একদিকে বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন হাট বন্ধ, অন্যদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার গরুর বিষয়ে খুব কঠোর। সব মিলিয়ে প্রতি বছর যে হারে সীমান্ত দিয়ে গরু বাংলাদেশে ঢুকত, এবার তেমনটা হচ্ছে না। এ ছাড়া নানা কারণে দেশের বড় অনেক খামারই বন্ধ রয়েছে। ফলে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যাও চাহিদার তুলনায় খুব বেশি নেই। সব মিলিয়ে এবার কোরবানির পশুর বাজারে দাম নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই। তাই এবার ভালো ব্যবসা হবে বলেই মনে হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দক্ষিণ সিটি কমলাপুরে স্টেডিয়াম-সংলগ্ন হাটে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে আসা আক্তার হোসেন। আক্তার প্রতি বছরই গরু নিয়ে প্রায় একই হাটে বিক্রি করেন। এবার ১৮টি গরু নিয়ে এসেছেন তিনি। যার মধ্যে ৭টি তার নিজের খামারের, বাকিগুলো বিভিন্ন খামার থেকে কেনা।
শুধু আক্তার নন, সীমান্তে কঠোর নজরদারি আর বন্ধ খামারের এমন হিসাবই কষছেন প্রায় সব পাইকার ও খামারি। তারা বলছেন, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে থাকায় নির্বাচন ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল; কিন্তু এবার সেটা নেই। এতে কোরবানিদাতার সংখ্যা বাড়বে। এ ছাড়া সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সে হিসেবে অনেক রাজনৈতিক নেতা বাড়তি কোরবানি দেবেন। সব মিলিয়ে এবার কোরবানির সংখ্যা বাড়বে। বিপরীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা অনেক বড় বড় খামার এবার বন্ধ রয়েছে। যারা দেশের কোরবানির পশুর বড় একটা অংশ জোগান দিত। এতে সাধারণ ছোট ছোট খামারির গরুর চাহিদা থাকবে বেশি। ফলে পশুর ঘাটতি না হলেও খুব বেশি উদ্বৃত্তও হবে না। এসব বিবেচনায় নিয়ে এবার কোরবানির পশুর ভালো দাম পাওয়া যাবে বলেই আশা করছেন তারা।
এর বাইরে এবার সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু খুব একটা ঢুকতে পারছে না। ভারতের সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার গরুর বিষয়ে খুবই কঠোর নীতিতে রয়েছে। অনেক হাট বন্ধ করে দিয়েছে। গরু পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে বলে বিভিন্ন খবরে দেখা যাচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীও এবার সীমান্তবর্তী হাটগুলোর অনুমোদন না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে এবার কোরবানির বাজার প্রায় শতভাগ দেশীয় পশুর ওপর নির্ভর করবে। এতে অন্যান্য বছরের মতো অবিক্রীত পশু থাকার সম্ভাবনা কম। এমনও হতে পারে, শেষ দিকে হাটগুলোয় পশুর চাহিদা অনেক বেড়ে যেতে পারে। এসব হিসাব কষে এবার অনেক ব্যাপারী ও খামারি আগেভাগে কোরবানির পশু নিয়ে হাটে হাজির হয়েছেন।
আগামী ২৮ মে দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। সে হিসাবে এখনো ঈদের বাকি আরও সাত দিন। তবে এর মধ্যেই রাজধানীর নির্ধারিত হাটগুলো কোরবানির পশু দিয়ে ভরে যাচ্ছে। যদিও সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুসারে আনুষ্ঠানিক হাট শুরু হবে ঈদের পাঁচ দিন আগে। রাজশাহী, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, যশোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যাপারীরা ট্রাকভর্তি গরু নিয়ে হাজির হয়েছেন। কোনো কোনো অঞ্চল থেকে অনেক ব্যাপারী ও খামারি মিলে কয়েকটি ট্রাক ভরে গরু নিয়ে আসছেন।
গতকাল দুপুরে কমলাপুর হাটের সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টার রোড, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ-পূর্ব পাশ, টিটিপাড়া মোড়, রামকৃষ্ণ মিশন রোডসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এরই মধ্যে রাস্তাগুলোর পাশে গরু রাখার জন্য বাঁশ বাঁধা হয়ে গেছে।
টিটিপাড়া মোড় সংলগ্ন এক জায়গায় কথা হয় কুষ্টিয়া থেকে আসা আরেক বিক্রেতা খোকন ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি প্রতি বছরই এই হাটে আসি। গত কয়েকটি হাট আমাদের খারাপ গেছে। এবার দাম ভালো পাওয়া যাবে বলেই আশা করছি।
তিনি বলেন, আমার এলাকায় বেশ কয়েকটি বড় খামার বন্ধ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক সমস্যায় পড়ে মালিক বন্ধ করে দিয়েছে। এসব খামারের একেকটিতে প্রতি বছর কোরবানিতে ২০০-৩০০ গরু বিক্রি হতো।
