বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যৌন সহিংসতার ঘটনা কম-বেশি আছে। তবে বাংলাদেশের মতো এত বেশি হিংস্রতা ঘটে না অন্য দেশে।
গত বুধবার শিশু রামিসাকে পাশের ফ্ল্যাটের যুবক ধর্ষণের পর যে রকম হিংস্রভাবে হত্যা করেন, তা বর্ণনার অতীত। একই দিন রাজধানীর বনশ্রীর এক মাদরাসা থেকে এক বালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গতকাল প্রাথমিক তদন্তে ছেলেটি বলাৎকারের শিকার বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ : এই অনুসন্ধানে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি ও স্পেনের নারী-শিশু নির্যাতনের ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছে। জনসংখ্যা ও অপরাধের হারের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীসহ ওই সাতটি দেশের চেয়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে খারাপ অবস্থানে রয়েছে। শুধু ভারতের তুলনায় সংখ্যাগত দিক থেকে অবস্থান কিছুটা ভালো। তবে যৌন হিংস্রতার দিক থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে বলে জানা গেছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া গত বছর ২৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানায়, ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৪৭ কোটি জনসংখ্যার ভারতে ২০২২ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল চার লাখ ৪৫ হাজার ২৫৬টি। অন্যদিকে ১৮ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে ২০২২ সালে সেই সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৭৬৬। জনসংখ্যার অনুপাত হিসাব করলে দেখা যায়, ভারতে ওই অপরাধের হার বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ২.৫ গুণ বেশি। টেলিগ্রাফের অনলাইনে গত ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে ২০২৫ সালে ১০ হাজার ৭০১টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়। এর মধ্যে তিন হাজার ৬৩০টি শিশু নির্যাতনের। পাকিস্তান ২৫ কোটি ৮৩ লাখ মানুষের দেশ। অথচ একই সময়ে বাংলাদেশে এই মামলার সংখ্যা ২১ হাজার ৮৯৯। অর্থাৎ পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে অপরাধের হার প্রায় ২.৮৪ গুণ বেশি। নেপালে তিন কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে ২০২৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে এক হাজার ৩৯৩টি। তিন কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ মালয়েশিয়ায় এই সংখ্যা সাত হাজার। জনসংখ্যার সঙ্গে অনুপাত করলেও দুটি দেশেই এই অপরাধ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম।
নারী ও শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে বেশি মামলা ঢাকা বিভাগে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের জনসংখ্যা চার কোটি ৪২ লাখ ১৫ হাজার ১০৭ জন। এই বিভাগে ২০২৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অপরাধে মামলা হয়েছে চার হাজার ৩৮৮টি। গোটা স্পেনের জনসংখ্যা চার কোটি ৯৫ লাখ। অথচ সে দেশে ২০২৪ সালে যৌন সহিংসতায় তিন হাজার ২৮৩টি অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। এগুলোর মধ্যে আবার ইন্টারনেটকেন্দ্রিক যৌন হয়রানির অপরাধও রয়েছে।
ইতালির জনসংখ্যা পাঁচ কোটি ৯০ লাখ। ২০২২ সালে দেশটিতে ছয় হাজার ৮৫৭টি নারী নির্যাতনের ঘটনার রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগ অভিযোগ ইতালিতে থাকা অন্যান্য দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে।
ইন্দোনেশিয়ার জনসংখ্যা ২৮ কোটি ৭৩ লাখ। দেশটির পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩৬ হাজার ১৪টি নারী নির্যাতনের মামলা হয় সারা দেশে।
আর দুই কোটি ৩৫ লাখ মানুষের দেশ শ্রীলঙ্কায় ২০২৪ সালে দুই হাজার ২০০ নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ওই বছর বাংলাদেশে ঘটে ১৭ হাজার ৫২১টি ঘটনা।
গরমকালে বাড়ে ধর্ষণ : মনোযোগ আকর্ষণকারী একটি তথ্য মিলেছে পুলিশ সদর দপ্তরের মামলার পরিসংখ্যান থেকে। সারা দেশের নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো কমপাইল করে পুলিশ সদর দপ্তর। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী, নারী ও শিশুদের শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, পাচারসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ এই মামলার অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে প্রধান অপরাধগুলো হলো—ধর্ষণ (সংঘবদ্ধসহ), ধর্ষণজনিত মৃত্যু, যৌন হয়রানি, অপহরণ, যৌতুকের জন্য নির্যাতন বা মৃত্যু, এসিড নিক্ষেপ ও শিশুপাচার। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গরমকালে দেশের নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যায়। শীতকালে কিছুটা কমে। শীত শেষ হলে মার্চ মাসে বসন্তকাল চলার সময় বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের হার বাড়তে থাকে। প্রায় একই হার নভেম্বর পর্যন্ত পুরো গরমকালেই থাকে। আবার ডিসেম্বর থেকে যখন শীত পড়ে, তখন থেকে কমতে শুরু করে নরী ও শিশু নির্যাতন।
