশ্লিষ্টরা: সার্বিক বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু কালবেলাকে বলেন, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে সমস্যারে কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছে। কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ে পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদুৎ উৎপাদনে একটা ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তবে আমরা উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি, যাতে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন কালবেলাকে বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণেই লোডশেডিং পরিস্থিতি এই আকার ধারণ করেছে। সহসাই জ্বালানির এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়। আমরা বরাবরই প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেওয়ার কথা বলে এসেছি। এখন এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে হয়তো এ সংকট সামলানো যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের বিকল্প নেই।

কালবেলা