খোকন এবং আশপাশের ব্যাপারীরা মিলে এবার ২২টি ট্রাক ভরে গরু নিয়ে এসেছেন। বিক্রেতারা জানান, সাধারণত রাতের দিকে এসে গরুর ট্রাক ভিড়ে বেশি। তবে দিনেও কিছু কিছু আসে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাব মাঠের হাটে গিয়ে দেখা যায়, দুপুরের রোদ উপেক্ষা করে শ্রমিকরা বাঁশ দিয়ে ঘেরা তৈরি করছিলেন। একটু দূরে ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছিল গরু। কেউ পশুকে পানি খাওয়াচ্ছেন, কেউ খড় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ গরুর গায়ে পানি ঢালছেন এই গরমে একটুখানি স্বস্তি দিতে।
এই হাটে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাটগুলোতে ইজারাদারদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে অনেক ব্যাপারী গরু রাখার জায়গা পান না। আবার ক্রেতারাও বেশি ঘোরাঘুরি করতে পারেন না। এসব চিন্তা করেও অনেকে আগেভাগে হাটে চলে এসেছেন। কারণ হাটে আসা ব্যাপারীদের বড় চিন্তাই থাকে ভালো জায়গা নিশ্চিত করা। প্রবেশমুখ বা সামনের সারিতে জায়গা পেলে ক্রেতাদের নজর আগে পড়ে—এমন হিসাবই করেন তারা।
রাজশাহী থেকে আসা ব্যাপারী শহিদুল ইসলাম জানান, আগে আসলে ভালো জায়গা পাওয়া যায়। তাই ঝামেলা এড়াতে আগেই চলে এসেছি। অনেক দর্শনার্থীও আসছেন গরু দেখতে। অনেকে দামদর জানতে চাইছেন। মূলত হাটে বেচাকেনা শুরু হবে ঈদের দুই থেকে তিন দিন আগে।
জানা যায়, এবার রাজধানীতে ২৪টিসহ সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২টি অস্থায়ী হাট বসবে। এর বাইরে রয়েছে গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাট।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে পোস্তগোলা শ্মশান ঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর পাড়-সংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাব মাঠ, রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গা, আমুলিয়া মডেল টাউন এবং শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকা।
এ ছাড়া শিকদার মেডিকেল-সংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গা, কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পানির পাম্প-সংলগ্ন রাস্তার অব্যবহৃত অংশ, দয়াগঞ্জ রেলক্রসিং থেকে জুরাইন রেলক্রসিং পর্যন্ত খালি জায়গা, বনশ্রী হাউজিংয়ের মোস্তমাঝি মোড়-সংলগ্ন এলাকা, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ-পূর্ব পাশ এবং গোলাপবাগ আউটার স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর পাশেও কোরবানির পশুর হাট বসবে।
অন্যদিকে গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাটের পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটিতে বসবে ১২টি অস্থায়ী পশুর হাট। এসব হাটের মধ্যে রয়েছে খিলক্ষেত বাজার-সংলগ্ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের খালি জায়গা, মিরপুর সেকশন-৬-এর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকা, মিরপুর কালশী বালুর মাঠ, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন এলাকা এবং মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার-সংলগ্ন খালি জায়গা।
এ ছাড়া পূর্ব হাজিপাড়া ইকরা মাদ্রাসার পাশের খালি জায়গা, মোহাম্মদপুর বছিলার ৪০ ফুট সড়ক-সংলগ্ন এলাকা, উত্তরা দিয়াবাড়ীর ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর-সংলগ্ন বউবাজার এলাকা, ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদ্রাসা থেকে রানাভোলা অ্যাভিনিউ-সংলগ্ন স্লুইসগেট পর্যন্ত এলাকা, কাঁচকুড়া বাজার-সংলগ্ন রহমান নগর আবাসিক এলাকা, মস্তুল চেকপোস্ট-সংলগ্ন পশ্চিমপাড়া এবং ভাটারা সুতিভোলা খাল-সংলগ্ন এলাকাতেও কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট বসবে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, এবার পাঁচ দিনব্যাপী এসব পশুর হাটে কেনাবেচা চলবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত বছর ঈদুল আজহায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছিল। তার মধ্যে গরু-মহিষ ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি ও ছাগল-ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি। অন্যান্য প্রাণী (উট, দুম্বা ইত্যাদি) কোরবানি হয়েছে ৯৬০টি।
অধিদপ্তর বলছে, এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
কোরবানির সময় ভারতীয় গরু আমদানি বন্ধে সীমান্ত এলাকায় কোনো হাট বসবে না বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। গত ৩ মে সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।
জানা যায়, ক্ষমতার পালাবদল, ব্যাংক ঋণ না পাওয়া, পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও গরু চুরির ঘটনায় গত এক থেকে দেড় বছরে দেশে ১ হাজারের বেশি খামার বন্ধ হয়ে গেছে, যার মধ্যে চট্টগ্রামেই রয়েছে ৫ শতাধিক।