ভারতীয় একাধিক সংবাদমাধ্যমে ফটোকার্ড ছড়িয়ে দাবি করা হয়েছে, “বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন, দেশের স্কুলগুলিতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে চীনের ভাষা ম্যান্ডারিন বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা হিসেবে চালু করা হবে।”
এখন কলকাতা, মেঘ আপডেট, ইনফোম্যান্স, ScoopWhoop, Resonant News, Globe Pulse সহ একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে একই ধরনের দাবি প্রচার করেছে।
পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টেও বিষয়টি নিয়ে কটাক্ষ করে পোস্ট করতে দেখা গেছে। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে ও এখানে।
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভারতীয় মিডিয়ায় প্রচারিত দাবিটি বিভ্রান্তিকর। কারণ বাংলাদেশ সরকার কোথাও শুধু ম্যান্ডারিন ভাষাকে বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা হিসেবে চালুর ঘোষণা দেয়নি। বরং বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে চাহিদাসম্পন্ন একাধিক ভাষার মধ্য থেকে একটি তৃতীয় ভাষা শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর মূলত নির্বাচনী ইশতেহারেই তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলকের বিষয়টি ছিল।
ইশতেহারের ‘শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন’ অংশে বলা হয়েছে, ‘‘বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা: দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, জাপানিজ, কোরিয়ান, ইতালিয়ান, ম্যান্ডারিন ইত্যাদি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা মাধ্যমিক পর্যায় থেকে চালু করা হবে।’’ অর্থাৎ ইশতেহারেও কোনো একটি ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়নি; বরং একাধিক ভাষাকে সম্ভাব্য তৃতীয় ভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সুরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বিষয়টি তুলে ধরেন।
আমির খসরু বলেন, ‘‘বাংলাদেশকে একটি দক্ষতানির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালু করা হবে। শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা যেমন জাপানিজ, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ইত্যাদি কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ লক্ষ্যে আমাদের সরকার তৃতীয় ভাষা জ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে সেই সকল দেশে উচ্চশিক্ষায় গমনেচ্ছুদের ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা প্রদান করছে।’’
অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যেও স্পষ্টভাবে জাপানিজ, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মানসহ একাধিক ভাষার কথা বলা হয়েছে। কোথাও শুধুমাত্র ম্যান্ডারিন ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
একই নীতির কথা উল্লেখ করেন তারেক রহমানও। গত ২৯ জুন সংসদে বাজেট আলোচনায় বক্তব্যের ৪৯ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ক্লাস সিক্স থেকে পর্যায়ক্রমিকভাবে কারিগরি শিক্ষা, বাংলা এবং ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা আমরা ইন্ট্রোডিউস করতে চাই।’’
চীন সফরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘‘তাদেরকে যখন বলেছি যে, আমরা চাই আমাদের ছেলেমেয়েদের ম্যান্ডারিন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখাতে। তারা অত্যন্ত খুশি হয়েছে এবং তারা বলেছে তারা তাদের ল্যাঙ্গুয়েজ শিখাবে। সফরে আমি যা দেখে এসেছি যে, আমরা যদি আমাদের সন্তানদেরকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে কয়েকটি ভাষার মধ্যে যদি… যেহেতু আসলাম আমি মাত্র চায়না থেকে এসেছি সেই জন্যই ম্যান্ডারিনের কথাটাই বলেছি। এই ভাষা আমরা শিখাতে পারি। আমি ব্যক্তিগতভাবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমাদের প্রজন্মের বহু মানুষকে আমরা সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করে দিতে সক্ষম হবো।’’
তার বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, তিনি ম্যান্ডারিনকে তৃতীয় ভাষার একটি সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমনকি তিনি নিজেই বলেছেন, ‘‘যেহেতু আসলাম আমি মাত্র চায়না থেকে এসেছি সেই জন্যই ম্যান্ডারিনের কথাটাই বলেছি।’’ অর্থাৎ এটি কোনো নীতিগত ঘোষণা নয় যে শুধুমাত্র ম্যান্ডারিনই বাধ্যতামূলক হবে।
একইভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এবং সরকারের অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্যেও তৃতীয় ভাষা চালুর কথা বলা হলেও কোথাও শুধু ম্যান্ডারিন ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, ‘‘বাংলাদেশে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শুধু ম্যান্ডারিন ভাষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে’’ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত দাবিটি বিভ্রান্তিকর। বরং বাংলা-ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে সরকার।