ককটেল-হাতবোমা বিস্ফোরণ, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাসহ ২৪৮ জন। এতে বিনষ্ট হয়েছে দেশের শান্তি- এমনই অভিযোগ তুলে মামলা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির বরিশাল মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারজুক আব্দুল্লাহ। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল মহানগরের সাবেক সমন্বয়ক। যে মামলার আসামি তালিকায় চারজন মৃত আওয়ামী লীগ নেতা ছাড়াও রয়েছে বিএনপির ছয় নেতার নাম।
মামলাটির বাদী মারজুক আব্দুল্লাহ নিজেই একটি ডাকাতি মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি বলে জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাধিক নেতা। তার এমন মামলায় ক্ষুব্ধ বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, মারজুক আব্দুল্লাহ এবং এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ কয়েকজনের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ‘মামলা বাণিজ্য চক্র’ বড় অংকের অর্থ হাতাতে করেছে এই মামলা।
বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গত বৃহস্পতিবার করা হয় এই মামলা। বিচারক এস এম শরীয়ত উল্লাহ অভিযোগ আমলে নিয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনারকে তদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার জানিয়েছেন, এই নালিশী মামলায় অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মারজুক আব্দুল্লাহর করা মামলার এজাহারে ১৭১ নম্বর আসামি করা হয়েছে বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য ও সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর মজিদা বোরহানকে। ১৪৯ নম্বরে রয়েছেন নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা মো. ইউনুস। ১৫৮ নম্বরে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং ওই ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক মাসুম, ১৬৩ নম্বর আসামি ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হুমায়ন কবির, ১৬৫ নম্বরে সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর রাশিদা পারভীন এবং ১৭৪ নম্বরে রয়েছে সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর সেলিনা আক্তারের নাম।
বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম সুজন এক রাশ ক্ষোভ ঝেড়ে আগামীর সময়কে বললেন, ‘ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে আমার মা ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির বর্তমান উপদেষ্টা এবং বরিশাল সিটির সাবেক নারী কাউন্সিলর মজিদা বোরহানকে। আমার মাকে কী হিসেবে আসামি করা হয়েছে, সেটি জানার জন্য বাদীর সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি।’
বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মীর জাহিদুল কবিরের ভাষ্য, ‘শুনেছি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলায় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা ইউনুস মিয়াকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর জিয়াউল হক মাসুমসহ আরও বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা ও নেত্রীকে এ মামলায় আসামি করায় আমি হতবাক।’
এজাহারে দেখা গেছে, ৮ জন আওয়ামী লীগ নেতার নাম দুইবার করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর ইমরান মোল্লাকে ৪১ ও ৫৪ নম্বর, তারেক শাহকে ৩৮ ও ৮২ নম্বর, ছাত্রলীগ নেতা আরিফুর রহমান শাকিলকে ৩৫ ও ১৮৮ নম্বর, বরিশাল সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টুকে ৯১ ও ১৭৫ নম্বর, কাশিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কামাল হোসেন মোল্লা লিটনকে ১১৫ ও ১৭৭ নম্বর, বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকনকে ১৫১ ও ১৮৪ নম্বর, ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান বাচ্চুকে ২০ ও ২১৯ নম্বর এবং ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখর দাসকে ৭০ ও ২০৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে।কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের বরিশাল মহানগর শাখার নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এক নেতা জানালেন, মামলাটির এক নম্বর আসামি বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। তিনি জুলাই আন্দোলনের পর ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সাজ্জাদ সেরনিয়াবাত ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছেন এবং বিএম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রাশেদুল ইসলাম আকাশ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে।
এ বিষয়ে আগামীর সময়ের কথা হয় বরিশাল মহানগর বিএনপির এক যুগ্ম আহ্বায়কের সঙ্গে। অবশ্য তিনি চান না তার নাম গণমাধ্যমে প্রকাশ পাক। এই বিএনপি নেতা বলছিলেন, ‘মারজুক আব্দুল্লাহ মামলাবাজ চক্রের সদস্য। এজাহারের ঘটনাগুলো এয়ারপোর্ট থানা এলাকাতেই হয়েছে বলে উল্লেখ। সেগুলোর কোনোটি বিএনপি বা ছাত্রদলের নেতারা জানেন না। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এয়ারপোর্ট থানার ওসি মিজানুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেই মারজুকসহ চার সদস্যের একটি চক্র আদালতে মামলাটি করেছে। মামলা বাণিজ্য করতে গিয়ে এবার মৃত মানুষ ও আমাদের দলের লোকজনকেও আসামি করেছে।’
জানেতে চাইলে বরিশাল মহানগরীর এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বললেন, ‘মামলার এজাহারের কপি এখনও হাতে পাইনি। ঘটনাস্থল আমার থানা এলাকায় উল্লেখ করেছে কি-না জানি না, মামলার বাদীকেও চিনি না।’
তবে আসামির তালিকায় চারজন প্রয়াত ব্যক্তির নাম যুক্ত করায় অভিযোগের সত্যতা ও মামলার উদ্দেশ্য নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। ২১২ নম্বর আসামি খন্দকার রেজাউর ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি, ১৯৮ নম্বর আসামি আবুল ফারুক ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ, ২২৫ নম্বর আসামি হাফিজুর রশিদ ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর এবং ১৯৫ নম্বর আসামি আলী হাওলাদার একই বছরের ২৬ জুলাই মারা যান। অথচ এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা চলতি বছরের জুন মাসে মিছিল করে ককটেল ও হাতবোমা ছুড়েছেন।
অবশ্য মামলার বাদী মারজুক আব্দুল্লাহ নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে অভিযোগের এমন অসঙ্গতির জন্য দায় চাপালেন সাক্ষীদের উপর। তিনি আগামীর সময়কে বলেন, ‘সাক্ষীদের দেওয়া ভুল তথ্যের কারণে এমনটা হয়েছে। আবার আমাকে বিতর্কিত করতে একটা চক্র এমনটা করে থাকতে পারে।’
বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানালেন বরিশাল মেট্রেপলিটন পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ। ‘মামলায় যেসব ঘটনা ও সময় উল্লেখ করা হয়েছে সে সময়ে এমন ঘটনা ঘটেছে কি না পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।’