Image description

ধর্মীয় ‘আকিদাগত’ কারণে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কওমি-ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের বিরোধ পুরনো। সংগঠনটির আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীও বিভিন্ন সময় জামায়াতবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকা হেফাজতভুক্ত চারটি দলের বিষয়ে ‘কঠোর সিদ্ধান্ত’ নিতে গত মাসে এক বৈঠকে কমিটি করার নির্দেশও দেন বাবুনগরী। সেই ‘কঠোর সিদ্ধান্ত’ এক মাসের ভেতর আসার কথা থাকলেও এখনো কিছুই হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, হেফাজতের ভেতরে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব কি বাড়ছে? কওমিভিত্তিক সংগঠন হেফাজতের মধ্যে থাকা কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারাই এমন প্রশ্ন তুলেছেন। তবে জামায়াত জোটে থাকা হেফাজতের নেতারা বলছেন, হেফাজত তাদের আদর্শিক সংগঠন। জামায়াতের সঙ্গে জোট ‘রাজনৈতিক কৌশল’। কিছু নেতা অবশ্য বলছেন, হেফাজতে জামায়াতের পরোক্ষ প্রভাব বাড়ছে।

হেফাজত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতাদের জামায়াত জোটে থাকা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় বেশ আগেই। বিতর্কের অবসানের জন্য গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে সংগঠনের একটি বৈঠক হয়। চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসায় সংগঠনের আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর উপস্থিতিতে হেফাজতের বৈঠকে এক মাসের মধ্যে জামায়াত জোটে থাকা কওমি ধারার রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাত সদস্যের কমিটি হয়।

জামায়াত জোটের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য দায়িত্ব পাওয়া সাত সদস্যের কমিটির প্রধান হলেন মুফতি জসিম উদ্দিন। এ ছাড়া কমিটিতে রয়েছেন সংগঠনের মহাসচিব সাজিদুর রহমান, হেফাজতের নায়েবে আমির ও মধুপুরের পীর আল্লামা আব্দুল হামিদ, আল্লামা সালাহ উদ্দীন নানুপুরী, ডিআইটি পীর আল্লামা আব্দুল আউয়াল, মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী ও মুফতি বশীরুল্লাহ।

ওই বৈঠকের বিষয়ে হেফাজতের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা জানিয়েছেন, ‘আকিদাগত’ কারণে জামায়াতের বিষয়ে আমিরের অবস্থান সব সময় ‘কঠোর’। ওই বৈঠকে তিনি জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত নেতাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বলেন। মামুনুল হকের অবস্থান নিয়েও বড় পরিসরে আলোচনা হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে কওমিধারার চারটি দল নির্বাচনী জোট করে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই জোট ১১ দলীয় জোট নামে পরিচিত, যারা সংসদেও বিরোধী জোটের ভূমিকায়। এই জোটে রয়েছে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদের খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। চারটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বই হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন শীর্ষ পদে রয়েছেন।

জামায়াতের ওই চার ‘রাজনৈতিক মিত্র’ ছাড়াও হেফাজতে ইসলামে কওমি ধারার আরেক রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপির সঙ্গে জোট করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে। নির্বাচনের পরে বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য রেখে তারা আন্দোলনও করছে।


গত নির্বাচনের সময়ও জামায়াতকে ভোট না দিতে হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী কয়েকবার বক্তব্য দিয়েছেন। গত বছর আগস্টে চট্টগ্রামে এক জনসভায় বাবুনগরী জামায়াতে ‘ভণ্ড ইসলামি দল’ আখ্যা দেন।

অন্যদিকে শুরুতে জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকলেও নির্বাচনের আগে বেরিয়ে গিয়ে এককভাবে নির্বাচন করে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কাছাকাছি এলেও নির্বাচনের আগেই তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এর আগে অবশ্য জামায়াতের ‘আকিদা’ নিয়ে বেশ খোলামেলা দলটির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতারাও। জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে আসায় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ইসলামী আন্দোলনকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দেন মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাবেক চার দলীয় জোটে থাকা অবস্থায় জামায়াতের সঙ্গে কওমি-ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য হলেও পৃথকভাবে জামায়াতের সঙ্গে তাদের ঐক্য হয়নি।

