Image description

চলতি শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় ঠিকমতো পানি উঠছে না বাড়ির নলকূপে। এক হাজার লিটারের একটি ট্যাংক পূর্ণ করতে মোটর চালাতে হচ্ছে দুই ঘণ্টা। এতে বিরক্ত হয়ে বাড়ির ভাড়াটিয়ারা গেছেন চলে। দুই মাস ধরে এমন তীব্র পানি সংকটে ভুগছে খুলনা সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের (ফুলবাড়িগেট এলাকা) বাসিন্দা আমেনা আক্তার রুনুর পরিবার। এমন ভোগান্তিতে আছে আশপাশের আরও ১৪ পরিবার। বিকল্প হিসেবে ওয়াসার সংযোগ পাওয়ার জন্য সবাই একসঙ্গে আবেদন করলেও সংযোগ পাননি তারা।

প্রতিষ্ঠার ১৮ বছরেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি খুলনা ওয়াসা। ওয়াসার তথ্য বলছে, এখনো পানির সংযোগ পায়নি বা পানির সেবার আওতায় আসেনি সিটি করপোরেশনের প্রায় ৭৭ হাজার হোল্ডিংয়ের তিন ভাগের এক ভাগ বাড়ি। বিশেষ করে পানি সেবা নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে নগরীর লবণচরা, গল্লামারী এবং সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ডের অলিগলির অনেক হোল্ডিং। কিন্তু এসব এলাকায় পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং ওয়াসার পানির সংযোগ না পাওয়া— এ দুই সংকটে এলাকাবাসীকে সহ্য করতে হচ্ছে অবর্ণনীয় কষ্ট। এ ছাড়া আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও বিতরণ নেটওয়ার্ক ভুল নকশায় ত্রুটিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। এতে বাড়িঘরের সংযোগেও কমে গেছে পানি সরবরাহ। সবমিলিয়ে অনেকেই পানির জন্য বাধ্য হয়ে ভূগর্ভে বসাচ্ছে পাম্প।

২০০৮ সালে খুলনা ওয়াসা প্রতিষ্ঠার পর ৮৪টি গভীর নলকূপে প্রতিদিন চার কোটি লিটার পানি উৎপাদন হতো, যা দিয়ে ১৫ হাজার গ্রাহককে সেবা দেওয়া হতো। ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির পানি উৎপাদন ও গ্রাহকসেবার পরিধি ছিল একই। তবে ৮৪টি গভীর নলকূপের মধ্যে এখন চালু রয়েছে ৩৮টি, যা দিয়ে উৎপাদন হচ্ছে দুই কোটি লিটার পানি।

অন্যদিকে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা ওয়াসার মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১১ সালে। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে ওই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। এরপর প্রকল্পের আওতায় বাগেরহাটের মোল্লাহাটের মধুমতী নদী থেকে পানি আনা হচ্ছে রূপসার সামন্তসেনা এলাকার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে। এখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি নেওয়া হচ্ছে নগরীর সাতটি রিজার্ভার ও ১০টি ওভারহেড ট্যাংকে। সেখান থেকে শহরের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক স্থাপনের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে ছয় কোটি লিটার পানি।

কিন্তু গ্রাহকদের অভিযোগ, বাস্তবায়িত এ মেগা প্রকল্পের সংযোগে ঠিকমতো পানি পাচ্ছেন না তারা। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াসা প্রকৌশলীদের নিজস্ব অনুসন্ধানে উঠে এসেছে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতার চিত্র। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পানির ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক সিস্টেম ভুল ডিজাইনে ত্রুটিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে। ত্রুটির মধ্যে অন্যতম ৯০০ মিলিমিটার মূল পাইপলাইনের সঙ্গে মাত্র ৩৫০ মিলিমিটার দেওয়া হয়েছে সাইড পাইপের সংযোগ। এ কারণে শহরের অনেক এলাকায় ঠিকমতো পানি সরবরাহ হচ্ছে না। অনেক গ্রাহক সংযোগ নিলেও খুব কম পানি পাচ্ছেন। ফলে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা।

নগরীর টুটপাড়ার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এলাকায় ওয়াসার লাইনে অল্প অল্প করে সারা দিন যা পানি আসে, তা দিয়ে পরিবারের চাহিদা মেটে না। গরমে দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে অনেক গ্রাহক সাবমারসিবল পাম্প নিচ্ছে বসিয়ে।

পাইপলাইনে ঠিকমতো পানি না আসা বা পানি কম পাওয়ার কষ্টের সঙ্গে লোনাপানির বিষয়টি যোগ করেছেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ও পরিবেশবাদী কর্মী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার। তিনি বলেছেন, মধুমতীতে পানি কমেছে, বেড়েছে লবণাক্ততা। গ্রীষ্ম মৌসুমে কমপক্ষে দুই মাস পানির লবণাক্ততা থাকে। অথচ বিপুল টাকা ব্যয়ে মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে সেই লোনাপানি আনা হয়েছে খুলনায়। গ্রাহকদের কাছে টাকার বিনিময়ে সেই পানি বিক্রি করা হচ্ছে। এতে মানুষ নানা অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে, বাড়ি ও বাড়ির অাসবাব হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত, যা খুবই উদ্বেগজনক। তাই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে লোনাপানি মিষ্টি পানিতে রূপান্তিত করে গ্রাহকের কাছে সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন খুলনা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকৌশলী-১) রেজাউল ইসলাম। তিনি বলেছেন, খুলনা মহানগরীতে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বসবাস। বিশাল এ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিদিন পানির চাহিদা ১৪ কোটি লিটার। কিন্তু ডিপ টিউবওয়েলের মাধ্যমে দুই কোটি লিটার এবং প্রকল্পের মাধ্যমে ছয় কোটি লিটার পানি হচ্ছে সরবরাহ। বাকি আট কোটি লিটার পানির চাহিদা পূরণে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন মেগা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক কমিটি। এরই মধ্যে চলছে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের টেন্ডার কার্যক্রম।

রেজাউল ইসলাম জানালেন, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে পুরনো প্রকল্পের ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও পুকুরগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়ানো হবে। ধারণক্ষমতা বাড়লে খরা মৌসুমে বেশি দিন বেশি পানি জমিয়ে রেখে লবণের ঘনত্ব কমানো সম্ভব হবে। এ ছাড়া নতুন এলাকায় পাইপলাইন স্থাপন করে গ্রাহক বাড়ানো হবে।

ফলে দ্রুত পানির সংকট নিরসন ও লোনা সমস্যা কিছুটা কেটে যাবে— রয়েছে এমন প্রত্যাশা।