রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে (এসএইচএসএমসি) পুলিশি পাহারায় নিষিদ্ধঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের তিন নেতাকে পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিয়েছে প্রশাসন। আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) দ্বিতীয় দিনের মতো চলমান ফাইনাল প্রফ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন তারা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় অভিযুক্ত ও নিষিদ্ধঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতাদের পরীক্ষায় বসতে দেওয়ায় ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিঘ্ন হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরীক্ষায় বসার সুযোগ পাওয়াদের একজন আসিফ খান দিহান কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপ-স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ও কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক। তিনি ১১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। অপর দুজন হলেন— ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের উপ-প্রচার সম্পাদক সৌভিক ভৌমিক জয় এবং উপ-দপ্তর সম্পাদক আহসানুল কবীর দীপ্ত। তারা প্রত্যেকেই জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনে অংশ নেওয়া ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি হামলায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় সৌভিক ভৌমিক জয় ও আহসানুল দীপ্ত বহিষ্কারও হয়েছিলেন। এ ছাড়া সৌভিক ২০২৫ সালের ১৫ জুন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
এদিকে গত ১৭ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সেদিন ও আজ ২১ মে মেডিসিন বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন এসব ছাত্রলীগ নেতা। তাদের পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিতে পুলিশি পাহারার ব্যবস্থাও করেছে কলেজ প্রশাসন। জানা গেছে, পরীক্ষা দিতে আসা এই ছাত্রলীগ নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে শিক্ষকদের নিয়ে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে কলেজ প্রশাসন। গত ১৭ মে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় দিহানের আশপাশে একাধিক শিক্ষক অবস্থান নিয়ে অঘোষিত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন এবং হলের বাইরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমন্বয় কমিটির এক সদস্য বলেন, প্রশাসন দায়িত্ব দিয়েছে তাই পালন করছি। তবে একজন পরিণত শিক্ষার্থীর জন্য পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে এভাবে এতগুলো পরীক্ষা, ভাইভা ও অসপির সুযোগ দেওয়া বা এতো দায় নেওয়া আমাদের পক্ষেও সম্ভব না। আইন যেন কেউ নিজের হাতে তুলে না নেয়, সেজন্যই তাদের চোখে চোখে রাখা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের একজন প্রবীণ শিক্ষক আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি সৌভিক ও দীপ্তসহ কয়েকজনের শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় সব বিভাগীয় প্রধানদের উপস্থিতিতে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তাদের পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদের অনেককে ৫ আগস্টের পর শাস্তির আওতায় নেওয়া হলেও তৎকালীণ সাধারণ সম্পাদক আসিফ খান দিহানের কোনো বিচার হয়নি। ১৫তম ব্যাচের ইন্টার্ন চিকিৎসক ফাহাদ অভিযোগ করেন, দিহান ক্যাম্পাসে থাকাকালীন জুনিয়রদের দিয়ে কুলি খাটানো, নিজের বাইক চালানোসহ স্ট্যাম্প, রড ও গাছের ডাল দিয়ে পেটানোর মতো নৈমিত্তিক নির্যাতন চালাতেন। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও হাসপাতালের টেন্ডারবাজিতেও তিনি জড়িত ছিরেন। ফাহাদ আরও জানান, দিহানের পরীক্ষা দিতে আসার বিষয়ে জুনিয়র শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলে বর্তমানে ক্যাম্পাস থেকে নিষিদ্ধ দিহানের ব্যাচমেট সামিউল ইসলামের মাধ্যমে জুনিয়রদের ‘সময় এলে দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আঈনুল ইসলাম খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, যে তিন শিক্ষার্থীকে নিয়ে অন্য শিক্ষার্থীরা আপত্তি করছে, তাদের একজনকে কোনো ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়নি। অপর দুজনের শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে এমন কিছু বলা হয়নি যে শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তারা আর ক্যাম্পাসে আসতে পারবে না। এজন্য আমাদেরকে তাদের পরীক্ষায় বসার অধিকার নিশ্চিত করতে হচ্ছে।