গত রোববার জামায়াত জোটে থাকা নিয়ে কথা বলতে চট্টগ্রামে গিয়ে হেফাজত আমিরের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রভাবশালী নেতা মাওলানা মামনুল হক। সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে এই বৈঠক সম্পর্কে জানা গেছে, জামায়াত জোটে থাকা-না থাকা নিয়ে নিজের অবস্থান আমিরের কাছে ব্যাখ্যা করেন মামুনুল হক।

সাক্ষাৎ শেষে মামুনুল হক বলেন, বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন মত-পথের রাজনৈতিক দলকে নিয়ে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য গঠিত হয়েছে। এই ঐক্যে এমন কিছু দলও রয়েছে, যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণ করে। তা সত্ত্বেও চলমান জাতীয় পরিস্থিতি মোকাবিলার স্বার্থে এই রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছে।

হেফাজতের যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হক বলেন, “জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে আকিদা, বিশ্বাস ও চিন্তাগত মতপার্থক্য আগে থেকেই বিদ্যমান এবং তা বহাল রয়েছে। তবে এই রাজনৈতিক সমন্বয় কোনোভাবেই আকিদাগত বা আদর্শিক ঐক্য নয়, বরং বৃহত্তর জাতীয় প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত রাজনৈতিক ঐক্য।”

মামুনুল হকের প্রেসসচিব আশরাফুল ইসলাম সাদের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “মামুনুল হকের বক্তব্য শুনে মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী বলেছেন, আজ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমরা এক, হেফাজতে ইসলামের মধ্যে কোনো বিভক্তি নেই।”

হেফাজতে জামায়াতের ‘পরোক্ষ’ প্রভাব

হেফাজতে ইসলামের বিষয়ে ইসলামী আন্দোলনের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, ‘‘এখন হেফাজতে ইসলাম হয়ে গেছে কথাসর্বস্ব। কথা বলাকেই কাজ মনে করে।”

হেফাজতে জামায়াত-প্রভাব বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই নেতা বলেন, ‘‘আসলে মামুনুল হক সাহেব মনে করেন তিনি জামায়াতকে ব্যবহার করছেন, আর জামায়াত মনে করে উল্টোটা। দুজনই দুজনকে ব্যবহার করছে। এখন যদি আপনি মামুনুল হককে জামায়াতের মিত্র ধরেন, তাহলে হেফাজতে জামায়াতের প্রভাব অনেক। কিন্তু আসল কথা হলো, হেফাজত বলে তো এখন কিছু নাই। হেফাজতে চারটি দল আছে, যারা জামায়াতের সঙ্গে জোটে আছে। সে দিক দিয়ে জামায়াতের প্রভাব আছে। কিন্তু সরাসরি হেফাজতে ইসলামের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে জামায়াতের প্রভাব আছে বলে মনে হয় না।”

যা বলছে জামায়াত

হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দলটির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হেফাজতে ইসলামের আমিরের বক্তব্য নিয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন চরচাকে বলেন, “হেফাজতে ইসলাম নিয়ে আমাদের কোনো খারাপ চিন্তা নেই। উনারা ভালোই করছেন। সব বিষয়ে মন্তব্য করা জরুরি না তো। আমাদের দলের আমির, দলের নেতারা তো হেফাজতে ইসলামের আমিরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।”

জামায়াত নিয়ে হেফাজত আমিরের বক্তব্য নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “এ সম্পর্কে আমার কোনো মন্তব্য নেই। এর উত্তর উনারাই দিতে পারবেন।”

