Image description

ভারতের অন্ধকার জগতের ‘ডি কোম্পানির’ আদলে খুলনায় নিঃশব্দে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর মাফিয়া নেটওয়ার্ক ‘বি কোম্পানি’। এ অপরাধ সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী বাবু ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’। ২০১০ সালে আলোচিত জাহাঙ্গীর হোসেন কচি হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এবং দীর্ঘদিন ধরে পলাতক এ গ্যাংস্টার নগরজুড়ে দ্বৈত কৌশল বা ‘ডাবল গেম’ খেলছেন। একদিকে ত্রাস, ধারাবাহিক খুন, চাঁদাবাজি ও চোরাচালানের একচ্ছত্র রাজত্ব, অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের মধ্যে চাল-ডাল বিতরণ বা ‘নবাব’ ছদ্মনামে বিনামূল্যে শরবত খাওয়ানোর মতো সামাজিক কর্মকাণ্ড—এ দুই বৈপরীত্যের আড়ালে মূলত নিজের ভয়ংকর অপরাধের চেহারা ঢাকতে চাইছেন এই ডন। নিজেকে গরিবের ‘রবিনহুড’ বা ‘ত্রাতা’ হিসেবে জাহির করার এ নতুন ধরন খুলনা নগরবাসীর মনে তীব্র আতঙ্ক আর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানির’ যে নৃশংস রূপটি বেরিয়ে আসে, তা শিউরে ওঠার মতো। গত এক বছরে খুলনায় সংঘটিত অন্তত ৬০টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ২১টির সঙ্গেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত এ গ্রেনেড বাবু গ্রুপ। যার অর্থ, নগরীর প্রতি তিনটি খুনের একটির পেছনে রয়েছে এ মাফিয়া চক্রের হাত। আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই এ রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে তারা।

চলতি বছরের মার্চে এ বাহিনীর বিরুদ্ধে খুলনায় অন্তত তিনটি বড় ধরনের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গত ৪ মার্চ ডাকবাংলো মোড়ে শ্রমিক দল নেতা মাসুম বিল্লাহকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর জনতা এক শুটারকে ধাওয়া করে আটক করে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করে, স্বয়ং গ্রেনেড বাবুর সরাসরি নির্দেশেই এ মিশন সম্পন্ন করা হয়েছিল। এরপর কাস্টম ঘাটে ইমরান হত্যাকাণ্ড এবং আদালত চত্বরে ফিল্মি স্টাইলে গুলি ও বোমা হামলার পেছনেও এ ‘বি কোম্পানির’ কিলিং স্কোয়াডের সম্পৃক্ততার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান আমার দেশকে বলেন, গ্রেনেড বাবু নামে যে পরিচিত, তার কোনো অস্তিত্ব খুলনা শহরে নেই। কেউ কেউ বলে সে মালয়েশিয়ায় থাকে, কেউ বলে ভারতে আধার কার্ড করেছে। তার অনুসারীরা এখানে কাজ করে। ওদের বিস্তৃতিটা মেট্রোতে নয়, জেলার রূপসাকেন্দ্রিক।

 

আন্ডারগ্রাউন্ড ডনের ‘রবিনহুড’ কৌশল

গ্রেনেড বাবুর অপরাধের জাল কতখানি বিস্তৃত, তার প্রমাণ মেলে গত বছরের জুনে শামসুর রহমান রোডে তার বাড়িতে যৌথবাহিনীর হাই-ভোল্টেজ অভিযানে। সে অভিযানে তার বাড়ি থেকে একটি ওয়ান শুটারগান, তাজা গুলি, বিপুল দেশি-বিদেশি মুদ্রা, মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই উদ্ধার করা হয়। অপরাধের এ বিশাল অর্থনৈতিক ও সামরিক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে গ্রেনেড বাবু শুধু অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছেন না, বরং নিম্নআয়ের মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।