শুধু পুলিশের তথ্য নয়, মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যও একই কথা বলছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৩৮ জন, ২০২৬-এর জানুয়ারিতে ৩৫ এবং ফেব্রুয়ারিতে ৩১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। আর মার্চ মাসে এসে হালকা গরম পড়তেই সেই সংখ্য দাঁড়ায় ৬২ জনে। আগের বছর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ২৩ জন, ২০২৫-এর জানুয়ারিতে ৩৯ ও ফেব্রুয়ারিতে ৪৬ জন নারী ধর্ষণ বা গণধর্ষণের শিকার হন। মার্চ মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬০-এ।
আগের বছরের চিত্রেও দেখা যায়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ৩৫ জন, ২০২৪-এর জানুয়ারিতে ২৯ জন ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৪ জন ধর্ষণের শিকার হন। ওই বছরের মার্চ মাসে সেটির ধর্ষণের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১টিতে।
পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় অন্যান্য অপরাধ কম থাকলেও নারী নির্যাতনের ঘটনা কমেনি। বরং বেড়েছিল। ওই বছরে দেশে নারী-শিশু নির্যাতনের ২২ হাজার ৫১৭টি মামলা রেকর্ড করে পুলিশ। পরের বছর ২০২১ সালে ছিল ২২ হাজার ১৩৬টি এবং ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি মামলা দায়ের হয়। পরের বছর ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা রেকর্ড করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ওই মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২১ হাজার ৮৯৯টি।
২০২০ সালে নারী নির্যাতনের হার বেড়ে যাওয়ার পর জাতীয় ইনকোয়ারি কমিটি ধর্ষণ রোধে করণীয় বিষয়ে সারা দেশের বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট ও আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যাতে বৈঠক করতে পারেন, সে জন্য ২০২১ সালের ১৫ জুন আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এরপর ওই বছর ১৯ জুন সভাটি হয়। সেই সভায় তুলে ধরা হয় নারী নির্যাতনের চিত্র। করণীয় নিয়েও আলোচনা হয়। কিন্তু সে পর্যন্তই; আর কোনো অগ্রগতি নেই।
চলতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস যখন বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হচ্ছিল, ঠিক সেই রাতেই বাংলাদেশের দুটি স্থান থেকে ভেসে আসে দুজন নির্যাতিত নারীর আর্তনাদ। ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে আশ্রয়ের খোঁজে আসা এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে তিন অটোরিকশাচালক মিলে ধর্ষণ করে। একই রাতে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নগ্ন ভিডিও ধারণ এবং ধর্ষণের চেষ্টা চালায় মেয়েটির সত্বাবা।
পুলিশ সদর দপ্তর এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমানে বিএনপি সরকার দায়িত্ব পালন করলেও কোনো সরকারই নারী ও শিশু নির্যাতনের লাগাম টানতে পারেনি। দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৩ জনের বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।
গবেষণায়ও গরম চিহ্নিত : মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় তিন ধরনের রেপিস্ট চিহ্নিত করেছি। এর একটি পাওয়ার রেপিস্ট, একটি এঙ্গার রেপিস্ট তৃতীয়টি হলো স্যাডিস্টিক রেপিস্ট। যৌনতার চিন্তা করে যারা ধর্ষণ করে তারা পাওয়ার রেপিস্ট। পূর্বশত্রুতার জেরে হত্যার উদ্দেশ্যে যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে সেটা এঙ্গার রেপিস্ট। আর ধর্ষণ করতে গিয়ে বাধা পেয়ে যারা হত্যা করে তারা স্যাডিস্টিক রেপিস্ট।
উমর ফারুক বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় এসেছে—গরমকালে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ে। এটির একটিই কারণ, আমাদের দেশের আবহাওয়া। গরমকালে মানুষের ইন্টার পার্সোনাল টেম্পার কমে যায়; যেটা শীতকালে কমে না। এ ছাড়াও গরমকালে পুরুষের যে হরমোনাল পরিবর্তন দেখা দেয়, সে কারণেও ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে থাকে।’
