ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। এবারের পথচলায় অনেক সতর্ক দলটি। কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি চায় না বিএনপির হাইকমান্ড। বিশেষ করে, সরকারের সঙ্গে দলের একীভূত হয়ে যাওয়ার পক্ষে নন কোনো নেতাই। সে কারণে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের পর এবার মিশন— দল গোছানো।
কাউন্সিল সামনে রেখে কোরবানির ঈদের পর সংগঠন পুনর্গঠনে পুরোদমে নামছে বিএনপি। এবারের মূল চমক হবে— যারা সরকারের মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হয়েছেন, তারা থাকতে পারবেন না দল ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পদে। তাদের বাইরে রেখেই গঠন করা হবে নতুন কমিটি। আর কাউন্সিলের মাধ্যমে মহাসচিব এবং স্থায়ী কমিটিসহ পুনর্গঠন করা হবে সব গুরুত্বপূর্ণ পদ।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানালেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই হবে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল। বিএনপির সবশেষ কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। সে সময় গঠিত হয়েছিল ৫০২ সদস্যের নির্বাহী কমিটি। এ ছাড়া ১৯ সদস্যের জাতীয় স্থায়ী কমিটি এবং চেয়ারম্যানের (তৎকালীন চেয়ারপারসন) ৮৫ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদও গঠন হয়। পরে আর কাউন্সিল না হলেও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বহিষ্কার, নিষ্ক্রিয়তা কিংবা মৃত্যুর কারণে পূরণ করা হয় শূন্য হওয়া বেশ কিছু পদ। যদিও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কাউন্সিল হওয়ার কথা প্রতি তিন বছর পর। কিন্তু নানান কারণে তা সম্ভব হয়নি।
সবশেষ কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এখন নতুন কাউন্সিলের আগেই নতুন নেতৃত্ব আসবে তৃণমূল এবং অঙ্গসংগঠনগুলো। বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক জেলার অর্ধেকের বেশি এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। অন্যদিকে, দলের ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই মেয়াদ শেষ। মেয়াদ আছে শুধু যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির। তবে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলের শীর্ষ নেতারা এখন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য। তারা সরকারি কাজে ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে ব্যস্ত থাকায় আশানুরূপ সময় দিতে পারছেন না সংগঠনে। যে কারণে ব্যাহত হচ্ছে তৃণমূলের ধারাবাহিকতা। তাই খোঁজা হচ্ছে রাজপথের পরীক্ষিত ও অনুগত নেতাদের। এরই মধ্যে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান কমিটি পুনর্গঠনে দায়িত্বশীল নেতাদের নিয়ে কাজ করছেন বলে জানতে পেরেছে আগামীর সময়। আর নতুন কমিটির আভাস পেয়ে উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মীরা, জোর তদবির শুরু করেছেন পদপ্রত্যাশীরা।
একটু পেছনে ফিরে আওয়ামী লীগ আমলের দিকে তাকালে দেখা যাবে, টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলকে একীভূত করে ফেলেছিল সরকারের সঙ্গে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সাংগঠনিক গতিশীলতার দিকে হাইকমান্ডের ছিল না তেমন কোনো মনোযোগ। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কমিটিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকত বছরের পর বছর। একই পদে দীর্ঘদিন বাসা বেঁধেছিলেন দলটির নেতারা। ফলে আন্দোলন-সংগ্রামের সময় তথা দলের প্রয়োজনে নেতাকর্মীদের মাঠে পাওয়া যায়নি।
ক্ষমতাসীন বিএনপি এ পথে হাঁটতে চায় না। তারা সরকারকে আলাদা রাখতে চায় দল থেকে। দলকে সবসময় চাঙ্গা ও আন্দোলনের উপযোগী রাখাই যার মূল উদ্দেশ্য। বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কাউন্সিল সামনে রেখে দলের অঙ্গসংগঠনগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, শীর্ষ নেতাদের সরকারি দায়িত্বে ব্যস্ততা এবং তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের স্থবিরতার কারণে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে নতুন নেতৃত্ব আনার জোর প্রস্তুতি চলছে বিএনপিতে। দল ও হাইকমান্ডের প্রতি অনুগত এবং রাজপথের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের দিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে এসব কমিটি ঢেলে সাজানোর।
পুনর্গঠন সম্পর্কে কথা হয় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘দল ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠন-পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এজন্য চেয়ারম্যান তারেক রহমান দায়িত্বশীল নেতাদের নিয়ে কাজ করছেন। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই অঙ্গসংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে।’
যুবদল : তিন বছর মেয়াদি বিএনপির প্রধান এই অঙ্গসংগঠনটির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। তবে ২২ মাস পার হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি যুবদল। যদিও দলীয় ফোরামে সম্প্রতি ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিয়েছে সংগঠনটি। এমন প্রেক্ষাপটে যুবদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ হবে নাকি নতুন কমিটি গঠিত হবে, দলের হাইকমান্ডই নেবে সে সিদ্ধান্ত।
যুবদলের নতুন কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে আসতে চান শরিফ উদ্দীন জুয়েল। তার ভাষ্য, গত ১৭ বছর রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ‘৩১৭টি মামলা খেয়েছি। তিনবার কারাবরণসহ টানা ৪২ দিন ডিবি অফিসে গুম ছিলাম। আমি বিশ্বাস করি, বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে মূল্যায়ন করবেন।’
স্বেচ্ছাসেবক দল: তিন বছর মেয়াদি স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সভাপতি এসএম জিলানী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি সরকারের মন্ত্রিসভায়ও স্থান পেয়েছেন। এ অবস্থায় সংগঠনটির নতুন কমিটির আলোচনা চলছে জোরেশোরে।
এক্ষেত্রে সভাপতি পদের জন্য আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াছিন আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান, সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন। অন্য পদগুলোতেও প্রত্যাশীর সংখ্যা কম নয়। তারা প্রত্যেকেই বিএনপি চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।
ছাত্রদল: ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ঘোষণা করা হয় ছাত্রদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি। এরই মধ্যে শেষ হয়েছে দুই বছর মেয়াদের ওই কমিটির মেয়াদ। যে কারণে জোরালো হয়েছে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের দাবি।
সংগঠনটির দুই শীর্ষ পদের আলোচনায় রয়েছে ২০০৮-০৯ সেশন থেকে ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, খোরশেদ আলম সোহেল, সাফি ইসলাম, জাফর আহমেদের নাম।
কৃষক দল: তিন বছর মেয়াদি কৃষক দলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে দেড় বছরেরও বেশি সময় আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ৫ মে সচিব পদমর্যাদায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন সংগঠনের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল ত্রয়োদশ সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। এ অবস্থায় জোরালো হয়েছে সংগঠনের নতুন কমিটির দাবি।
কৃষক দলের নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুলসহ কয়েকজনের নাম আলোচিত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কে হাসবেন, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।