কাস্টম ঘাট, চানমারি, ২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের অসচ্ছল মানুষের মধ্যে চাল-ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিতরণ করে নিজের একটি অনুগত বাহিনী তৈরি করছেন তিনি, যার ভিডিও পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি গত এপ্রিলে শিববাড়ী মোড়ে ‘নবাবের’ পক্ষ থেকে ব্যানার টাঙিয়ে বিনামূল্যে শরবত বিতরণের যে আয়োজন করা হয়েছিল, গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায় সে ‘নবাব’ আসলে পলাতক গ্রেনেড বাবুরই নতুন আন্ডারগ্রাউন্ড পরিচয়। তবে পুলিশও বসে নেই। গত ১৯ এপ্রিল বিকালে সেখান থেকেই ‘বি কোম্পানির’ দুর্ধর্ষ সদস্য ও অস্ত্র মামলার আসামি মো. সাঈদুর এবং শরবতের ভ্যানচালককে আটক করে সোনাডাঙ্গা মডেল থানা পুলিশ।

 

আদালত চত্বরে রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, গ্রেনেড বাবুর এ রক্তক্ষয়ী উত্থানের পেছনে খুলনার অপরাধ জগতের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং পুলিশের সীমাবদ্ধতাও সমানভাবে দায়ী। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর খুলনার আন্ডারওয়ার্ল্ড এখন আরো বেপরোয়া। মাদক, স্বর্ণ ও অস্ত্রের যে কোটি কোটি টাকার চোরাচালান রুট রয়েছে, সেখানে গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানি’ একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে পথের কাঁটা মনে করছে। সম্প্রতি খুলনা জেলা কারাগারে গ্রেনেড বাবুর সমর্থকদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী পলাশ গ্রুপের আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাটি এর বড় প্রমাণ। সে সংঘর্ষে দুপক্ষের ১৪-১৫ জন আহত হলে কারা কর্তৃপক্ষ পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

কারাগারের ওই সংঘর্ষের প্রতিশোধ নিতেই গত বছরের ৩০ নভেম্বর দুপুরে আদালতের প্রধান গেটের সামনের সড়কে পলাশ বাহিনীর দুই সদস্য হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজনকে গুলি ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে খুন করে গ্রেনেড বাবুর ক্যাডাররা। পুলিশ ভিডিও ফুটেজ দেখে খুনিদের চিহ্নিত করলেও চরম অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করে।

অভ্যন্তরীণ সূত্রের খবর, বর্তমানে পুলিশ কেবল রাবার বুলেট ও লাঠি নিয়ে ডিউটি করছে, যার সুবাদে আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত ‘বি কোম্পানির’ খুনিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

 

সাত বাহিনীর দৌরাত্ম্য, পুলিশের উদ্বেগ

খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, একসময় খুলনা-২ আসনের সাবেক এক সংসদ সদস্য এবং ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক এক কাউন্সিলরের শেল্টারে থেকে ‘রোহান’ ও ‘পলাশ’ গ্রুপ নামে কিশোর গ্যাং অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করত। রাজনৈতিক আশ্রয় ভেঙে যাওয়ার পর এটি মূলত তিনটি বাহিনীতে রূপ নেয়—পলাশ বাহিনী, গ্রেনেড বাবু বাহিনী এবং নুর আজিম বাহিনী। এর বাইরে দৌলতপুরের শীর্ষ চরমপন্থি হুমায়ুন কবীর হুমা, আরমান শেখ ওরফে আরমিন এবং নাসিমুল গণি ওরফে নাসিমের আলাদা বাহিনী রয়েছে।

 

শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত নাসিম গত ২৮ নভেম্বর জামিন পান। অন্যদিকে আরমিন হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে খুলনার নতুন কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। দুই চরমপন্থির এ মুক্তিতে জনমনে তীব্র আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বর্তমানে গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানি’সহ সাতটি সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় থাকায় চরম উদ্বেগে রয়েছে পুলিশ।

কেএমপির গোয়েন্দা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেনেড বাবু ও তার বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করতে তাদের বিশেষ টিম মাঠে কাজ করছে। তবে ত্রাণের আড়ালে থাকা এ মাফিয়া নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা এখন খুলনার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।