Image description

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে শনিবার (২৩ মে) ঐতিহাসিক ময়মনসিংহের ত্রিশালে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার আগমনকে কেন্দ্র করে যেন নতুন করে জেগে উঠেছে নজরুলের স্মৃতিধন্য জনপদ ত্রিশাল। উৎসবের রঙে রাঙানো হয়েছে দরিরামপুর নজরুল মঞ্চ, নজরুল একাডেমি মাঠ, কবির স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিস্তীর্ণ এলাকা। তবে শুধু উৎসব নয়; প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে বহু বছরের অবহেলা, বঞ্চনা ও উন্নয়ন প্রত্যাশার কথাও এবার উচ্চকিত হয়ে উঠেছে ময়মনসিংহবাসীর কণ্ঠে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান।

ত্রিশালের মানুষ বলছেন, জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদ কেবল একটি উপজেলা নয়; এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। এখানকার দরিরামপুর হাই স্কুল, কাজীর শিমলা, শুকনি বিল, নজরুল বটবৃক্ষ কিংবা নামাপাড়া সবখানেই ছড়িয়ে আছে বিদ্রোহী কবির শৈশব, সাহিত্যচর্চা ও মানবতার বীজ। অথচ বছরের পর বছর ধরে এসব ঐতিহাসিক স্থান রয়ে গেছে অযত্ন, অবহেলা ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার শিকার। তাই প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে এখন নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে— ‘ত্রিশালকে নজরুল সিটি ঘোষণা করতে হবে’, ‘আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্থাপন করতে হবে’, ‘নজরুল স্মৃতি কেন্দ্রকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে’।

এদিকে শনিবার বিকাল সাড়ে ৩টায় ত্রিশালের দরিরামপুর নজরুল মঞ্চে জাতীয় পর্যায়ের তিন দিনব্যাপী জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে তিনি বৈলর ইউনিয়নের ঐতিহাসিক ধরার খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

স্থানীয়রা বলছেন, এই খাল শুধু একটি খাল নয়; এটি ত্রিশালের কৃষি ও জনজীবনের ইতিহাসের অংশ। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান যে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন, প্রায় ৪৭ বছর পর সেই একই স্থানে এসে তার পুত্রের পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধন করাকে ঘিরে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে পুরো এলাকায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ত্রিশালের সর্বত্র এখন সাজ সাজ রব। রঙিন তোরণ, আলোকসজ্জা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বদলে গেছে পুরো জনপদ। নজরুল একাডেমি মাঠে বসেছে বইমেলা ও নজরুল মেলা। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ একযোগে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বহু বছর পর জাতীয় পর্যায়ে জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান ত্রিশালে আয়োজন হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।

তবে উৎসবের আড়ালেও রয়েছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। কবির স্মৃতি সংরক্ষণের নামে প্রতিষ্ঠিত দরিরামপুর ও কাজীর শিমলার স্মৃতি কেন্দ্রগুলো এখন অনেকটাই অবহেলিত। দেয়ালে চিড়, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান পাণ্ডুলিপি, অচল সিসিটিভি, পুরোনো প্রদর্শনী আর দর্শনার্থীদের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাব সবমিলিয়ে জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে হতাশ স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও গবেষকরা।

অনেকেই বলছেন, নজরুলের নামে অনুষ্ঠান আয়োজনের চেয়ে তার স্মৃতি ও দর্শন সংরক্ষণই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

স্থানীয় শিক্ষিকা ফারহানা জামান বলেন, দরিরামপুর হাই স্কুল, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল স্মৃতি কেন্দ্রকে সমন্বিত করে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলা হোক।

অপরদিকে ‘নজরুল ট্রেইল’ নামে একটি পর্যটন সার্কিট চালু করলে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও গবেষকদের কাছে ত্রিশাল নতুন পরিচয়ে উঠে আসবে বলে মনে করছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গবেষকরা।

এদিকে ত্রিশালবাসীর উন্নয়ন দাবির তালিকাও দীর্ঘ। আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দশ লেনে উন্নীতকরণ, ইপিজেড ও শিল্পাঞ্চল স্থাপন, যুব ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আধুনিক কোল্ডস্টোরেজ, সুতিয়া নদীর দুই পাড়ে ওয়াকওয়ে ও পার্ক, ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর বেইলি ব্রিজ নির্মাণসহ বিভিন্ন দাবি এখন জনমুখে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলে ত্রিশাল শুধু নজরুলের স্মৃতিধন্য জনপদ হিসেবেই নয়, উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

ময়মনসিংহের কবি সাহিত্যিক ফরিদ আহমেদ দুলাল জানান, নজরুল শুধু একজন কবি নন, তিনি আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। তাই আজকের এই সফরকে কেবল একটি রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়রা। তাদের আশা- এই সফরের মধ্য দিয়েই হয়তো নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে নজরুলের ত্রিশাল, সংরক্ষিত হবে ইতিহাস, আর পূরণ হবে বহুদিনের উন্নয়নের স্বপ্ন।

ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে সব প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।