এলাকায় ‘ছোটু নাদিম’ নামেই বেশি পরিচিত নাদিম কোরাইশি। বয়স ৫৫। সৈয়দপুর মাংস ব্যবসায়ী সমিতির তিনি সভাপতি। ঈদের আগের দিন ১০ জনের একটি দল নিয়ে বিমানে ঢাকায় যাবেন তিনি। টিকিটও কাটা হয়ে গেছে।
ছোটু নাদিম বললেন, ‘আমাদের বাপ-দাদারাও কোরবানির ঈদে ঢাকায় কাজ করতে যেতেন। এখনো মানুষ আমাদের ডাকেন। চামড়া ছাড়ানো থেকে শুরু করে মাংস পিস করা, হাড় আলাদা করা—সব কাজেই দক্ষতা লাগে। ছোটবেলা থেকেই এসব কাজ শিখে বড় হয়েছি আমরা।’
ঈদুল আজহার সময় ঘনিয়ে এলেই সৈয়দপুর শহরসহ বিভিন্ন এলাকার মাংসপট্টিতে শুরু হয় অন্য রকম ব্যস্ততা। হাটের কোলাহলের পাশাপাশি বাড়তে থাকে কসাইদের ঢাকামুখী প্রস্তুতি। প্রতিবছরের মতো এবারও সৈয়দপুর থেকে শতাধিক কসাই রাজধানীতে ছুটবেন কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার কাজে। কেউ যাবেন বাসে, কেউ ট্রেনে, অনেকে আবার বিমানযোগেও যাবেন। ঈদের কয়েকটি দিন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে গরু বানানোর কাজ শেষ করে তাঁরা নিজ শহর সৈয়দপুরে ফিরবেন।
ছোটু নাদিমের মতো এই কসাইদের বড় একটি অংশ বিহারি। বংশপরম্পরায় মাংস ব্যবসা ও কসাইয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত। পশু জবাই ও মাংস কাটায় তাঁদের আলাদা দক্ষতা আছে। ঢাকায় তাঁদের আলাদা চাহিদা তৈরি হয়েছে।
ছোটু নাদিমের মতে, কসাইয়ের কাজটিও একধরনের শিল্প। নিখুঁতভাবে পশু জবাই, চামড়া অক্ষত রেখে ছাড়ানো কিংবা সুন্দরভাবে মাংস ভাগ করা— প্রতিটিতেই প্রয়োজন দক্ষতা।
বাবার হাত ধরে প্রায় ২০ বছর আগে কসাইয়ের কাজে নামেন ছোটু। এরপর থেকে প্রতি ঈদেই ঢাকায় আসছেন। রাজধানীর অভিজাত অনেক পরিবারের বাড়িতে কাজ করেছেন। একসময় ঢাকার সাবেক মেয়র ও মন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকার বাসাতেও কোরবানির গরু জবাই করেছেন। ছোটু জানান, তাঁদের থাকার ব্যবস্থাও করে দিতেন খোকা।
গত বছর চার সহযোগী নিয়ে ঢাকায় ১২টি গরু জবাই করেছিলেন ছোটু। সব মিলে আয় হয়েছিল প্রায় ২ লাখ টাকা। সহযোগীদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে দেন তিনি। যাতায়াত খরচও নিজেই বহন করেন।
এবার সদস্য বেড়ে হয়েছে ১০ জন। দলটিকে তিন ভাগে ভাগ করে কাজ করার পরিকল্পনা। ইতিমধ্যে অনেক পরিবারই তাঁদের বুকিং দিয়ে রেখেছে।

ছোটু নাদিমের মতো সৈয়দপুর পৌর মাংসহাটির কসাই ফজলে রাব্বি, নওশাদ আলী ও খয়রাত হোসেনও যাচ্ছেন পৃথক দল নিয়ে। স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সি থেকে তাঁরা বিমান টিকিটও কিনেছেন। ফজলে রাব্বি বলেন, ‘ঈদের আগে ঢাকাগামী বিমানে যাত্রী কম থাকে। কারণ, তখন সবাই ঢাকা থেকে সৈয়দপুরে আসেন। তাই বিমান কোম্পানিগুলো ভাড়া কমিয়ে দেয়। আমরা সেই সুযোগটা কাজে লাগাই।’
বাড়তি আয়ের আশায়
মো. মিন্টু কসাইয়ের কণ্ঠে ঈদের অন্য রকম বাস্তবতা। তিনি বলেন, ‘সবাই পরিবার নিয়ে ঈদ করতে চায়। কিন্তু আমরা বাড়তি টাকার আশায় ঢাকায় যাই। ঢাকায় মাংস কাটার রেট অনেক বেশি।’
তাঁর ভাষ্য, সৈয়দপুরে ১ লাখ টাকা দামের একটি গরু বানিয়ে সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা পাওয়া যায়। অথচ ঢাকায় একই কাজের জন্য পাওয়া যায় ২০–২৫ হাজার টাকা। একজন অভিজ্ঞ কসাই ঈদের তিন দিনে অন্তত ১০টি গরুর মাংস কাটতে পারেন। ফলে তিন দিনের কাজ শেষে অনেকে ভালো অঙ্কের আয় করে বাড়ি ফেরেন।
ঢাকার অনেক পরিবার এখন সৈয়দপুরের কসাইদের নাম ধরেই চেনেন। অনেকের মোবাইল নম্বরও সংরক্ষিত থাকে তাঁদের কাছে। সৈয়দপুর শহরের কারখানা গেট বাজারের কসাই মোস্তাকিম বলেন, ‘আগে আমার বাবা ঢাকায় যেতেন। মূলত গুলশান-বনানীর বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টে কাজ করতেন। তিন বছর ধরে আমি বাবার দেওয়া ঠিকানায় যাচ্ছি। ওই অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।’
ঈদ শেষে আবার কেউ বিমানে, কেউ বাস বা ট্রেনে করে ফিরে আসেন। শুরু হয় পুরোনো জীবনের ব্যস্ততা।