তিনি আরো বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়ার সময়ও মানুষের শরীরে হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে। বৃষ্টির সময় ইনহাউজ রেপ বেশি হয়। কারণ আর্দ্রতার কারণে আগ্রাসী মনোভাব দেখা দেয়।
এক প্রশ্নের জবাবে এই গবেষক বলেন, শীতের পর বসন্ত শুরু হয়। আস্তে আস্তে গরম পড়তে থাকে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে যৌনতার প্রভাব বাড়তে থাকে বলে শেষ বসন্তে ধর্ষণের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বাড়ে। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের গবেষণা বলছে, সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটে। এটাও আবহাওয়াজনিত কারণে।’
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধর্ষণের সঙ্গে হরমোনের বিষয় জড়িত রয়েছে। বর্তমানে অনলাইনের যুগে পর্নোগ্রাফি দেখার কারণেও শিশুদের মধ্যে যৌনতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া যাবে না। দিলেও তার ওপর নজরদারি রাখতে হবে। আমি এমন কেসও পেয়েছি, ছোট ছোট ছেলেমেয়ে মোবাইল ফোনে পর্নোগ্রাফি দেখে যৌনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। সেটা এক মা দেখতে পেয়ে নিজেই রোগী হয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন।’
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যৌনতার ক্ষেত্রে না জানার কারণে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। যৌন সম্পর্ক কখনোই জোর করে হয় না। যারা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত তাদের বিষয়টিকে আমরা টোটালি মেন্টাল ডিজ-অর্ডার হিসেবে দেখি। মানসিকভাবে সুস্থ কোনো লোক ধর্ষণের মতো ঘটনায় জড়িত হতে পারে না। যৌনতা হলো টোটালি একটা হরমোনাল বিষয়।’
শিশুদের ক্ষেত্রে ধর্ষণে জড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেডিক্যাল সায়েন্স অনুযায়ী একটি ছেলের ১২ বছর বয়সে ও একটি মেয়ের ১১ বছর বয়স থেকে সাধারণত হরমোন ডেভেলপ করে। এদের মধ্যেও মেন্টাল ডিজ-অর্ডার শিশু রয়েছে, যারা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য সামাজিক, ধর্মীয় ও পরিবার থেকে নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া জরুরি। তিনি আরো বলেন, ‘পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে স্কুলে যৌন শিক্ষার বিষয়ে পড়ানো হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এটা লুকানো হয়। আলোচনা না করায় একজন শিশু যৌনতা সম্পর্কে জানতে পারে না। স্কুলে বিশেষ করে অষ্টম ও নবম শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে এই বিষয়গুলোর ওপর টপিক থাকতে পারে।’
এক প্রশ্নের জবাবে এই চিকিৎসক বলেন, ‘মেডিসিন দিয়ে হরমোনাল এই সমস্যা কমানো যায়, তবে সেটা নিরাপদ নয়। কারণ ওষুধের প্রভাবে পরবর্তী সময়ে হরমোনাল অর্গানে সমস্যা দেখা দিতে পারে।’
জনসচেতনতায় ভূমিকা নেই : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উন্নত দেশগুলোতেও অপরাধ ঘটে। কিন্তু সেখানে অপরাধ দমনে নেওয়া হয় দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ও সামাজিক কর্মসূচি। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর ইতালির ভেনিসে ২২ বছর বয়সী ফিলিপ্পো তুরেত্তা তার সহপাঠী ও প্রাক্তন প্রেমিকা বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী জুলিয়া সেচেত্তিনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এরপর প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। দেশটির সরকার ‘নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা’ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে। অথচ বাংলাদেশে ১৯৯৫ সালে ইয়াসমিন নামের এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যের ফাঁসি কার্যকর হয়। তবে এসব ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সরকারের তরফ থেকে ইতালির মতো সে ধরনের সচেতনতামূলক কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি। এর ফলেই ২০১৬ সালে কুমিল্লায় সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের শিকার হয়ে জীবন দিতে হয়।
ইতালিতে দীর্ঘদিন বসবাসরত আইনজীবী এম এইচ মোক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বহু বছর ইতালির রোমে আছি। এখানে যেটা হয়, রাত ২-৩টার সময়ও একজন নারী শহরে একা হাঁটলেও কেউ তাকে ডিস্টার্ব করে না, শ্লীলতাহানি তো দূরের কথা।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আইন দিয়ে সব নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সামাজিকভাবে সেই মনমানসিকতা গড়ে তুলতে হয়। এখানে স্কুলপর্যায় থেকেই শিশুদের ম্যানার শেখানো হয়।’ তিনি আরো জানান, এখানে অন্য দেশের লোকজনের বিরুদ্ধেই যৌন হয়রানির অভিযোগ বেশি।