আকিদাগত ফারাক, তবু এক জোটে

হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক ও মামুনুল হকের দলের নায়েবে আমির মহিউদ্দিন রাব্বানী অবশ্য মনে করেন, সংগঠনে জামায়াতের প্রভাব বাড়েনি। তিনি চরচাকে বলেন, “জামায়াতের সঙ্গে যারা আছে, তারা তো রাজনৈতিকভাবে আছে। এটা নির্বাচনী সমঝোতা। কিন্তু মামুনুল হক সাহেবসহ চারটি দলের যারা আছেন, তারা আদর্শগতভাবে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে। এখনো হেফাজতে ইসলামের আমির জামায়াতের পক্ষে না। হেফাজত অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।”

মহিউদ্দিন বলেন, “এখানে তো আকিদা নিয়ে আমাদের সঙ্গে জামায়াতের দ্বন্দ্ব, অন্য কিছু তো না। জামায়াতের সঙ্গে যে এই দ্বন্দ্ব আছে, এই ব্যাপারটি নিয়েই জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করেই তো তারা নির্বাচন করেছেন। জামায়াত জোটে এমন দলও তো আছে, যারা ইসলামপন্থী না। আসলে মানুনুল হক সাহেব তো ইসলাম হিসেবে সমঝোতা করেননি, নির্বাচনী সমঝোতা করেছেন।”

তিনি জানান, হেফাজত আমিরের সঙ্গে মামুনুল হকের বৈঠকের পর সংগঠনে বিএনপি ও জামায়াত জোটের সব নেতারাই থাকবেন। ফলে ওই সাত সদস্যের কমিটির কাজ শেষ হয়ে গেল। জামায়াত জোটের হেফাজতে ইসলামের চারটি দল বিশ্বাসগতভাবে দেওবন্দী। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তারা জামায়াতের সঙ্গে রয়েছে।

মহিউদ্দিন বলেন, “বিএনপির জোটে থাকারা হেফাজতে থাকতে পারলে মামুনুল হক সাহেব থাকতে পারবে না কেন?”

হেফাজত ‘ঐক্যবদ্ধ আছে’

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী চরচাকে বলেন, “মাওলানা মামুনুল হক আমাদের আমির সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছেন। এখন হেফাজতে ইসলাম ঐক্যবদ্ধ আছে।”

জামায়াত জোটের চার দল হেফাজতে থাকছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “হ্যাঁ।”

চরচাকে তিনি বলেন, “হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচার ও প্রোপাগান্ডা ছিল যে, এখানে মামুনুল হককে মাইনাস করে দেওয়া হচ্ছে, সেইটা আর নেই। এখন সবাই থাকছে, হেফাজত ঐক্যবদ্ধভাবে আছে।”

হেফাজতে ইসলামের নেতা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মনির হোসাইন কাসেমী বলেন, “উনারা (জামায়াত জোটের নেতারা) আমিরের কাছে গিয়েছেন, তার মানে তো সবকিছু পজিটিভ। উনারা আছেন এবং থাকবেন।”


হেফাজত নেতা মাওলানা মনির হোসাইন কাসেমী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামেরও যুগ্ম মহাসচিব। বিএনপির সমর্থন নিয়ে সংসদ নির্বাচনও করেছেন তিনি।

জামায়াত জোটের বিষয়ে তিনি বলেন, “হেফাজতে ইসলামের মধ্যে অনেক জোটের নেতারাই আছেন। সেগুলো তো রাজনৈতিক জোট।”

হেফাজতে ইসলামের আমিরের জামায়াত নিয়ে আপত্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “হেফাজতের আমিরের জামায়াত নিয়ে আপত্তি তো আকিদাগত। আমরা তো উনাদের (জামায়াত জোটের) আকিদাগত বিষয়ে এখন আর সন্দেহ প্রকাশ করছি না।”

জামায়াত জোটের নেতাদের নিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির এখন ‘স্যাটিসফায়েড’ বলেও মন্তব্য করেন মনি হোসাইন।

সংগঠনে জামায়াত জোটের প্রভাব নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “হেফাজতে জামায়াত জোটের প্রভাব কখনো ছিল না।”