Image description

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি বিএনপি। দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। কেউ বলছেন, ব্যক্তিপরিচয়ে নির্বাচনের সুযোগ থাকা উচিত। আবার কেউ মনে করছেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীকে ভোটে অংশ নিতে দেওয়া উচিত নয়।

সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ভোট সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি।

বিশেষ করে তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। যদিও পরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে নিজের আগের অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে আসেন।

গত ১০ জুন তথ্য উপদেষ্টা বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অংশ নিতে পারবেন। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিএনপির একাধিক নেতা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, এটি তথ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত মতামত, দল বা সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়।

জাহেদ উর রহমানের ওই বক্তব্যের পর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলটির নেতারা একদিকে নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া ও জনমতের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার ওপর জোর দিচ্ছেন।

যা বলছেন বিএনপি নেতারা

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের বিষয়ে কথা হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা তৃণমূলের গণতন্ত্র ও জনগণের ক্ষমতায়নের ভিত্তি। তাই এই নির্বাচন দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত হওয়া উচিত। বর্তমানে আইন অনুযায়ী ব্যক্তিপরিচয়ে যে কেউ ভোটে অংশ নিতে পারেন। ফলে কোনো নির্দিষ্ট দল অংশ নেবে কি না, সেটির চেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্ত হচ্ছে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন করার। সুতরাং ভোট করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই মুহূর্তে একটি নিষিদ্ধ দল। আইনগতভাবে তাদের নিষেধাজ্ঞা এখনও প্রত্যাহার হয়নি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের নির্বাচন করার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। আগে আইনগতভাবে তাদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হতে হবে। তারপর তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।’

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যারা বিগত ১৬ বছর গণতন্ত্রকে তছনছ করেছে, উন্নয়নের নামে লুটপাট করে দেশকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়েছিল, তারা নিজেদের অপকর্মের ফলেই নিষিদ্ধ হয়েছে। মূলত আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ দল। সরকারের অনুমতি ছাড়া তাদেরকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া সমুচিত হবে না।’

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে তাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।’


বিএনপি চেয়ারম্যানের আরেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। তাই ব্যক্তি হিসেবে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে এবং জনগণ বাধা না দিলে বিএনপি সেখানে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কারও রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করার পক্ষে নয়। যে ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, তিনি যদি সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিগত বছরগুলোতে অন্যায় না করে থাকেন, তবে জনগণ নিশ্চয়ই তাকে বাধা দেবে না।’

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাইনুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বিগত ১৬ বছর যে ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, সে কারণেই তাদের দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। তারা যে অন্যায়-অত্যাচার করেছে, সেই অপকর্মের জন্য তারা এখনও অনুতপ্ত নয়। এ দেশের জনগণ এটি ভালোভাবে নেয়নি। তাদের আগে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। জনগণই তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন আইনজীবী নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনও আইনগতভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আদালত যদি এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেন, তাহলে সেটি বিবেচনার বিষয় হবে। তবে অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে জনগণের মধ্যে এখনও দলটির প্রতি এখনও তীব্র বিরূপ মনোভাব রয়েছে।

শঙ্কা দেখছেন তৃণমূলের নেতারা

বিষয়টি নিয়ে বিএনপির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও এক ধরনের উদ্বেগ দেখা গেছে। মাঠপর্যায়ের নেতাদের মতে, আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া কোথাও কোথাও জামায়াত ও এনসিপি আওয়ামী লীগের সঙ্গে পরোক্ষভাবে কাজ করতে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। তবে দলটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর খুব বেশি সময় পেরোয়নি। জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তের দাগ এখনও শুকায়নি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে এই মুহূর্তে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সমীচীন হবে না।’

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামে বিষয়টি নিয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অবস্থান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সময়ে দলীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানানো হতে পারে।

বিএনপির একাধিক নেতা এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে নিয়ে আইনি বিতর্কের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই, তৃণমূলের মতামত সংগ্রহ এবং নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণের কাজ পুরোদমে চলছে। তবে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের প্রশ্নে দলীয় ফোরামে আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।