স্পেনের অ্যাটর্নি জেনারেলের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত যৌনশিক্ষা এবং মূল্যবোধের অভাবই কিশোরদের মধ্যে ‘ভাইরাল যৌন আচরণ’ তৈরি করছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফিতে প্রবেশাধিকার তাদের মনে যৌনতা ও সম্মতির ভুল ধারণা গেঁথে দিচ্ছে।
ইতালিপ্রবাসী এই আইনজীবীর কাছ থেকেই জানা যায়, ইউরোপের মতো উন্নত দেশগুলোতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও পরে হত্যার মতো হিংস্রতার ঘটনা হয় না। এমনকি ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ায়ও ধর্ষণের পর নৃশংস খুনের ঘটনা তুলনামূলক অনেক কম।
স্পেন ও ইতালির মতো দেশগুলো যৌন অপরাধ সংঘটনের কারণ হিসেবে পর্নোগ্রাফি ও অ্যালকোহলের অপব্যবহারকে চিহ্নিত করে তা মোকাবেলায় কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে কেবল আইন কঠোর করে এবং ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড করে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সফল হচ্ছে না।
প্রতিকারে করণীয় : বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সরকার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারী-শিশু নির্যাতনের এই মহোৎসব বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী পদক্ষেপ। এর মধ্যে রয়েছে, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মামলাগুলো ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ইতালির মতো স্কুল পর্যায় থেকেই জেন্ডার সেনসিটিভ শিক্ষা ও নৈতিকতা শেখাতে হবে। ইয়াসমিন বা তনু হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জড়িত থাকা প্রমাণ হলে তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর অপরাধ কমাতে পর্নোগ্রাফি সাইটগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কেবল আইন দিয়ে নয়, বরং পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও সরকারের কোনো কাজ আমরা দেখছি না। আমি মনে করি, মানসিকভাবে অসুস্থ না হলে এ ধরনের ঘটনা কেউ ঘটাতে পারে না। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা কেন বাড়ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সরকারের তরফ থেকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেখা যায়, একটি ঘটনা ঘটলে হৈচৈ হয়। এরপর সময় গেলে বিষয়টি আর আলোচনায় থাকে না। কেউ মনিটর করে না। আর বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে একসময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হয়ে চলে যান। যে চিকিৎসক ময়নাতদন্ত করেন তিনিও বদলি হয়ে যান। বিচারে সাক্ষ্য পর্যায়ে তাঁদের সাক্ষী হিসেবে পাওয়া যায় না। অনেক তথ্য-প্রমাণও নষ্ট হয়ে যায়। অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ায় তারা জেল থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। আমি মনে করি, এ ধরনের নৃশংস ঘটনার দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া দরকার। তাহলে কিছুটা কমবে। এ ছাড়া সমাজ নিয়ে যাঁরা ভাবেন তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে। সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী হতে হবে সরকারকে।’
এ ছাড়া নীতি-নৈতিকতার ওপর জোর দিতে হবে। মানসিক অসুস্থতা থেকে বের করে আনতে হবে এসব অপরাধীকে। সেই পথ খুঁজতে হবে সরকারকেই।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য : নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নারী নির্যাতন রোধে মন্ত্রণালয় থেকে মাল্টিসেক্টরাল অ্যাপ্রোচে ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। বর্তমানে এ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ১৪টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ৬৭টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেল, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে টোল ফ্রি জাতীয় হেল্পলাইন সেন্টার (১০৯), ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, আটটি রিজিওনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি, আটটি বিভাগীয় ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরি এবং রিয়াল টাইম মনিটরিং ডেটাবেইসের মাধ্যমে দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে কাজ করা হচ্ছে।